Logo

ধর্ম

বিবাহ বিলম্ব ও তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৪

বিবাহ বিলম্ব ও তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ

তারুণ্য মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক পরিবর্তনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন ও পরিকল্পনা গড়ে ওঠে। ইসলাম এই স্বাভাবিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি; বরং মানুষের স্বভাব, চাহিদা ও মর্যাদাকে বিবেচনায় রেখে বিবাহকে একটি পবিত্র, নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কিন্তু বর্তমান সমাজে বিবাহ ক্রমেই বিলম্বিত হচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নানা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা বিশেষ করে যুবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সুরা আর-রূম, ৩০:২১)

এই আয়াত আমাদের জানায়, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক দায়িত্বের একটি মহান ব্যবস্থা।

ইসলামের উৎসাহ:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের উদ্দেশে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি নির্দেশনা দিয়েছেন—"হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ এটি দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের অধিক হেফাজতকারী। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কারণ তা তার জন্য প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের উপায়।" (সহিহ বুখারি)

এই হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহকে শুধু পারিবারিক জীবনের সূচনা হিসেবে নয়, বরং নৈতিক পবিত্রতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছেন।

কেন বাড়ছে বিবাহ বিলম্ব:

বর্তমান সমাজে বিবাহ বিলম্বের পেছনে নানা কারণ রয়েছে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। অনেক তরুণ মনে করেন, বড় বাড়ি, মোটা অঙ্কের সঞ্চয় কিংবা প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ করা উচিত নয়। আর অনেক পরিবারও এমন প্রত্যাশা করে।

দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা। বিয়েকে সহজ না রেখে ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান, অপ্রয়োজনীয় আয়োজন ও সামাজিক প্রতিযোগিতার বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

তৃতীয়ত, অবাস্তব প্রত্যাশা। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন শর্ত আরোপ করা হয়, যা বাস্তবে পূরণ করা কঠিন। ফলে উপযুক্ত প্রস্তাবও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়।

চতুর্থত, ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক মানসিকতা। শিক্ষা ও কর্মজীবন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কখনো কখনো বিবাহকে অযথা দীর্ঘদিন পিছিয়ে দেওয়া হয়, যেন এটি জীবনের জন্য অতিরিক্ত বোঝা।

বিলম্বের চ্যালেঞ্জ:

বিবাহ বিলম্বের কারণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নৈতিক নিরাপত্তা। বর্তমান যুগে অশ্লীলতা, অবাধ মেলামেশা এবং অনৈতিক সম্পর্কের সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এমন পরিবেশে দীর্ঘদিন অবিবাহিত থাকা অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।

এ ছাড়া মানসিক একাকীত্ব, হতাশা, উদ্বেগ এবং আবেগিক অস্থিরতাও অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়। সামাজিক চাপ ও পারিবারিক প্রত্যাশাও তাদের ওপর বাড়তি মানসিক বোঝা সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে, অবৈধ সম্পর্ককে স্বাভাবিক মনে করার প্রবণতা সমাজে নৈতিক অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করে। ইসলাম এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বিবাহকে সহজ করার শিক্ষা দিয়েছে।

বিবাহকে সহজ করার শিক্ষা:

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "সর্বাধিক বরকতময় বিবাহ হলো, যে বিবাহে ব্যয় ও কষ্ট সবচেয়ে কম।" (অর্থগতভাবে বিভিন্ন হাদিসে এ শিক্ষা এসেছে; যেমন মুসনাদ আহমদ ও অন্যান্য গ্রন্থে সহজ বিবাহের প্রতি উৎসাহ বর্ণিত হয়েছে।) ইসলাম চায় না বিবাহ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে উঠুক। বরং পারস্পরিক দ্বীনদারিতা, চরিত্র ও দায়িত্ববোধকে প্রাধান্য দেওয়া হোক।

যুবকদের করণীয়:

যেসব তরুণ এখনো বিবাহের সামর্থ্য অর্জন করেননি, তাদের জন্যও ইসলামের সুন্দর দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাদের উচিত—

নিয়মিত সালাত ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা। দৃষ্টি সংযত রাখা। অশ্লীলতা ও হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা। প্রয়োজন অনুযায়ী নফল রোজা রাখা। সৎ বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করা। পড়াশোনা, দক্ষতা অর্জন ও হালাল জীবিকা অর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া।

অন্যদিকে অভিভাবকদেরও উচিত সন্তানের বিবাহকে অযথা কঠিন না করা। দ্বীনদার ও চরিত্রবান পাত্র-পাত্রীর ক্ষেত্রে সামাজিক লোকদেখানো, অতিরিক্ত দাবি কিংবা অযৌক্তিক বিলম্ব থেকে বিরত থাকা।

ভারসাম্যের শিক্ষা: 

তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম বিবাহের প্রতি উৎসাহ দিলেও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। তাই আবেগের বশে নয়, বরং আর্থিক, মানসিক ও পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থেকে বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। যাদের সামর্থ্য এখনো হয়নি, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা ও তাকওয়ার মাধ্যমে আত্মসংযমের শিক্ষা দিয়েছেন। অর্থাৎ ইসলাম একদিকে বিবাহকে সহজ করতে বলে, অন্যদিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করে না। এই ভারসাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য।

পরিশেষে, বিবাহ বিলম্ব আজ শুধু একটি পারিবারিক বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর সমাধানও কেবল ব্যক্তিগত নয়; পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত সচেতনতার প্রয়োজন।

যুবকদের উচিত নিজেদের চরিত্র, ইলম ও জীবিকার প্রস্তুতি নেওয়া। অভিভাবকদের উচিত বিবাহকে সহজ করা এবং সমাজের উচিত অপ্রয়োজনীয় রীতি-নীতি ও লোকদেখানো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা।

আর হ্যাঁ মনে রাখতে হবে, ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ কোনো বোঝা নয়; এটি পবিত্রতা, প্রশান্তি, দায়িত্ব এবং মানবজীবনের একটি বরকতময় অধ্যায়। তাই আমাদের প্রত্যাশা হোক—এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে বিবাহ সহজ হবে, চরিত্র নিরাপদ থাকবে এবং তারুণ্য আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে বিকশিত হবে।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন