ইসলাম নারীকে দিয়েছে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার অনন্য দৃষ্টান্ত। জাহেলি যুগে যেখানে নারী ছিল অবহেলিত ও নিপীড়িত, সেখানে ইসলাম নারীকে মায়ের মর্যাদা, কন্যার সম্মান এবং স্ত্রীর অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই মর্যাদা রক্ষার অন্যতম মাধ্যম হলো সতীত্ব ও পর্দা। সতীত্ব নারীর চারিত্রিক সৌন্দর্য আর পর্দা তার বাহ্যিক সুরক্ষা। এ দুয়ের সমন্বয়েই একজন মুসলিম নারী হয়ে ওঠেন মর্যাদাবান, সম্মানিত ও আদর্শ নারী। তাই সতীত্ব ও পর্দা কোনো বোঝা নয়; বরং এটি মুসলিম নারীর অহংকার ও গৌরবের প্রতীক।
সতীত্বের গুরুত্ব
সতীত্ব বলতে বুঝায় চরিত্রের পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা এবং অবৈধ সম্পর্ক থেকে নিজেকে সংযত রাখা। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই অপরিহার্য গুণ। তবে নারীর সতীত্ব পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে।’ -[সুরা নুর : ৩১]
এই আয়াতে নারীদের জন্য সতীত্ব ও পর্দাÑউভয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সতীত্ব শুধু শারীরিক নয়; দৃষ্টি, আচরণ, কথাবার্তা ও চলাফেরার মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটতে হবে।
সতী নারীর মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক উঁচু। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, হজরত মারইয়াম (আ.) ছিলেন সতীত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসা করে বলেন, ‘আর মারইয়াম, ইমরানের কন্যা, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল।’ -[সুরা তাহরিম : ১২] এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, সতীত্ব একজন নারীকে এমন উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে পারে, যার আলোচনা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।
পর্দার বিধান ও তাৎপর্য
পর্দা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এটি কেবল পোশাকের নাম নয়; বরং দৃষ্টি, আচরণ, কথাবার্তা ও জীবনযাপনের একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে সহজে চেনা যাবে এবং তারা নির্যাতিত হবে না।’- [সুরা আহযাব : ৫৯]
এই আয়াতে পর্দার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। পর্দা নারীর স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে না; বরং তাকে অশালীনতা ও কুদৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করে।
বর্তমান যুগে অনেকেই মনে করেন, পর্দা নারীর অগ্রগতির পথে বাধা। অথচ ইতিহাস সাক্ষী- বহু মুসলিম নারী পর্দা রক্ষা করেও শিক্ষা, সমাজসেবা ও জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। সুতরাং পর্দা কখনো উন্নতির অন্তরায় নয়; বরং এটি আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানের পরিচায়ক।
সতীত্ব ও পর্দা নারীর সৌন্দর্য
আধুনিক সমাজে সৌন্দর্যকে প্রায়ই বাহ্যিক সাজসজ্জা ও আকর্ষণীয় পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সৌন্দর্য হলো চরিত্রের সৌন্দর্য।
একজন পর্দানশীন, লজ্জাশীলা ও সতী নারী সমাজে অধিক সম্মানিত হন। কারণ তিনি নিজেকে সবার সামনে প্রদর্শনের বস্তু মনে করেন না; বরং নিজের মর্যাদা ও সম্মানকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে রক্ষা করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারী হলো গোপনীয় সম্পদ। যখন সে ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে মানুষের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় করে তোলে।’- [তিরমিজি, হাদিস : ১১৭৩] এই হাদিসের শিক্ষা হলো, নারী যেন নিজ মর্যাদা রক্ষা করে চলে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজেকে প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত না করে।
পর্দা ও সতীত্ব সমাজকে পবিত্র রাখে
সমাজে অশ্লীলতা, ব্যভিচার, যৌন হয়রানি ও পারিবারিক ভাঙনের অন্যতম কারণ হলো বেপর্দা চলাফেরা ও চরিত্রের অবক্ষয়। ইসলাম তাই নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযম ও শালীনতার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রথমে পুরুষদের উদ্দেশে বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ -[সুরা নুর : ৩০]
এরপর নারীদেরকেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামে শালীনতা ও পবিত্রতা শুধু নারীর দায়িত্ব নয়; বরং নারী-পুরুষ উভয়ের যৌথ দায়িত্ব।
যে সমাজে নারী-পুরুষ উভয়েই সতীত্ব ও পর্দা মেনে চলে, সে সমাজে অশ্লীলতা কমে যায়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমান যুগে পর্দা ও সতীত্বের চ্যালেঞ্জ
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্র, নাটক ও নানা অপসংস্কৃতির কারণে সতীত্ব ও পর্দা রক্ষা করা অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়। অনেক সময় পর্দাশীল নারীদের পশ্চাৎপদ বা সেকেলে বলে কটাক্ষ করা হয়। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন নারী জানেন, মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই বড়। তাই তিনি সমাজের সমালোচনায় বিচলিত হন না; বরং গর্বের সঙ্গে ইসলামের বিধান মেনে চলেন।
পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী প্রশংসা লাভের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন অনেক বড় সাফল্য। একজন পর্দানশীন নারী যখন আল্লাহর নির্দেশ মেনে নিজের সতীত্ব রক্ষা করেন, তখন তিনি শুধু নিজেকেই নয়; বরং নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সুরক্ষিত করেন।
মুসলিম নারীর অহংকার
অহংকার সাধারণত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে অহংকার বলতে বোঝানো হয়েছেÑনিজের মর্যাদা, আদর্শ ও পরিচয় নিয়ে গর্ব করা। একজন মুসলিম নারী গর্ব করবেন এই ভেবে যে, তিনি আল্লাহর বিধান মেনে চলেন; তিনি নিজেকে সস্তা বিনোদনের উপকরণে পরিণত করেন না; তিনি নিজের চরিত্র ও মর্যাদাকে পৃথিবীর সব অলংকারের চেয়ে মূল্যবান মনে করেন।
পর্দা তাঁর জন্য শৃঙ্খল নয়; বরং সম্মানের মুকুট। সতীত্ব তাঁর দুর্বলতা নয়; বরং তাঁর শক্তি। লজ্জাশীলতা তাঁর পশ্চাৎপদতা নয়; বরং তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য।
ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য মহীয়সী নারী- হজরত খাদিজা (রা.), হজরত ফাতেমা (রা.), হজরত আয়েশা (রা.) এবং হজরত মারইয়াম (আ.)- সতীত্ব ও পর্দার মাধ্যমে উম্মাহর জন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাঁদের জীবন মুসলিম নারীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
মুসলিম নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য
সতীত্ব ও পর্দা ইসলামের অমূল্য শিক্ষা এবং মুসলিম নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য। এটি নারীর স্বাধীনতা হরণ করে না; বরং তাকে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্মান প্রদান করে। বর্তমান অশ্লীলতা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির যুগে সতীত্ব ও পর্দার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। তাই প্রত্যেক মুসলিম নারীর উচিত আল্লাহর বিধান মেনে সতীত্ব ও পর্দাকে জীবনের অলংকার হিসেবে গ্রহণ করা।
মনে রাখতে হবে, সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, যৌবন একদিন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু সতীত্বের মর্যাদা এবং পর্দার সম্মান দুনিয়া ও আখিরাত; উভয় জগতেই মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়- সতীত্ব ও পর্দা সত্যিই মুসলিম নারীর অহংকার, মর্যাদা ও গৌরবের চিরন্তন প্রতীক।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

