Logo

ধর্ম

বিশ্বকাপ খেলায় উচ্ছ্বাস, ফজরের ডাকে উদাসীনতা

এক হৃদয়জাগানিয়া ভাবনা

Icon

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১৮:৪১

বিশ্বকাপ খেলায় উচ্ছ্বাস, ফজরের ডাকে উদাসীনতা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, যিনি আমাদের মুসলিম হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাঁর ইবাদত। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদ (সা:)-এর প্রতি, যিনি মানবজাতিকে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথ দেখিয়েছেন।

বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজের একটি বড় সংকট হলো অগ্রাধিকারের পরিবর্তন। অনেক মানুষ এমন বিষয়ে গভীর আগ্রহ ও আবেগ দেখায়, যা তাদের দুনিয়াবি আনন্দ দিলেও আখিরাতের কোনো উপকার করে না। ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্যান্য বৈধ বিনোদন ইসলামে নিজে নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু যখন কোনো বিনোদন ফরজ সালাতকে অবহেলার কারণ হয়, আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, সময়ের অপচয় ঘটায় এবং অন্য মানুষের কষ্টের কারণ হয়, তখন সেটি একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বকাপ বা বড় কোনো ফুটবল ম্যাচের সময় আমরা দেখি, রাত গভীর হওয়ার আগেই অনেক এলাকায় উৎসব শুরু হয়ে যায়। ভুভুজেলার শব্দ, উচ্চস্বরে চিৎকার, মোটরসাইকেলের বহর, আতশবাজি ও উল্লাসে অনেক শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ এবং পরীক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন। একজন মুসলিমের চরিত্র কি এমন হওয়া উচিত?

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।"(সহিহ বুখারি: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম: ৪৭)অতএব, এমন আনন্দ-উল্লাস যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়, ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?

আল্লাহ তা'আলা বলেন,আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।(সূরা আয-যারিয়াত:৫৬) এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত আল্লাহর ইবাদত। খেলাধুলা, ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন—এসব জীবনের অংশ হতে পারে, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য নয়।

আল্লাহর ভালোবাসা নাকি দুনিয়ার মোহ?

আল্লাহ তা'আলা বলেন,বলুন, যদি তোমাদের পিতা, সন্তান, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, উপার্জিত সম্পদ, ব্যবসা এবং প্রিয় বাসস্থান আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে সংগ্রামের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর ফয়সালা নিয়ে আসেন।(সূরা আত-তাওবাহ:২৪) এই আয়াতের শিক্ষা হলো—মুমিনের হৃদয়ে সর্বোচ্চ স্থান হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা:)-এর। আজ আমরা একটি ম্যাচের সময় ভুল করি না, কিন্তু অনেকেই ফজরের সালাতের সময় ভুলে যাই। একটি খেলার জন্য রাত জাগতে কষ্ট হয় না, অথচ আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে কষ্ট হয়। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

ফজরের সালাতের মর্যাদা

ফজরের সালাত এমন একটি ইবাদত, যার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা:)বলেছেন,মুনাফিকদের কাছে সবচেয়ে ভারী সালাত হলো এশা ও ফজরের সালাত। যদি তারা এর ফজিলত জানত, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এতে উপস্থিত হতো।"

(সহিহ বুখারি: ৬৫৭; সহিহ মুসলিম: ৬৫১) এই হাদিসে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, নবী (সা:) ফজরের সালাতকে অবহেলা করার আচরণকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন; তিনি প্রত্যেক নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে "মুনাফিক" বলে রায় দেননি। তাই আমাদেরও উচিত আচরণের সমালোচনা করা, ব্যক্তির অন্তরের ঈমানের ফয়সালা না করা।

সালাত অবহেলার ভয়াবহতা

আল্লাহ তা'আলা বলেন,তাদের পরে এমন এক প্রজন্ম এল, যারা সালাত নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করল; অতএব তারা অচিরেই ধ্বংসের সম্মুখীন হবে।"(সূরা মারইয়াম:৫৯) আরও বলেন,অতএব দুর্ভোগ সেইসব সালাত আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন।"(সূরা আল-মাউন:৪–৫) এ আয়াতগুলো আমাদের সতর্ক করে যে, সালাতকে অবহেলা করা ঈমানের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

উম্মাহর প্রতি দায়িত্ব

আজ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মুসলমানরা যুদ্ধ, নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার। একজন মুসলিম হিসেবে তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের কষ্টে ব্যথিত হওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব।

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,মুমিনরা পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো দেহ জেগে থাকে।"(সহিহ বুখারি: ৬০১১; সহিহ মুসলিম: ২৫৮৬)

এর অর্থ এই নয় যে, পৃথিবীর কোথাও মুসলমান কষ্টে আছে বলে সব বৈধ বিনোদন হারাম হয়ে যায়। বরং শিক্ষা হলো—একজন মুসলিম যেন নিজের আনন্দের মাঝেও উম্মাহর প্রতি দায়িত্ববোধ হারিয়ে না ফেলে এবং আল্লাহর হককে অবহেলা না করে।

সময়—আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান আমানত

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার সময়। হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একটি মুহূর্তও আর ফিরে আসে না। তাই ইসলাম সময়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,শপথ সময়ের! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।"(সূরা আল-আসর:১–৩)

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন,মানুষ যদি কেবল সূরা আল-আসর নিয়েই চিন্তা করত, তবে এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। রাতের পর রাত একটি খেলার জন্য জেগে থাকা, অথচ কোরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ বা ফজরের সালাতের জন্য সময় না বের করতে পারা—এটি একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,কিয়ামতের দিন বান্দার দুই নিয়ামত সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কীভাবে কাটিয়েছে এবং তার যৌবন কোথায় ব্যয় করেছে।" (জামি' আত-তিরমিযি: ২৪১৭)

অপচয় ও অযথা উল্লাস

আজ অনেক সময় দেখা যায়, একটি খেলা উপলক্ষে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করা হয় পতাকা, আতশবাজি, শোভাযাত্রা কিংবা শব্দসৃষ্টিকারী সামগ্রীর পেছনে। অথচ পাশের দরিদ্র প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার সময় হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।"(সূরা আল-ইসরা:২৭) ইসলাম আনন্দ করতে নিষেধ করেনি; কিন্তু অপচয়, অহংকার এবং মানুষের কষ্টের কারণ হওয়া নিষিদ্ধ করেছে।

প্রতিবেশীর হক

অনেক সময় গভীর রাতে চিৎকার, হর্ন, ভুভুজেলা বা আতশবাজির কারণে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও পরীক্ষার্থীরা কষ্ট পান। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।"(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৬) অতএব, মুসলমানের আনন্দও হবে শালীন, পরিমিত এবং অন্যের জন্য কষ্টের কারণহীন।

খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম বৈধ খেলাধুলাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং নবী (সা:) নিজেও দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন, সাহাবিদের তীরন্দাজি, ঘোড়দৌড় ও শরীরচর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন। কিন্তু যখন কোনো বিনোদন—ফরজ সালাত নষ্ট করে,আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে,অশ্লীলতা ও গালাগালির জন্ম দেয়,সময় ও অর্থের অপচয় ঘটায়,বা মানুষের কষ্টের কারণ হয়,তখন সেটি আর প্রশংসনীয় থাকে না। আল্লাহ বলেন,হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর স্মরণ থেকে যেন তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তোমাদের গাফেল না করে।"(সূরা আল-মুনাফিকূন:৯) যদি সম্পদ ও সন্তান গাফেল করতে পারে, তবে অন্য যেকোনো দুনিয়াবি ব্যস্ততাও পারে।

মুসলিম যুবকদের প্রতি আহ্বান

যৌবন হলো শক্তির সময়। এই সময়ে মানুষ যা অভ্যাস করে, তা-ই অনেক সময় সারাজীবন বহন করে। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে। তাদের একজন হলো সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে।"(সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১) প্রশ্ন হলো—আমাদের যৌবন কি আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় হচ্ছে, নাকি ক্ষণস্থায়ী বিনোদনে?

আত্মসমালোচনার সময়

আজ আমরা একটি দলের পরাজয়ে কাঁদি, কিন্তু নিজের গুনাহের জন্য কতবার কেঁদেছি? একজন খেলোয়াড়ের গোলে আমরা লাফিয়ে উঠি, কিন্তু কোরআনের একটি আয়াত শুনে আমাদের হৃদয় কতবার কেঁপেছে? একটি ম্যাচের জন্য আমরা বন্ধুদের ডাকি; কিন্তু ফজরের জামাতে যাওয়ার জন্য কজন বন্ধুকে ডেকেছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের নিজেদেরই দিতে হবে।

সালাতই হবে প্রথম হিসাব

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,কিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম যে আমলের হিসাব নেওয়া হবে তা হলো সালাত। যদি তা ঠিক থাকে, তবে তার সব আমল সফল হবে; আর যদি তা নষ্ট হয়, তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" (জামি' আত-তিরমিযি: ৪১৩; সুনান আন-নাসাঈ: ৪৬৫) তাই একজন মুসলিমের প্রথম চিন্তা হওয়া উচিত—আমার সালাত ঠিক আছে কি না।

দাওয়াতের ভাষা কেমন হবে?

কোনো মুসলিম ভাইকে সংশোধনের সময় আমাদের ভাষা হতে হবে কোমল ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন,আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।" (সূরা আন-নাহল:১২৫) তাই কাউকে অবমাননা বা গালমন্দ নয়; বরং ভালোবাসা, দলিল এবং উত্তম আচরণের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করাই নবী (সা:)-এর শিক্ষা।

পরিশেষে বলা যায়, একদিন এই পৃথিবীর সব বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে। সব তারকা একদিন অবসর নেবেন। কোটি মানুষের উল্লাসও একদিন নীরব হয়ে যাবে। কিন্তু কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং আল্লাহর দরবারে আমাদের সঙ্গে থাকবে না কোনো খেলোয়াড়, কোনো দল কিংবা কোনো ট্রফি। সেখানে আমাদের সঙ্গে থাকবে শুধু ঈমান, সালাত, কোরআন এবং নেক আমল।

আসুন, আমরা খেলাধুলাকে খেলাধুলাই রাখি; জীবনের উদ্দেশ্য বানাই না। আমরা এমন মুসলিম হই, যারা বৈধ আনন্দ গ্রহণ করে, কিন্তু কখনো আল্লাহর হককে বিসর্জন দেয় না। ফজরের আযান আমাদের কাছে যেন যেকোনো খেলার শেষ বাঁশির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়। আমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা যেন হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা:)-এর প্রতি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সালাতের হেফাজতকারী বানান, সময়ের সঠিক ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন, উম্মাহর কষ্ট অনুভব করার ঈমান দান করুন এবং আমাদের অন্তরকে তাঁর স্মরণে জীবিত রাখুন।"রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা'দা ইয হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আন্তাল ওয়াহ্হাব"(সূরা আলে ইমরান:৮) "হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করবেন না। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে বিশেষ রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দানকারী।"আমীন, ইয়া রব্বুল আলামীন।

লেখক : কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি 

ইমেইল : drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন