Logo

ধর্ম

ক্ষেত-খামার রক্ষায় কুকুর: কী বলে ইসলাম

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৪:৫৭

ক্ষেত-খামার রক্ষায় কুকুর: কী বলে ইসলাম

সভ্যতা যতই এগিয়ে যাক, প্রযুক্তি যতই বিস্ময় সৃষ্টি করুক, মানুষের জীবন এখনো এক গভীর সত্যের ওপর নির্ভরশীল—মাটি। উঁচু অট্টালিকা, আধুনিক শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতি—সবকিছুর ভিত্তিতে রয়েছে খাদ্য, আর খাদ্যের উৎস সেই কৃষিজমি। জমি অনাবাদী হলে সভ্যতার চাকাও একসময় থেমে যেতে বাধ্য।

এ কারণেই ইসলাম কৃষিকে কেবল জীবিকা অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং মানবকল্যাণ, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে।

মহান আল্লাহ বলেন, “তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্য পানীয় এবং বৃক্ষরাজি উৎপন্ন করেন। তিনি তা দ্বারা তোমাদের জন্য শস্য, যয়তুন, খেজুর, আঙুর এবং সব ধরনের ফল উৎপন্ন করেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আন-নাহল: ১০–১১)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো মৃত ভূমি। আমি তাকে জীবিত করি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করি, যা থেকে তারা আহার করে।” (সূরা ইয়াসিন: ৩৩)

এই আয়াতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কৃষি শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত নিদর্শন এবং মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম ভিত্তি।

একজন কৃষক তাই শুধু নিজের পরিবারের জন্য ফসল ফলান না; তিনি পুরো সমাজের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁর শ্রমের সুফল ভোগ করে শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব, মানুষ-পশুপাখি—সবাই। ইসলামে এই মহৎ শ্রমকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে বা কোনো ফসল ফলায়, এরপর তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৫৩)

এই হাদিস কৃষকের মর্যাদা ও কৃষিকাজের সামাজিক গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

তবে কৃষিকাজ শুধু বীজ বপন ও ফসল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফসলকে রক্ষা করাও কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামবাংলার বাস্তবতায় বন্য প্রাণী, চোর কিংবা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির হাত থেকে ক্ষেত-খামার ও গবাদিপশু রক্ষার প্রয়োজন বহু পুরোনো।এই বাস্তব প্রয়োজনকে ইসলামও স্বীকৃতি দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুকুর পোষে, প্রতিদিন তার আমল থেকে এক কিরাত কমে যায়। তবে শিকার, গবাদিপশু কিংবা ক্ষেত পাহারার জন্য রাখা কুকুর এর ব্যতিক্রম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, “শিকার, পশুপালন অথবা কৃষিকাজের প্রয়োজন ছাড়া যে কুকুর পালন করে, তার আমল থেকে প্রতিদিন দুই কিরাত কমে যায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭৫)

এই হাদিসগুলোর মাধ্যমে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে অপ্রয়োজনীয় শখ, বিলাসিতা বা অনর্থক কুকুর পালনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; অন্যদিকে মানুষের প্রয়োজন, জীবিকা এবং সম্পদ রক্ষার স্বার্থে ক্ষেত-খামার, গবাদিপশু কিংবা শিকারের কাজে কুকুর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তবে এই অনুমতি সীমাহীন নয়। ইসলাম প্রয়োজনকে বৈধতা দেয়, অপ্রয়োজনীয় আসক্তিকে নয়। তাই প্রয়োজন যেখানে শেষ, অনুমতির সীমাও সেখানে শেষ। পাশাপাশি ইসলামী ফিকহে কুকুর পালন ও তার পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে।

আজকের বাংলাদেশে কৃষি নানা সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ফসল চুরি, বন্য প্রাণীর আক্রমণ এবং বাজারের অনিশ্চয়তা কৃষকের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। এমন বাস্তবতায় ক্ষেত-খামার ও কৃষিসম্পদ রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রয়োজন।

অবশ্য বর্তমান যুগে শুধু কুকুরের ওপর নির্ভর না করে আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে। সৌরচালিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি, সেন্সর, আলো, বৈদ্যুতিক সতর্কসংকেত কিংবা কমিউনিটি পাহারার মতো উদ্যোগ কৃষকের সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলাম মানুষের কল্যাণে বৈধ ও উপকারী প্রযুক্তি গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার প্রতি উৎসাহিত করে।

কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে 'কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, একটি ফসল উৎপাদনের পেছনে কত পরিশ্রম, সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। তাই সেই ফসল ও কৃষিসম্পদ রক্ষা করাও উৎপাদনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষক শুধু নিজের জীবিকার জন্য কাজ করেন না; তিনি পুরো জাতির খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি নির্মাণ করেন। তাঁর শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, তাঁর উৎপাদন রক্ষা করা এবং তাঁর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।

ইসলামের শিক্ষা হলো ভারসাম্য, দায়িত্ববোধ এবং মানবকল্যাণ। ক্ষেত-খামার রক্ষায় কুকুর পালনের অনুমতিও সেই বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি উদাহরণ। আজ যখন খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে, তখন কৃষি ও কৃষকের প্রতি ইসলামের এই বাস্তবসম্মত নির্দেশনা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

কারণ মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যতদিন অটুট থাকবে, ততদিনই টিকে থাকবে সভ্যতার ভিত্তি। আর কৃষককে সম্মান করা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিকে সম্মান করা।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন