সীমান্তের ঊর্ধ্বে এক বিশ্বমনীষী
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর বাংলাদেশ সফর ও কিছু কথা
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৯:০৩
ঐতিহ্য, আতিথেয়তা ও বায়তুল মোকাররমের মিম্বর
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মুসলিম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের আগমন, জুমার আগে-পরে তাদের মূল্যবান বয়ান এবং তার মাধ্যমে এ দেশের মানুষের উপকৃত হওয়া বাংলাদেশের এক দীর্ঘকালীন চমৎকার ঐতিহ্য। এ দেশের আলেম-ওলামা এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনতা বিশ্বমানের আলেমদের বরাবরই বিপুল মূল্যায়ন ও শ্রদ্ধা করে আসছেন। বাঙালি জাতিগতভাবেই অতিথি পরায়ণ এবং উদার। তাবলীগ জামাত বা অন্য কোনো উপলক্ষে বিদেশী মেহমানরা এ দেশে এলে আমরা তাদের বুক উজাড় করে স্বাগত জানাই। পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের মেহমানদারির মধ্যে যে এক বিরাট ঐতিহ্যগত পার্থক্য রয়েছে, তা সর্বজনবিদিত।
বছরজুড়েই ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওলামায়ে কেরাম এ দেশে আসেন এবং দারুণভাবে সমাদৃত হন। বিশেষ করে দারুল উলুম দেওবন্দের পক্ষ থেকে কোনো মেহমান এলে এ দেশের মানুষ অত্যন্ত উদারভাবে তা গ্রহণ করে। কারণ, বাংলাদেশের কওমি ধারার আলেমদের প্রধান শিকড় ভারত কিংবা পাকিস্তানে প্রোথিত। এ দেশের শীর্ষ আলেমদের অধিকাংশেরই পড়াশোনা বা উচ্চশিক্ষা এই দুই দেশে।
বিশ্বমঞ্চে আমাদের অবস্থান: খতীব মুফতী আব্দুল মালেক ও মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান
পারস্পরিক অধিকারের জায়গা থেকে বাংলাদেশের আলেমদেরও অন্য দেশে গিয়ে সমমানের মর্যাদা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের আলেম বা ইসলামি স্কলার তৈরি হওয়ার হার তুলনামূলক কম। আলিয়া বা কওমি উভয় ধারার আলেমদের বড় অংশই বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুধু আরবি এবং উর্দু ভাষার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের চিন্তা পৌঁছায় কম। কওমী ধারার আলেমদের একাংশ বহুভাষী হলেও তাদের লেখালেখির মূল মাধ্যম বাংলা। ইদানীং কিছু আলেম আরবি বা উর্দুতে লিখছেন, তবে আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি বইয়ের সংখ্যা আমাদের এখানে এখনও নগণ্য।
অবশ্য এর মধ্যেও ব্যতিক্রমী কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র আমাদের রয়েছেন। যেমন বায়তুল মোকাররমের বর্তমান খতিব, মুসলিম বিশ্বের বরেণ্য হাদিস বিশারদ মুফতি আব্দুল মালেক, মুফতি হিফজুর রহমান, মাওলানা আরীফ উদ্দিন মারুফ প্রমূখ। মুফতী আব্দুল মালেক তুরস্ক, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে স্বমহিমায় আমন্ত্রিত হন এবং বক্তব্য দেন। অতীতে আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র হয়েও কওমি ঘরানার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখা মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান (রহ.) ছিলেন ‘রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী’ (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি মধ্যপ্রাচ্য, লিবিয়াসহ বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে ‘রাষ্ট্রীয় অতিথি’ হিসেবে আমন্ত্রিত হতেন।
মেধার সংকট নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দীনতা?
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনও আন্তর্জাতিক মানের কোনো ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, যেখানে মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এসে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করবে। আমাদের দ্বীনি সিলসিলার মূল কেন্দ্রগুলো এখনও ভারতের ভূখণ্ডেই অবস্থিত যেমন কওমি ধারার কেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দ, তাবলীগের আন্তর্জাতিক মারকাজ দিল্লির নিজামুদ্দিন এবং মধ্যপন্থার তাত্ত্বিক কেন্দ্র নদওয়াতুল উলামা, লখনৌ।
ভারত দীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলিম শাসনে ছিল, যার ফলে উপমহাদেশের মুসলিমদের মূল ঐতিহ্য ও প্রাচীন অলি-আল্লাহদের কেন্দ্রগুলো ভারতেই রয়ে গেছে। যদিও ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা ও সার্বভৌম সীমান্ত পেয়েছি, কিন্তু আমাদের আধ্যাত্মিক শিকড় রয়ে গেছে সেখানেই। ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদী বা ‘দাদাগিরি’র নীতির কারণে এ দেশের মানুষ যৌক্তিকভাবেই ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে। তবে ভারতের সাধারণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মুসলিম জনসাধারণের সাথে বাংলাদেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক মেলবন্ধন অটুট। দুর্ভাগ্যবশত, সেকুলার ভারত আজ চরম হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারার আগ্রাসনে বৈশ্বিক ভাবমূর্তির দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে।
যখন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং আমাদের আলেমরা ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সমাদৃত বই লিখবেন, তখনই বিশ্বসফরে আমাদের আলেমরাও কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাবেন। নবীন আলেমদের প্রতি আমার জোরালো আহ্বান তারা যেন ইংরেজি ও আন্তর্জাতিক ভাষা চর্চায় মনোযোগী হন এবং নিজেদের ‘বিশ্বনাগরিক’ ও ‘বিশ্বদাঈ’ হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তার ফেরিওয়ালা আল্লামা ডক্টর সাজ্জাদ নোমানী
এই পটভূমিতে, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক, ইসলামি রেনেসাঁর অগ্রদূত এবং মাসিক ‘আল ফুরকান’ সম্পাদক আল্লামা ডক্টর খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী-র বাংলাদেশে ১১ দিনের সফর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)-এর চিন্তার সার্থক ব্যাখ্যাকার ও ভাষ্যকার তিনি। উপমহাদেশের আলিয়া, কওমি, আহলে হাদিস কিংবা বেরলভি— সব ধারার হাদিসের সনদের মূল উৎসই হলো শাহ ওয়ালিউল্লাহর পরিবার। আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী বিশ্বজুড়ে মূলত এই মহান ইমামের বৈপ্লবিক ও সংস্কারমুখী চিন্তারই ফেরি করেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বমঞ্চে বিচরণ করা এই মহান মনীষীকে কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
গতকাল তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির হলরুমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ও চমৎকার বক্তব্য দিয়েছেন। ডক্টর মুফতী মুহাম্মদ গোলাম রব্বানীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সেই সুধী সমাবেশে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী ব্যাখ্যা দেন। তিনি জ্ঞান বা শিক্ষাকে ‘ধর্মীয়’ ও ‘জাগতিক’ (দুনিয়া ও আখেরাত) এভাবে সংকীর্ণভাবে বিভাজন না করে একে একটি ‘অবিভাজ্য’ সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেন। জ্ঞানকে তিনি মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছেন:
১. ইলমে নাফে (উপকারী জ্ঞান)
২. ইলমে গায়রে নাফে (অপকারী বা ক্ষতিকর জ্ঞান)
তিনি আধুনিক শিক্ষার ইতিবাচক দিকগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং শিক্ষার এই অবিভাজ্য রূপটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর বক্তব্যের সিংহভাগই প্রদান করেন চমৎকার ইংরেজিতে। উর্দু তাঁর মাতৃভাষা হলেও তিনি আরবি ও ইংরেজিতে সমান পারদর্শী। ইতোপূর্বে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতিসংঘের বিশেষ আয়োজনেও বক্তব্য রেখেছেন।
সমালোচনা বনাম গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি
বায়তুল মোকাররমে জুমার পূর্বে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর উর্দু ভাষায় বয়ান করা নিয়ে কিছু মহলে সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর মতো বিশ্ববরেণ্য দাঈদের কোনো নির্দিষ্ট সীমান্ত বা ভাষার ফ্রেমে বন্দি করা যায় না। আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী সাহেবও তেমনি এক বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব, যিনি পৃথিবীর মানুষকে সম্বোধন করেন। ভারতেও তিনি মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য অমুসলিম ও সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে সোচ্চার। তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লোক নন; বরং সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক অথচ গভীর রাজনৈতিক সচেতনতাসম্পন্ন এক দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রাজ্ঞ আলেম প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক চিন্তাধারার এক অপূর্ব সমন্বয়ক।
বায়তুল মোকাররমে জুমার পূর্বের আলোচনায় তিনি খাদ্য নিরাপত্তা, দেশের নিরাপত্তা এবং কীভাবে কুরআনি রূপরেখা অনুসরণ করে বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে সেই অনন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই মহান বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বকে জাতীয় মসজিদের মিম্বারে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বায়তুল মোকাররম কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
আমাদের দেশের আলেমরা কেন দিল্লি জামে মসজিদ কিংবা পাকিস্তানের বড় মারকাজগুলোতে এভাবে মূল্যায়িত হন না তা মূলত আমাদেরই প্রাতিষ্ঠানিক ও ভাষাগত ব্যর্থতা। আমরা আমাদের মনীষীদের বিশ্বমঞ্চে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি। আমরা যদি মুফতি মেঙ্ক, ড. জাকির নায়েক কিংবা শেখ ইয়াসির কাযীর মতো স্কলারদের দিকে তাকাই, তবে দেখব তাদের গ্রহণযোগ্যতা কোনো মানচিত্রের সীমানায় আটকে নেই। তারা বিশ্বমানের যোগ্যতাসম্পন্ন বলেই যেকোনো দেশে সরকারি বা বেসরকারিভাবে সমাদৃত হন।
মুফতি আব্দুল মালেকের বিনয় ও এক নজিরবিহীন দৃশ্য
আজকের জুমার মজলিসে বায়তুল মোকাররমে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়েছে। বাংলাদেশের গৌরব, প্রাজ্ঞ আলেম মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর পাশে নিচু হয়ে বসে ছিলেন। এই দৃশ্যটি মুফতী আব্দুল মালেক সাহেবের সুউচ্চ বিনয় ও প্রজ্ঞার এক অনন্য স্মারক।
ব্যক্তিগতভাবে দুই-একটি সেমিনারে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের সাথে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। একবার একটি প্রোগ্রামের শুরুতে আমি তাকে ‘মুফতী সাহেব’ বলে সম্বোধন করায় তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমাকে বলেছিলেন, “আমাকে মুফতি বলবেন না, আমি আব্দুল মালেক।” এটিই ছিল তাঁর প্রকৃত অহংকারহীন রূপ। তিনি বিশ্বমানের আলেম হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সর্বদা গুটিয়ে রাখেন, আর হাদিসের ঘোষণা অনুযায়ী যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ ও চিন্তার বিপ্লব
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী বাংলাদেশে কোনো প্রথাগত ওয়াজ মাহফিল করতে আসেননি। তিনি এসেছেন সেমিনার ও ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে শিক্ষা, তাযকিয়া আত্মশুদ্ধি ও চিন্তা সংস্কারের বার্তা দিতে। সফরে তিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর বিশ্বখ্যাত কালজয়ী কিতাব ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’-এর দরস দিয়েছেন।
আমার বিনীত প্রস্তাব এই কিতাবটি আমাদের আলিয়া বা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যতালিকায়, কওমি মাদ্রাসার উচ্চস্তরে এবং ‘তাখাসসুসাত’ (উচ্চতর গবেষণা বিভাগ) সমূহে বাধ্যতামূলক পাঠ্যভুক্ত করা হোক। দেওবন্দের প্রয়াত শাইখুল হাদিস আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.) এই কিতাবের প্রায় ১১ খণ্ডের একটি অনন্য উর্দু ব্যাখ্যাগ্রন্থ (রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআহ) লিখে গেছেন। বাংলা সাহিত্যের অগ্রপথিক আখতার ফারুক সাহেব এই কিতাবের একটি সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। আমার নিজস্ব সংগ্রহে সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত কিতাবটির মূল আরবির ৩ খণ্ডের একটি সংস্করণ রয়েছে। এই কিতাব মানুষের চিন্তার জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে এখনও এই কিতাবের পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত অনুবাদ হয়নি। যারা আরবি ও বাংলা উভয় ভাষায় সমান পারদর্শী, তাদের উচিত মূল আরবি থেকে ৩ খণ্ডের এই কিতাবটির একটি প্রাঞ্জল অনুবাদ সম্পন্ন করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব নেওয়া।
আধ্যাত্মিকতা ও নতুন শিক্ষাধারার সমন্বয়কারী
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী মূলত পশ্চিমা চিন্তার আগ্রাসন থেকে মুসলিম বিশ্বকে রক্ষা করা এবং আগামী দিনের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করার মিশন নিয়ে কাজ করছেন। তরুণ ওলামায়ে কেরামের মাঝে যেন এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়, তারা যেন সংকীর্ণতা পরিহার করে উদার দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে পারেন এটাই তাঁর লক্ষ্য। তিনি সাধারণ শিক্ষিত সমাজ ও আলেমদের দূরত্ব ঘোচাতে এবং মুসলিমদের সাথে অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের সেতুবন্ধন তৈরি করতে চান।
তিনি একাধারে দেওবন্দী, নদভী এবং মাদানী এই তিন ধারার চিন্তার এক অপূর্ব সমন্বয়ক। ঐতিহ্যবাহী দরসে নিজামীর সাথে আধুনিক শিক্ষার ইতিবাচক দিকগুলোর সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি ভারতে শিক্ষার একটি নতুন সফল মডেল প্রতিষ্ঠা করেছেন। একই সাথে তিনি একজন উচ্চমাপের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, বস্তুবাদের করাল গ্রাস থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্ত করতে হলে ‘তাজকিয়াতুন নাফস’ বা আত্মশুদ্ধির চর্চা অপরিহার্য।
উল্লেখ্য, তাঁর পিতা আল্লামা মনযূর নোমানী (রহ.) ছিলেন গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের এক অনন্য কিতাবের রচয়িতা, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও যুগশ্রেষ্ঠ তার্কিক (মুনাযির)। তাঁর লেখা ‘ইসলাম কেয়া হ্যায়’, ‘দ্বীন ও শরিয়ত’, ‘তাসাউফ কেয়া হ্যায়’ এবং ‘মাআরিফুল হাদিস’-আট খন্ড এর মতো অনন্য কিতাবগুলো বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে এ দেশের আলেম ও সাধারণ পাঠকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী সেই মহান পিতারই যোগ্য উত্তরসূরি।
সীমান্তের ওপারে এক আলোর মশাল
যারা মনে করেন ভারত বা পাকিস্তান থেকে আলেমদের এনে কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, তাদের ধারণা সঠিক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান থেকে ১০-১৫ জন শীর্ষ আলেম এবং ভারত থেকেও অনেকে এসেছেন। একে কোনো বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক চশমায় দেখা উচিত নয়। মুসলিম উম্মাহর চিন্তার পরিধি হতে হবে ঈমানের সীমান্ত দিয়ে— যেখানে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’-এর কোনো ভৌগোলিক কাঁটাতার নেই।
তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন সেমিনারে কথা বলছেন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এখন বাকস্বাধীনতা ও সমালোচনার অবারিত পরিবেশ রয়েছে; সুতরাং তাঁর সমালোচনা করার অধিকার যে কারও আছে। তবে আমার অনুরোধ, সমালোচনা করার আগে তাঁর চিন্তাধারা ও কাজ সম্পর্কে জানুন। আশা করি, তাঁর আলোচনা শুনলে এবং তাঁর আধ্যাত্মিক মোনাজাতের দৃশ্য দেখলে আপনিও প্রভাবিত না হয়ে পারবেন না।
ব্যক্তিগতভাবে তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি এখনো তাঁর খুব কাছে যেতে পারিনি। যে শহরে আমি থাকি, সেখান থেকে মেহমানকে একনজর দেখার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে ফজরের পর ট্রেন ধরতে গিয়েও ট্রেনটি মিস করেছি। তবে আমার প্রবল ইচ্ছা আছে, চলমান সফরের কোনো একটি প্রোগ্রামে দূর থেকে হলেও এই মহান মনীষীকে একনজর দেখার। আমি তাকে ভারতীয় বা পাকিস্তানি কোনো রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে বিবেচনা করি না; তিনি এই যুগের এক বিশ্ব নাগরিক, ইলমি সিলসিলার একটি সোনালী কড়া।
জীবনের এই খেলাঘরে, বেলাশেষে, বাংলাদেশের এই জনপদে তাঁর এই সফর বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তার লড়াইয়ে এক কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই অনন্য ব্যক্তিত্বকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন, তাদের প্রতি আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুকরিয়া ও ধন্যবাদ। আল্লাহ তাআলা এই আধ্যাত্মিক ও আধুনিক জ্ঞানালোকিত ব্যক্তিত্বের জীবন সুন্দর করুন এবং তাকে হায়াতে তাইয়্যেবা দান করুন। তাঁর এই সফর এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক নতুন চেতনার আলো জ্বালিয়ে দিক এই আমাদের বিনীত প্রত্যাশা।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

