Logo

ধর্ম

মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহে ইসলামের বার্তা

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭:০২

মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহে ইসলামের বার্তা

মানুষ পৃথিবীতে আসার পর প্রথম যে আশ্রয় পায়, তা মায়ের বুকে; আর প্রথম যে খাদ্য পায়, তা মায়ের বুকের দুধ। এই দুধ শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়; এটি মমতা, নিরাপত্তা, স্নেহ এবং জীবনের প্রথম শিক্ষার এক অনন্য মাধ্যম। 

মহান আল্লাহ এমন বিস্ময়কর ব্যবস্থায় মানবশিশুকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, যেখানে তার প্রথম খাদ্যও তিনি মায়ের শরীরেই সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাই মাতৃদুগ্ধ কেবল একটি প্রাকৃতিক খাদ্য নয়; এটি আল্লাহর অসীম রহমত, তাঁর নিখুঁত সৃষ্টিকল্পনা এবং মাতৃত্বের মর্যাদার এক জীবন্ত নিদর্শন।

এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিতেই প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বের একশোরও বেশি দেশে পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। এটি কেবল একটি সচেতনতামূলক আয়োজন নয়; বরং এমন এক মহান নেয়ামতের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার উপলক্ষ, যার সমতুল্য কোনো বিকল্প আজও মানবসভ্যতা তৈরি করতে পারেনি। 

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ গবেষণার মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধের যেসব উপকারিতা তুলে ধরছে, ইসলাম সেগুলোর মৌলিক গুরুত্ব বহু শতাব্দী আগেই মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহয় মাতৃদুগ্ধকে শুধু শিশুর পুষ্টির উৎস হিসেবে নয়; বরং তার জন্মগত অধিকার, মায়ের দায়িত্ব এবং একটি সুস্থ পরিবার গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃদুগ্ধ: সন্তানের জন্মগত অধিকার

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে—যারা পূর্ণকাল দুধ পান করাতে চায়।” (সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)

এই আয়াতে শুধু একটি নির্দেশ নয়, গভীর প্রজ্ঞাও নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা দুই বছরকে ‘পূর্ণকাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবার সূরা লুকমান ও সূরা আল-আহকাফে মায়ের গর্ভধারণ এবং সন্তানকে দুধ পান করানোর কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষের প্রতি মায়ের হকের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ শৈশবে হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর দুধ পান করেছিলেন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামে মাতৃদুগ্ধ কেবল খাদ্য নয়; এটি পারিবারিক, সামাজিক এবং শরিয়তসম্মত সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

রদ্বাআত: দুধপানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক

ইসলামী শরিয়তে দুধপানের মাধ্যমে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, তাকে রদ্বাআত বলা হয়। এই সম্পর্কের ফলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিবাহের বিধানেও এর প্রভাব পড়ে।

এ কারণেই শরিয়ত দুধপানের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। সন্তানকে কে দুধ পান করাচ্ছেন, সেই পরিচয় জানা এবং তা সংরক্ষণ করা ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে বংশপরিচয়, আত্মীয়তার সীমারেখা এবং ভবিষ্যতের বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষা পায়।

আধুনিক বাস্তবতা ও আমাদের দায়িত্ব

আজকের পৃথিবীতে মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব নিয়ে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, মেধার বিকাশ এবং মা-সন্তানের গভীর আবেগিক বন্ধন গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধের ভূমিকা আজ সর্বজনস্বীকৃত।

তবু আধুনিক জীবনযাত্রা, কর্মব্যস্ততা, বাণিজ্যিক প্রচারণা এবং সামাজিক নানা বাস্তবতার কারণে অনেক পরিবার প্রয়োজন ছাড়াই ফর্মুলা দুধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অবশ্য চিকিৎসাগত প্রয়োজন দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু যেখানে মাতৃদুগ্ধ পান করানো সম্ভব, সেখানে সেটিই হওয়া উচিত শিশুর প্রথম, প্রধান এবং সর্বোত্তম খাদ্য।

একই সঙ্গে মাতৃদুগ্ধ-সংক্রান্ত নতুন নতুন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ইসলামী শরিয়তের নির্দেশনা ও ফিকহি নীতিমালা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কারণ ইসলাম শুধু শিশুর শারীরিক পুষ্টির কথাই বলে না; বরং তার বংশপরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক শৃঙ্খলার সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেয়।

একটি বাস্তব আহ্বান

হে মায়েরা, মনে রাখবেন—আপনাদের বুকের দুধ শুধু একটি খাদ্য নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া এক অমূল্য আমানত। সন্তানের প্রতি আপনাদের সবচেয়ে বড় উপহারগুলোর একটি হলো মাতৃদুগ্ধ। তাই যথাসম্ভব দুই বছর পর্যন্ত এই নেয়ামতের হক আদায় করার চেষ্টা করুন।

হে পিতা, স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা, মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়; আপনাদেরও। একজন মাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি, পুষ্টিকর খাদ্য, সহযোগিতা এবং সম্মান দেওয়া সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলারই অংশ।

হে সমাজ, মাতৃত্বকে সম্মান করুন। পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিবেশ এমন হোক, যেখানে একজন মা নিশ্চিন্তে তাঁর সন্তানের এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন।

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ আমাদের শুধু একটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচির কথা মনে করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মল সম্পর্কের কাছে—মা ও সন্তানের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের কাছে। মাতৃদুগ্ধকে সম্মান করা মানে শুধু একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে সম্মান করা নয়; বরং আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এক অনন্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।

মানুষ যতই উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী হোক না কেন, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি করা এই প্রথম খাদ্যের সমতুল্য কিছু আজও আবিষ্কার করতে পারেনি। তাই মাতৃদুগ্ধ শুধু শিশুর খাদ্য নয়; এটি আল্লাহর এক অপার নেয়ামত, মাতৃত্বের শ্রেষ্ঠ উপহার এবং একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের পরিবারগুলোকে সুস্থ, সচেতন ও রহমতময় করে তুলুন। সকল মা ও সন্তানকে তাঁর দেওয়া এই মহান নেয়ামতের যথাযথ হক আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট

ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন