Logo

ধর্ম

আজ ফ্রেন্ডশিপ ডে

বন্ধু নির্বাচনে ইসলামের নির্দেশনা

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩৮

বন্ধু নির্বাচনে ইসলামের নির্দেশনা

"বলো তো, তোমার বন্ধু কে? আমি বলে দেব, তুমি কেমন মানুষ।"—পাশ্চাত্যের এই বিখ্যাত প্রবাদটি ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষার সঙ্গেই আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। কারণ মানুষ শুধু নিজের চিন্তা দ্বারা নয়, তার বন্ধু ও সঙ্গীদের দ্বারাও গঠিত হয়। একজন সৎ বন্ধু যেমন ঈমান, চরিত্র ও জীবনের উন্নতির সোপান হতে পারে, তেমনি একজন অসৎ বন্ধু অজান্তেই মানুষকে গুনাহ, বিভ্রান্তি ও ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে। তাই ইসলাম বন্ধুত্বকে নিছক সামাজিক সম্পর্ক নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।

বর্তমান সময়ে বন্ধুত্বের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আগে বন্ধু বলতে বোঝাতো পাড়ার, স্কুলের বা কর্মস্থলের মানুষকে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, বিভিন্ন ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম—এসবের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। কিন্তু সম্পর্ক যত সহজ হচ্ছে, ভুল মানুষকে বন্ধু বানানোর ঝুঁকিও তত বাড়ছে। এ কারণেই ইসলামের দিকনির্দেশনা আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

বন্ধু মানুষের চরিত্রের আয়না

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মানুষ তার বন্ধুর জীবনাদর্শের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে, সে কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে।"(সুনানে আবু দাউদ) এই হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের চরিত্র গঠনে বন্ধুর প্রভাবকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আমরা অজান্তেই আমাদের বন্ধুদের ভাষা, চিন্তা, পোশাক, রুচি, অভ্যাস এমনকি মূল্যবোধও গ্রহণ করি। তাই বন্ধু নির্বাচন মানে আসলে নিজের ভবিষ্যৎ নির্বাচন করা।

সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপর

বন্ধুত্বের প্রভাব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছে গেলে হয়তো সে তোমাকে সুগন্ধি উপহার দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে কিনবে, অন্তত তার কাছ থেকে সুন্দর ঘ্রাণ পাবে। আর কামারের হাপরের কাছে গেলে হয় তোমার কাপড় পুড়ে যাবে, না হয় দুর্গন্ধে কষ্ট পাবে।" (সহিহ বুখারি)

এই উপমা অত্যন্ত বাস্তব। একজন ভালো মানুষের পাশে থাকলে কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হবেই। তার ইবাদত, শিষ্টাচার, জ্ঞান বা উত্তম চরিত্র আমাদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিপরীতে খারাপ মানুষের সান্নিধ্য ধীরে ধীরে আমাদের ঈমান ও নৈতিকতাকে দুর্বল করে দেয়।

কুরআনের সতর্কবার্তা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য তুলে ধরেছেন। তখন একজন মানুষ অনুশোচনায় বলবে—"হায়! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। সে তো আমার কাছে উপদেশ পৌঁছার পর আমাকে তা থেকে বিচ্যুত করেছিল।" (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ২৮–২৯) এই আয়াত প্রমাণ করে, ভুল বন্ধু শুধু দুনিয়ার ক্ষতির কারণ নয়; আখিরাতের অনন্ত ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই ইসলাম আবেগের বশে নয়, ঈমান ও বিবেকের আলোকে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়।

কেমন হবে একজন প্রকৃত বন্ধু

একজন প্রকৃত বন্ধু সেই ব্যক্তি— যে তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যে সালাতে অবহেলা করলে আন্তরিকভাবে সতর্ক করে। যে তোমার গোপন ত্রুটি ঢেকে রেখে সংশোধনের চেষ্টা করে। যে গুনাহে উৎসাহ দেয় না; বরং পাপ থেকে ফিরিয়ে আনে। যে তোমার সাফল্যে ঈর্ষা নয়, আনন্দ অনুভব করে। যে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায় এবং সুখের সময় অহংকার থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। -এমন বন্ধুত্ব শুধু দুনিয়ার নয়, আখিরাতেরও পুঁজি।

যাদের সঙ্গ থেকে সতর্ক থাকা উচিত

ইসলাম এমন ব্যক্তির সঙ্গ এড়িয়ে চলার শিক্ষা দেয়, যে প্রকাশ্যে গুনাহ করে, মিথ্যাকে স্বাভাবিক মনে করে, অশ্লীলতাকে বিনোদন বলে প্রচার করে, নেশা বা অন্যায় কাজে আহ্বান জানায় অথবা আল্লাহর বিধান নিয়ে উপহাস করে। কারণ মানুষের হৃদয় ধীরে ধীরে তার পরিবেশের প্রভাব গ্রহণ করে।

আজ অনেক তরুণের জীবন নষ্ট হয়েছে একটি ভুল বন্ধুত্বের কারণে। শুরুটা হয়েছিল একটি আড্ডা দিয়ে, এরপর একটি ছোট গুনাহ, তারপর সেটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শয়তান অনেক সময় সরাসরি মানুষকে পথভ্রষ্ট করে না; বরং ভুল সঙ্গের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাকে বিপথে নিয়ে যায়।

অনলাইন বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও সতর্কতা

ডিজিটাল যুগে হাজারো "ফলোয়ার" বা "ফ্রেন্ড" থাকলেই প্রকৃত বন্ধু পাওয়া যায় না। অনেক সময় অনলাইনে পরিচিত মানুষ ভুল চিন্তা, ভ্রান্ত আকীদা বা অশ্লীল সংস্কৃতির প্রচার করে। তাই একজন মুসলিমের উচিত এমন ব্যক্তি ও প্ল্যাটফর্ম অনুসরণ করা, যা তার ঈমান, জ্ঞান ও নৈতিকতা বৃদ্ধি করে।

নিজেও একজন উত্তম বন্ধু হোন

শুধু ভালো বন্ধু খুঁজে বেড়ালেই হবে না; নিজেকেও একজন আদর্শ বন্ধু হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।"(সহিহ বুখারি)

প্রকৃত বন্ধু সেই, যে বন্ধুর সম্মান রক্ষা করে, তার জন্য দোয়া করে, প্রয়োজনে সহযোগিতা করে, ভুল দেখলে অপমান না করে সুন্দরভাবে সংশোধন করে এবং তাকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে দেয়।

মনে রাখতে হবে, বন্ধুত্ব একটি সাধারণ বিষয় মনে হলেও, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একজন ভালো বন্ধু মানুষকে জান্নাতের পথে এগিয়ে দিতে পারে, আবার একজন খারাপ বন্ধু তাকে জাহান্নামের পথেও নিয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধু নির্বাচন করার আগে তার চরিত্র, ঈমান, আমল ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আসুন, আমরা এমন বন্ধু বেছে নিই, যার সঙ্গে সময় কাটালে আল্লাহকে স্মরণ করতে ইচ্ছা করে, যার কথা শুনে ভালো কাজের অনুপ্রেরণা জাগে এবং যার সান্নিধ্যে আমাদের চরিত্র আরও সুন্দর হয়। কারণ পৃথিবীর সব সম্পর্ক একদিন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব কিয়ামতের দিনও উপকারে আসবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সৎ বন্ধু নির্বাচন করার এবং অন্যের জন্যও একজন উত্তম বন্ধু হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন