Logo

ধর্ম

ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার গোলকধাঁধায় বাংলাদেশ

উত্তরণের উপায় ও ইসলামের দিকনির্দেশনা

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ২২:২৮

উত্তরণের উপায় ও ইসলামের দিকনির্দেশনা

রাজপথের ক্ষোভ ও বাস্তবতার নির্মমতা

​সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। সেখানে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবি তোলা হয়েছে। রাজপথে স্লোগান উঠছে—‘তুমি কে আমি কে, ফার্মের মুরগি’। আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নপত্রের ভুল ও কঠিন পরীক্ষার বিরুদ্ধে এই ক্ষোভ। কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনা।

​কয়েক দিন ধরে ঢাকা ও এর আশপাশে তীব্র জলাবদ্ধতা চলছে। এর মধ্যেই ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের অবর্ণনীয় কষ্ট আমাদের চোখে লেগেছে। একটানা বৃষ্টি আর কোমর সমান পানি ডিঙিয়ে তারা চলছে। তার ওপর রয়েছে তীব্র লোডশেডিং। শেষ মুহূর্তে পরীক্ষার হল পর্যন্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে। রকমারি দুর্ভোগ আর পানিতে ভিজে আমাদের সন্তানরা পরীক্ষা দিচ্ছে। এই দৃশ্য কোনো অভিভাবক বা সাধারণ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। আমি নিজেও এতে গভীরভাবে মর্মাহত।

ভঙ্গুর শিক্ষাকাঠামো ও কোচিং নির্ভরতা

​এইচএসসি পরীক্ষা জীবনের একটি বড় সন্ধিক্ষণ। এর ফলাফলের ওপর উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা একটি ভালো বিষয়ের জন্য দুই বছর দিনরাত লড়ে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন আর ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে।

​প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা যেন ধ্বংসের মুখে। শিক্ষায় পর্যাপ্ত বাজেট নেই। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব স্পষ্ট। আর সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো শিক্ষাঙ্গনে জেঁকে বসা সীমাহীন দুর্নীতি।

জাতীয় ক্যানসার: শিক্ষাঙ্গন ও আদালতের দুর্নীতি

​গত ৫০ বছরে দেশে অনেক সরকার এসেছে, সরকার গেছে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি কোনো আমলেই কমেনি। আদালত এবং শিক্ষাঙ্গন একটি দেশের দুটি প্রধান স্তম্ভ। এই দুটি জায়গা যদি কলুষিত হয়ে পড়ে, তবে সেই জাতি কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। দুর্নীতি আজ মারাত্মক ক্যানসারের মতো সমাজকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে।

​দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এ দেশে বড় বড় ছাত্র-আন্দোলন ও ঐতিহাসিক বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বদলায়নি। চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির সংক্রামক যেন আরও বাড়ছে। দেশের মানুষ আজ গণমাধ্যমে উন্নত বিশ্বের সুশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থা দেখছে। আর নিজের দেশের বিশৃঙ্খলা দেখে চরম হতাশায় ডুবছে।

ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা

​আমাদের দেশে বর্তমানে এক ত্রিমুখী ও বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চলছে। এর ফলে সমাজে নানা মতাদর্শের মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। একদিকে পশ্চিমা ধাঁচের সেকুলার শিক্ষা, অন্যদিকে ধর্মীয় ভাবধারা। এই দুইয়ের দূরত্বের কারণে এক চরম আদর্শিক সংকট তৈরি হয়েছে।

​আমাদের প্রয়োজন ছিল একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা। যেখানে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নৈতিক শিক্ষার সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ মেলবন্ধন থাকবে। কিন্তু আমরা এখনো ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কেরানি বানানোর পুরোনো আদলেই আটকে আছি। সরকার পরিবর্তন হলেই নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সিলেবাস বদলানো হয়। এটি শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার সংকট-বৈষম্য

​জাতীয় বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ কাগজে-কলমে বাড়ে। কিন্তু তার বড় অংশই চলে যায় অবকাঠামোগত উন্নয়নে। সাধারণ শিক্ষার মানোন্নয়ন কিংবা শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান এতে বাড়ে না। অন্যদিকে, কওমি ও আলীয়া মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চরম অবহেলার শিকার। আলিয়া মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ ইবতেদায়ির জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। পরীক্ষা পদ্ধতিও নানা সময় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

​একসময় আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রচুর মেধাবী ছাত্র বের হতো। কিন্তু বর্তমানে দাখিল ও আলেমের পর ফাজিল-কামিলে মানসম্মত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় অনেকে মাদ্রাসার পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করে। তারা সাধারণ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

​বিপরীতে, কওমি মাদ্রাসার লাখ লাখ শিক্ষার্থী সনদের যথার্থ মূল্যায়ন পাচ্ছে না। ফলে কর্মজীবনে তারা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থীকে নতুন করে সাধারণ শিক্ষায় ভর্তি হতে হচ্ছে। তারা ইসলামিক স্টাডিজ বা ধর্মীয় বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছে। এরপর একটি ছোটখাটো সরকারি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। অথচ সেই সরকারি চাকরিতেও ঘুষ ও দুর্নীতির মহোৎসব চলছে।

ছাত্র রাজনীতির বলি: তরুণ প্রজন্মের বিপথগামিতা

​২০১৮ সালের পর থেকেই দেশের শিক্ষার্থীরা বারবার রাজপথে নেমেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ছাত্ররা যখনই অধিকারের দাবিতে মাঠে নামে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ব্যবহার করে। আন্দোলন সফল হলে ছাত্ররা পায় ‘রাজাকার’ কিংবা ‘ফার্মের মুরগি’র মতো অপবাদ। আর ক্ষমতার মধু ভোগ করে অন্যরা। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে পরীক্ষার মধ্যে শিক্ষার্থীদের এভাবে রাজপথে নামতে হয় না।

​ছাত্রদের মূল কাজ পড়াশোনা করা ও নিজেদের ক্যারিয়ার গড়া। কিন্তু এ দেশের ছাত্র রাজনীতি আজ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তির হাতিয়ার। রাজনৈতিক দলগুলো মেধাবীদের ব্যবহার করে তাদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে।

​এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে শুধু পরীক্ষার খাতা বা প্রশ্নপদ্ধতি সংস্কার করলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের ভেতরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা জাগ্রত করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো আত্মিক শক্তি তাদের দিতে হবে। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্ম নানামুখী হতাশায় ভুগছে। পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ না পেয়ে তারা মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া এবং টিকটক-ফেসবুকের মতো সস্তা বিনোদনে আসক্ত হচ্ছে। পার্ক বা রাস্তার মোড়ে স্কুল-কলেজের পোশাকে উদ্দেশ্যহীন আড্ডা আজ সাধারণ চিত্র। এমনকি কিছু শিক্ষকের মাদকাসক্ত হওয়ার খবরও আজ অনলাইনের মাধ্যমে সামনে আসছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।

সমাধানের পথ: ইসলাম, বিজ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির সমন্বয়

​একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে থাকার কথা ছিল। তারা উন্নত শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের জীবন গড়বে, দেশের হাল ধরবে। কিন্তু আমাদের ভঙ্গুর ও বাণিজ্যিকীকরণ হওয়া শিক্ষাব্যবস্থা তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না। শুধু সেকুলার বা বস্তুবাদী চিন্তার ওপর ভিত্তি করে যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা জাতিকে কেবল নৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রজন্মই উপহার দিতে পারে।

​বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। তাই এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম, পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ এবং আখেরাতের জবাবদিহিতার চেতনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইসলাম কখনো বিজ্ঞান বা আধুনিকতার বিরোধী নয়। ইতিহাসের সোনালী যুগে মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারই আজকের আধুনিক পৃথিবীর ভিত্তি স্থাপন করেছিল। কিন্তু এ দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা ইসলামকে প্রগতির অন্তরায় মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে, যারা দুর্নীতি ও অপকর্মের সাথে জড়িত, তারা ইসলামকে ভয় পায়। কারণ ইসলাম চোরের উপযুক্ত শাস্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ঘোষণা করেছে।

 নৈতিক পুনর্জাগরণের ডাক

​আগামী দিনে দেশে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার কায়েম করতে হলে ইসলামের কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থে দুর্নীতিমুক্ত করতে চাই, তবে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষায় আত্মশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক চর্চাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

​পার্থিব লোভ-লালসা ও পদের মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। কিন্তু মানুষের অন্তরে যদি আল্লাহর ভয় এবং আখেরাতে জবাবদিহিতার অনুভূতি থাকে, তবে সে কখনো দুর্নীতি করতে পারে না। ​তাই রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত—উভয় উদ্যোগেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। একটি একমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং নৈতিকতা-সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আমরা এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে।

লেখক: ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন