Logo

ধর্ম

পরিবেশ সচেতনতায় কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ

(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৩

পরিবেশ সচেতনতায় কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ

পূর্ব প্রকাশের পর..

কোনো আদর্শ তখনই সমাজে স্থায়ী প্রভাব ফেলে, যখন তা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ইসলাম এ বিষয়ে শুধু নীতিগত নির্দেশনাই দেয়নি; বরং এমন জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়েছে, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, সংযম, দায়িত্ববোধ এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ একে অপরের পরিপূরক। কওমি মাদরাসাগুলো যদি এই চেতনাকে নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন অনুশীলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারে, তবে তা একটি নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করবে।

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো যুগ যুগ ধরে দ্বীনি জ্ঞান, নৈতিকতা ও আদর্শ মানুষ গঠনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। এখান থেকেই গড়ে ওঠেন ভবিষ্যতের ইমাম, খতিব, মুফতি, মুহাদ্দিস, শিক্ষক ও সমাজপথপ্রদর্শকেরা। তাঁদের চিন্তা, বক্তব্য ও জীবনাচরণ সমাজের অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস ও আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই একটি কওমি মাদরাসায় গড়ে ওঠা একটি ইতিবাচক সংস্কৃতি খুব সহজেই সমাজব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রতিটি মাদরাসায় একটি দীর্ঘমেয়াদি সবুজ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। ফলদ, বনজ, ঔষধি ও দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ, খালি জায়গাকে সবুজায়নের আওতায় আনা, ছাদে বাগান তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গাছের নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হলে কয়েক বছরের মধ্যেই মাদরাসাগুলো সবুজ পরিবেশের অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে পরিণত হতে পারে। একটি গাছের যত্ন নেওয়া শুধু পরিবেশের জন্য উপকারী নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ববোধ, ধৈর্য ও যত্নশীলতার মতো মূল্যবোধও গড়ে তোলে।

পরিচ্ছন্নতা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। তাই শ্রেণিকক্ষ, মসজিদ, অজুখানা, হোস্টেল, রান্নাঘর এবং মাদরাসা প্রাঙ্গণ সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন নয়; এটি একজন তালিবুল ইলমের চরিত্র ও আখলাকেরও পরিচয়। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে যেমন ইবাদতের একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়, তেমনি শিক্ষার পরিবেশও হয় অধিকতর সুন্দর ও প্রশান্তিময়।

একই সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি। অপ্রয়োজনীয়ভাবে কল খোলা রাখা, বৈদ্যুতিক বাতি বা পাখা চালিয়ে রাখা কিংবা খাবারের অপচয়—এসব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই সম্পদের মর্যাদা বুঝতে শিখবে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী অপচয় পরিহার শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি নৈতিকতারও অংশ।

পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে কেবল আলোচনা বা বক্তৃতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত কর্মসূচি ও বাস্তব অনুশীলন। প্রতিটি মাদরাসায় বৃক্ষরোপণ দিবস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পরিবেশবিষয়ক আলোচনা, দেয়ালিকা, রচনা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা এবং সবুজ ক্যাম্পাস কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি নিজের হাতে একটি গাছ রোপণ করে তার পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়, তবে সেই অভিজ্ঞতা তাদের সারা জীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে।

পরিবেশ নিয়ে আমার এই ভাবনা কেবল পড়াশোনা বা লেখালেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও অংশ। ছাত্রজীবনে আজমপুর দারুল উলুম মাদরাসায় অধ্যয়নকালে প্রিয় আসাতাজায়ে কেরামের সঙ্গে মাদরাসার আঙিনা ও ছাদে বৃক্ষরোপণের সুযোগ হয়েছিল। বহু বছর পরও সেই গাছগুলো সবুজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবার সেখানে গেলে মনে হয়, একটি ছোট্ট চারাও কত দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের স্মারক হয়ে উঠতে পারে।

পরবর্তীতে দারুল আজহার মডেল মাদরাসার ডিজিটাল ক্যাম্পাসে হোস্টেল সুপার ও আইটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করেছি। তখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, পরিবেশ রক্ষা কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়; এটি চরিত্র গঠন এবং দায়িত্বশীল মানুষ তৈরির একটি কার্যকর মাধ্যম।

বর্তমানে কতকিছুর হাটের মাধ্যমে কৃষক, কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করি—মাটি সুস্থ না থাকলে ফসল সুস্থ হয় না, আর পরিবেশ সুস্থ না থাকলে মানুষের জীবনও সুস্থ থাকতে পারে না। কৃষকের ঘাম, মাটির উর্বরতা, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বাতাস এবং মানুষের খাদ্য—সবকিছুই একই সুতোয় গাঁথা। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ মানে শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয়; বরং মানুষ, কৃষি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে নিরাপদ রাখা।

আজকের একজন তালিবুল ইলমই আগামী দিনের একজন ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও সমাজনেতা। তাঁর হাতে যদি কিতাবের পাশাপাশি একটি চারাও থাকে, তবে তিনি শুধু ইলমের নয়, জীবনেরও শিক্ষা দেবেন। একটি সবুজ কওমি মাদরাসা তাই কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সচেতন সমাজ, একটি মানবিক জাতি এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।

যে শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি জাগিয়ে তোলে, সেই শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিও দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি ইসলামে কখনোই কেবল সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি ঈমান, আমানতদারি এবং মানবিক দায়িত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই চেতনাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজের ভূমিকা হতে পারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে ব্যস্ত নগর পর্যন্ত কওমি মাদরাসার বিস্তৃতি রয়েছে। প্রতিদিন লাখো শিক্ষার্থী এখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আখলাক ও ইসলামী জীবনব্যবস্থার শিক্ষা গ্রহণ করছে। এখান থেকে গড়ে ওঠা আলেমরা শুধু মসজিদের ইমাম নন; তাঁরা সমাজের নৈতিক শিক্ষক, পারিবারিক পরামর্শদাতা এবং মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। ফলে তাঁদের একটি ইতিবাচক আহ্বান হাজারো মানুষের জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

এই বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণকে যদি দ্বীনি শিক্ষার একটি ব্যবহারিক অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, তবে তার সুফল সুদূরপ্রসারী হবে। জুমার খুতবা, দারসে হাদিস, ওয়াজ-মাহফিল, মক্তব ও মাদরাসার পাঠচক্রে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিচ্ছন্নতা, বৃক্ষরোপণ, পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, অপচয় বর্জন এবং আল্লাহর সৃষ্টিজগতের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা হতে পারে। এতে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি আলাদা কোনো প্রচারণা হিসেবে নয়, বরং ইসলামী জীবনচর্চার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মানুষের সামনে উঠে আসবে।

একই সঙ্গে প্রতিটি কওমি মাদরাসা নিজেদের পরিসরে কিছু বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। মাদরাসা প্রাঙ্গণে ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গাছের পরিচর্যা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্ন অজুখানা ও টয়লেট নিশ্চিত করা, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধ—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিকতা।

আমরা প্রায়ই বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি, অথচ ছোট ছোট কাজের শক্তিকে অবহেলা করি। কিন্তু একটি গাছ, একটি পরিচ্ছন্ন আঙিনা, একটি অপচয় রোধ কিংবা একটি সচেতনতামূলক আলোচনা—এসবের সম্মিলিত প্রভাবই একসময় সমাজে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, টেকসই পরিবর্তন কখনো হঠাৎ করে আসে না; তা গড়ে ওঠে ছোট ছোট সৎ উদ্যোগের ধারাবাহিকতায়।

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশকে গভীরভাবে স্পর্শ করছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ফসলের ক্ষতি এবং জীববৈচিত্র্যের সংকোচন আমাদের বাস্তবতা। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ মানুষের আচরণ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি হলো নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা।

আজকের একজন তালিবুল ইলম আগামী দিনের একজন ইমাম, খতিব, শিক্ষক কিংবা সমাজনেতা। তিনি যদি ছাত্রজীবনেই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস, গাছের প্রতি ভালোবাসা, প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ইসলামী শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করেন, তাহলে কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য মানুষকে একই শিক্ষা দিতে পারবেন। এভাবেই একটি মাদরাসা থেকে একটি মহল্লা, একটি গ্রাম, একটি শহর—ক্রমে সমগ্র সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সৃষ্টি রক্ষা করা মানে কেবল গাছপালা রক্ষা করা নয়; বরং মানুষের জীবন, জীবিকা, খাদ্য, পানি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা রক্ষা করা। পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম—কাউকেই আলাদা করে দেখে না। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ একটি যৌথ দায়িত্ব, আর এই দায়িত্ব পালনে কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।

আমাদের প্রত্যাশা, দেশের প্রতিটি কওমি মাদরাসা ইলমের পাশাপাশি সবুজায়ন, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশ সচেতনতাকেও নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ করে তুলবে। যে শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দেয়, সেই শিক্ষা মানুষকে তাঁর সৃষ্টি ভালোবাসতেও শেখায়। আর যে সমাজ সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসে, সে সমাজ তাঁর সৃষ্টির প্রতিও অবহেলা করতে পারে না।

আসুন, আমরা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলি, যারা কুরআনের আলোয় আলোকিত হবে, সুন্নাহর আদর্শে জীবন গড়বে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর এই সুন্দর পৃথিবীকে রক্ষা করাকে ঈমানি দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করবে। প্রতিটি কওমি মাদরাসা হোক জ্ঞানের পাশাপাশি সবুজেরও একেকটি বাতিঘর। ইলমের আলো, উত্তম আখলাক এবং পরিবেশ সচেতনতার সমন্বয়েই গড়ে উঠুক একটি মানবিক, সুন্দর ও টেকসই বাংলাদেশ।

লেখক: আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা ও লেখক; পরিচালক, কতকিছুর হাট

ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

আরও পড়ুন.. পরিবেশ সচেতনতায় কওমি মাদরাসা ও আলেমসমাজ (প্রথম পর্ব)

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন