Logo

ধর্ম

ইদ্দত পালনের হিকমত ও তাৎপর্য

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৪:৫০

ইদ্দত পালনের হিকমত ও তাৎপর্য

ইসলামি শরিয়তে পারিবারিক জীবনের প্রতিটি বিধান গভীর প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিবাহ যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন, তেমনি বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর জন্য নির্ধারিত অপেক্ষাকালও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। ইসলামি পরিভাষায় এই অপেক্ষাকালকে 'ইদ্দত' বলা হয়। ইদ্দত শুধু একটি আইনি বিধান নয়; বরং এর মধ্যে নিহিত রয়েছে বংশরক্ষা, সামাজিক শৃঙ্খলা, পারিবারিক মর্যাদা ও মানসিক স্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

ইদ্দতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

'ইদ্দত' শব্দটি আরবি। এর আভিধানিক অর্থ হলো গণনা করা, হিসাব করা বা নির্ধারিত সময় গণনা করা। শরিয়তের পরিভাষায় ইদ্দত বলতে বোঝায়- বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কোনো নারী যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পুনরায় বিবাহ থেকে বিরত থাকে, সেই সময়কালকে ইদ্দত বলা হয়। এই বিচ্ছেদ তালাক, খুলা, ফাসখ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে।

ইদ্দতের বিধান কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও ফকিহগণের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এর বিস্তারিত বিধিবিধান নির্ধারিত হয়েছে।

ইদ্দতের প্রকারভেদ

নারীর অবস্থা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ইদ্দতের সময়কাল ভিন্ন ভিন্ন হয়। ইসলামি শরিয়তে প্রধানত পাঁচ প্রকার ইদ্দতের আলোচনা পাওয়া যায়।

এক. ঋতুবতী তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত: যে নারীর নিয়মিত ঋতুস্রাব হয় এবং তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে, তার ইদ্দত হলো তিন 'কুরু'। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন কুরূ পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে।' [সুরা বাকারা: ২২৮]

এখানে 'কুরু' শব্দের অর্থ নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে এর অর্থ তিনটি পবিত্র সময়কাল [তোহর]। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এর অর্থ তিনটি ঋতুস্রাব (হায়েজ)। হানাফি মাজহাবে এই মতটিই গৃহীত ও প্রচলিত। এই ইদ্দতের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে নারী গর্ভবতী কিনা এবং বংশপরিচয়ের ক্ষেত্রে কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।

দুই. যাদের ঋতুস্রাব হয় না তাদের ইদ্দত: কিছু নারীর বয়স বেশি হওয়ার কারণে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের এখনও ঋতুস্রাব শুরু হয়নি। এ ধরনের নারীদের জন্য ইদ্দতের সময়কাল তিন মাস। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ঋতুস্রাব থেকে নিরাশ হয়ে গেছে, তাদের ইদ্দত তিন মাস; আর যাদের এখনও ঋতুস্রাব হয়নি, তাদেরও ইদ্দত তিন মাস।' [সুরা তালাক: ৪] এ বিধান শরিয়তের সহজতা ও বাস্তবতাবোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তিন. গর্ভবতী নারীর ইদ্দত তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামীহারা কোনো নারী যদি গর্ভবতী হন, তাহলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত চলবে। সন্তান জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে, সময়কাল দীর্ঘ হোক বা সংক্ষিপ্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের মেয়াদ হলো তারা সন্তান প্রসব করবে।' [সুরা তালাক: ৪] এ বিধানের মাধ্যমে গর্ভস্থ সন্তানের পিতৃত্ব ও বংশপরিচয় নিশ্চিত করা হয়, যা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

চার. সহবাসের পূর্বে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত: বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর

মধ্যে যদি সহবাস সংঘটিত না হয় এবং তার আগেই তালাক দেওয়া হয়, তাহলে ওই নারীর জন্য কোনো ইদ্দত নেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তোমরা যদি মুমিন নারীদের বিয়ে করার পর তাদের স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক দাও, তাহলে তাদের জন্য তোমাদের গণনা করার মতো কোনো ইদ্দত নেই।' -[সুরা আহযাব: ৪৯] কারণ এ ক্ষেত্রে গর্ভধারণের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। তাই অপেক্ষাকালের প্রয়োজনও থাকে না।

পাঁচ. স্বামী মৃত্যুবরণ করলে ইদ্দত যে নারীর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন,

তার ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।' [সুরা বাকারা: ২৩৪] তবে যদি স্ত্রী গর্ভবতী হন, তাহলে চলবে। তার ইদ্দত চার মাস দশ দিনের পরিবর্তে সন্তান প্রসব পর্যন্ত এই ইদ্দতের সঙ্গে শোকপালনের বিষয়টিও জড়িত। ইসলামি পরিভাষায় একে 'হিদাদ' বলা হয়। এ সময় নারী অলংকার, সুগন্ধি ও সাজসজ্জা থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে মৃত স্বামীর প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও বৈবাহিক সম্পর্কের মর্যাদা প্রকাশ পায়।

ইদ্দতের হিকমত ও তাৎপর্য

ইদ্দতের বিধানের পেছনে বহু প্রজ্ঞা ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। প্রথমত, এটি বংশপরিচয় সংরক্ষণ করে। যদি তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পরপরই নতুন বিবাহের অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারত।

দ্বিতীয়ত, এটি দাম্পত্য সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেয়। বিশেষ করে তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল স্বামী-স্ত্রীকে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা করার এবং পুনর্মিলনের সুযোগ প্রদান করে। তৃতীয়ত, স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটি শোকপালনের একটি মর্যাদাপূর্ণ সময়। এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের মূল্যায়ন ও মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হয়।

চতুর্থত, ইদ্দত নারীর মানসিক স্থিতি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর একজন নারীর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় কঠিন হতে পারে। ইদ্দত তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেয়।

ইদ্দত পালনের হিকমত

ইদ্দত ইসলামি পারিবারিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য বিধান। এটি কোনো শাস্তি নয়; বরং নারী, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে প্রণীত এক প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থা। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নির্ধারিত এই অপেক্ষাকাল বংশরক্ষা, পারিবারিক মর্যাদা সংরক্ষণ, সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো ইদ্দতের বিধান যথাযথভাবে পালন করা এবং এর অন্তর্নিহিত হিকমত উপলব্ধি করা। ইসলামের প্রতিটি বিধানের মতো ইদ্দতের বিধানও প্রমাণ করে, আল্লাহ তাআলার আইন মানুষের কল্যাণ, মর্যাদা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই প্রণীত।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন