মানুষ ভুল করবে—এটাই তার স্বভাব। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারে। কখনো জেনে, কখনো না জেনে, কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায়, আবার কখনো শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ আল্লাহর অবাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, গুনাহ করার পরও একজন বান্দার জন্য আশার দরজা খোলা থাকে। সেই আশার নাম তাওবা। তাওবা শুধু গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা নয়; এটি নিজের ভুল উপলব্ধি করা, আন্তরিক অনুতাপ করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে আর না ফেরার দৃঢ় সংকল্পের নাম।
আল্লাহ তাআলা মানুষের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত। তাই তিনি তাঁর বান্দাদের হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। বরং যত বড় গুনাহই হোক না কেন, আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে তিনি ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা আজ-যুমার:৫৩)
এই আয়াতকে অনেক মুফাসসির কোরআনের অন্যতম আশাব্যঞ্জক আয়াত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ এখানে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের “হে আমার বান্দারা” বলে সম্বোধন করেছেন এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—আন্তরিক তাওবা করলে কোনো গুনাহই তাঁর ক্ষমার বাইরে নয়।
তাওবার গুরুত্ব বোঝাতে কোরআনে আরও বলা হয়েছে,হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পার।”(সূরা আন-নূর:৩১) এ আয়াত শুধু গুনাহগারদের জন্য নয়; বরং প্রত্যেক মুমিনের জন্য। কারণ ঈমানদার মানুষও ভুল করতে পারে এবং তারও নিয়মিত তাওবার প্রয়োজন রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই ছিলেন নিষ্পাপ। তবুও তিনি প্রতিদিন বহুবার আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন,আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরেরও বেশি বার ইস্তিগফার করি ও তাওবা করি।”(সহিহ বুখারি: ৬৩০৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি দিনে একশতবার তাওবা করতেন (সহিহ মুসলিম)। এটি আমাদের শেখায় যে, তাওবা কেবল গুনাহ মোচনের উপায় নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম ইবাদত।
ইসলামে তাওবার কয়েকটি মৌলিক শর্ত রয়েছে
প্রথমত, যে গুনাহ করা হয়েছে তার জন্য আন্তরিক অনুতপ্ত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সঙ্গে সঙ্গে সেই গুনাহ থেকে বিরত হতে হবে।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে আর সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। আর যদি গুনাহটি কোনো মানুষের হক নষ্ট করার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,প্রত্যেক আদমসন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম, যারা তাওবা করে।”(জামি' আত-তিরমিজি: ২৪৯৯; হাদিসটি হাসান হিসেবে গ্রহণযোগ্য) এই হাদিস মানুষের জন্য এক অনন্য সান্ত্বনা। ইসলাম মানুষকে ফেরেশতা হতে বলেনি; বরং ভুল করলে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে শিখিয়েছে।
তাওবার অন্যতম বড় উপকারিতা
হলো—এটি অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। গুনাহ মানুষের হৃদয়ে কালো দাগ সৃষ্টি করে। যদি সে তাওবা করে, সেই দাগ মুছে যায়। কিন্তু বারবার গুনাহ করেও তাওবা না করলে হৃদয় কঠিন হয়ে যায় এবং সত্য গ্রহণের শক্তি কমে যায়। তাই মুমিনের উচিত প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা এবং ভুল বুঝতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “আর যারা অশ্লীল কাজ করে ফেলে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তারপর আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে—আল্লাহ ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার আর কে আছে? আর তারা জেনে-বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অটল থাকে না।”(সূরা আলে ইমরান:১৩৫) এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মুমিন ভুল করলেও সে গুনাহকে স্বাভাবিক মনে করে না। বরং অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। এটাই একজন ঈমানদারের পরিচয়।
তাওবা মানুষকে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়। যে ব্যক্তি অতীতে অনেক অন্যায় করেছে, সেও আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে বহু সাহাবি ইসলাম গ্রহণের আগে নানা ধরনের অন্যায়ে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তাওবা ও ঈমানের মাধ্যমে তাঁরা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হন। এ থেকেই বোঝা যায়, অতীতের অন্ধকার ভবিষ্যতের আলোকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না, যদি মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
তাওবার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো—কোনো মানুষকে তার অতীত দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। যে ব্যক্তি আজ আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে এসেছে, সে আল্লাহর কাছে এমন মর্যাদা লাভ করতে পারে, যা অনেক নেককার মানুষও অর্জন করতে পারে না। কারণ আল্লাহ মানুষের বর্তমান অবস্থা ও আন্তরিকতাকে মূল্যায়ন করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা:২২২) একজন বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে যে, মহান রব নিজেই তাকে ভালোবাসেন। পৃথিবীর মানুষের ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা চিরস্থায়ী এবং আখিরাতের মুক্তির কারণ।
