যাদের সঙ্গে থাকেন তারাই আপনাকে গড়ে তোলে
সঙ্গ বদলালে বদলে যায় জীবন
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৭
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষক কে? বই, শিক্ষক, নাকি অভিজ্ঞতা?—প্রশ্নটির উত্তর একক নয়। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিনিয়ত শিখে চলে। তবে জীবনের এমন একটি শিক্ষক আছে, যার প্রভাব নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। সেই শিক্ষক হলো—তার সঙ্গ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, দক্ষতা গড়ে তোলে এবং জীবিকার পথ খুলে দেয়। কিন্তু একটি ডিগ্রি কখনো একজন মানুষকে পূর্ণ মানুষ বানাতে পারে না। কর্মজীবনে প্রবেশের পর মানুষ উপলব্ধি করে, বাস্তব জীবনের বহু শিক্ষা কোনো পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকে না।
ধৈর্য, নেতৃত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মানুষের সঙ্গে আচরণ, সংকট মোকাবিলা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুণগুলো শেখায় জীবন এবং সেই জীবনের মানুষগুলো।
ইসলাম জ্ঞানার্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কুরআনের প্রথম নাজিল হওয়া শব্দই ছিল—"ইকরা" (পড়ো)। আল্লাহ তাআলা বলেন, "বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা আয-যুমার: ৯)। কিন্তু ইসলাম কেবল জ্ঞান অর্জনের কথাই বলেনি; জ্ঞানকে সঠিক পথে পরিচালিত করার পরিবেশও নিশ্চিত করতে বলেছে।
একজন শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। বাবা-মায়ের চরিত্র, কথাবার্তা, আচার-আচরণ এবং পারিবারিক পরিবেশ তার নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করে। এরপর সমাজ তাকে বাস্তবতা শেখায়। কিন্তু কৈশোর ও যৌবনে এসে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ গঠনে সবচেয়ে বড় প্রভাব বিস্তার করে তার বন্ধুমহল ও সঙ্গ।
আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।" (সূরা আত-তাওবা: ১১৯)। এই আয়াত শুধু সৎ হওয়ার আহ্বান নয়; বরং সৎ মানুষের সান্নিধ্যে থাকারও নির্দেশ। কারণ মানুষ একা খুব কমই বদলায়; অধিকাংশ সময় সে বদলায় তার পরিবেশের প্রভাবে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। তাই সে যেন লক্ষ্য করে, কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)। অন্য একটি হাদিসে তিনি সৎ ও অসৎ সঙ্গীর তুলনা করেছেন সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের সঙ্গে। সুগন্ধি বিক্রেতার পাশে থাকলে অন্তত সুবাস পাওয়া যায়, আর কামারের পাশে থাকলে আগুন না লাগলেও ধোঁয়া ও দুর্গন্ধের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
আধুনিক মনোবিজ্ঞানও একই সত্যের প্রতিধ্বনি করে। মানুষের আচরণ, অভ্যাস এবং মানসিকতার বড় একটি অংশ তার সামাজিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ কারণেই একটি বহুল প্রচলিত ইংরেজি উক্তি রয়েছে— "You are the average of the five people you spend the most time with."
অর্থাৎ, আপনি যাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা, অভ্যাস ও মানসিকতার প্রতিফলন আপনার জীবনেও ফুটে ওঠে। এটি কোনো গাণিতিক হিসাব নয়; বরং মানুষের সামাজিক আচরণের একটি গভীর বাস্তবতা।
আজকের পৃথিবীতে সঙ্গের পরিধি আরও বিস্তৃত। এখন শুধু যাদের সঙ্গে আমরা চলাফেরা করি, তারাই নয়; বরং যাদের লেখা পড়ি, যাদের ভিডিও দেখি, যাদের অনুসরণ করি এবং প্রতিদিন যে বিষয়বস্তু আমাদের মনকে প্রভাবিত করে—তারাও আমাদের নীরব সঙ্গী। তাই বাস্তব জীবনের মতো ভার্চুয়াল জগতেও সচেতন থাকা জরুরি।
একজন মানুষ যদি সৎ, পরিশ্রমী, জ্ঞানপিপাসু ও আল্লাহভীরু মানুষের সান্নিধ্যে থাকে, তবে তার মধ্যেও সেই গুণাবলি বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
আবার নেতিবাচক, অলস কিংবা অনৈতিক পরিবেশ একজন সম্ভাবনাময় মানুষকেও ধীরে ধীরে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধু নির্বাচন আসলে ভবিষ্যৎ নির্বাচন।
জীবনের সাফল্য কেবল ভালো ফলাফল, উচ্চ বেতন কিংবা সামাজিক মর্যাদায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সফলতা হলো এমন চরিত্র গড়ে তোলা, যা মানুষকে সম্মানিত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে পরিচালিত করে। আর সেই চরিত্র গঠনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো সৎ সঙ্গ।
তাই মাঝে মাঝে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমি কাদের সঙ্গে চলছি? কারণ মানুষকে তার পরিচয় দিয়ে যতটা না চেনা যায়, তার চেয়ে বেশি চেনা যায় তার সঙ্গ দিয়ে। যাদের সঙ্গে থাকেন, তারাই আপনাকে গড়ে তোলে। সত্যিই, সঙ্গ বদলালে বদলে যায় জীবন।
লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