রাসুলুল্লাহ (সা:) তাওবার গুরুত্ব বোঝাতে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন,আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় এত বেশি আনন্দিত হন, যেমন তোমাদের কেউ মরুভূমিতে নিজের খাদ্য-পানীয়সহ উট হারিয়ে ফেলে, পরে হঠাৎ সেটি ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।”(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এ হাদিসে আল্লাহর আনন্দ মানুষের আনন্দের মতো নয়; বরং এটি মানুষের বোধগম্য করার জন্য একটি উপমা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে—আল্লাহ তাঁর বান্দার ফিরে আসাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন।
তাওবা কবুল হওয়ার লক্ষণ
আলেমগণ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে কয়েকটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন—
- গুনাহের প্রতি অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি হওয়া।
- নেক আমলের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া।
- নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে মনোযোগ বাড়া।
- খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা।
- মানুষের হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।
- গুনাহের কথা মনে হলে অনুতপ্ত হওয়া।
যদিও এসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে, তবু নিশ্চিতভাবে কারও তাওবা কবুল হয়েছে কি না—এ কথা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই মুমিনের করণীয় হলো আমৃত্যু তাওবা ও নেক আমলে অবিচল থাকা।
তাওবা করতে দেরি করা উচিত নয়
অনেকেই মনে করেন, বার্ধক্যে পৌঁছে তাওবা করবেন। কিন্তু মৃত্যুর সময় কেউ জানে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,কেউ জানে না, আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না, কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে।” (সূরা লুকমান:৩৪) তাই তাওবা বিলম্ব করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আজ যে সুযোগ আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,আল্লাহ বান্দার তাওবা গ্রহণ করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যায়।”(জামি' আত-তিরমিজি: ৩৫৩৭) অর্থাৎ মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্ত উপস্থিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তাওবার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর আলামত প্রকাশ পাওয়ার পর সেই তাওবা আর গ্রহণযোগ্য নয়।
তাওবার সঙ্গে নেক আমল
তাওবার পর নেক কাজ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। কারণ নেক আমল গুনাহের প্রভাব দূর করতে সাহায্য করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই সৎকাজ অসৎকাজকে মুছে দেয়।” (সূরা হুদ:১১৪) তাই তাওবার পাশাপাশি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, সত্যবাদিতা ও উত্তম চরিত্র গঠনের চেষ্টা করা জরুরি।
সমাজে তাওবার প্রয়োজন
আজ আমরা দুর্নীতি, মিথ্যা, সুদ, প্রতারণা, হিংসা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা ও পারিবারিক অশান্তির মতো নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়; মানুষের অন্তরের পরিবর্তনও প্রয়োজন। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো আন্তরিক তাওবা।
যখন একজন ব্যবসায়ী প্রতারণা থেকে তাওবা করেন, তখন বাজারে সততা ফিরে আসে। একজন কর্মকর্তা ঘুষ থেকে তাওবা করলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন যুবক অশ্লীলতা থেকে ফিরে এলে সমাজ পবিত্র হয়। একজন পরিবারপ্রধান অন্যায় আচরণ ত্যাগ করলে পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ তাওবা শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, সমাজকেও সুন্দর করে।
আমাদের করণীয়
প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় নিজের আমল পর্যালোচনা করা উচিত। ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে “আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি” পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মানুষের হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। গুনাহের পরিবেশ ও খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। শয়তান চায় মানুষ গুনাহ করে হতাশ হয়ে যাক; কিন্তু আল্লাহ চান তাঁর বান্দা অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছেই ফিরে আসুক।
পরিশেষে বলা যায়, তাওবা ইসলামের এমন এক মহান নিয়ামত, যা মানুষের অতীতের অন্ধকার মুছে নতুন জীবনের সূচনা করতে পারে। আল্লাহর রহমতের দরজা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খোলা থাকে। তাই আজই আমাদের উচিত অহংকার ও গাফিলতি ত্যাগ করে মহান রবের দরবারে ফিরে আসা। যে হৃদয় অশ্রুসিক্ত চোখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিক তাওবা করার তাওফিক দান করুন, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি দিন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করে ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
লেখক : কলাম লেখক ও প্রবন্ধকার; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

