Logo

ধর্ম

হেযবুত তাওহীদ এবং কিছু ভ্রান্ত আকীদা

Icon

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৫:০২

হেযবুত তাওহীদ এবং কিছু ভ্রান্ত আকীদা

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ইসলামি পরিচয়ের আড়ালে ছদ্মনামধারী কিছু গোষ্ঠী নিজেদেরকে ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে 'হেযবুত তওহীদ' একটি বহুল আলোচিত নাম। এর প্রতিষ্ঠাতা বায়াজীদ খান পন্নী (১৯২৫–২০১২), যিনি টাঙ্গাইলের করোটিয়ার পন্নী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং পেশাগতভাবে একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘ইমামুয যামান’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাঁর ব্যাখ্যাকে ইসলামের পুনর্জাগরণের একটি বিশেষ ধারা হিসেবে উপস্থাপন করেন। বর্তমানে এই গোষ্ঠীর প্রধান হলেন হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম।

​তাদের মতে, রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর একশত বছরের মধ্যেই ইসলাম বিকৃত হয়ে যায়। অতঃপর দীর্ঘ তেরশ বছর এই উম্মাহকে (হেযবুত তওহীদের) এই পবিত্র কর্মসূচি থেকে মাহরুম ও বঞ্চিত রাখার পর আল্লাহ তাঁর অসীম করুণায় তাঁর দেওয়া কর্মসূচির পরিচয় মান্যবর এমামুয্যামানকে বোঝার তাওফীক দিয়েছেন (ঐ, পৃ. ৬৯, ৭১)।

​তারা অন্য মুসলমানদের সাথে সালাত আদায় করে না এবং তাদের সাথে কোনো ইবাদতেও অংশগ্রহণ করে না। এই দলে যারা যুক্ত হবে তাদের শপথবাক্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই দলভুক্ত যারা নয় অর্থাৎ বাকি দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান পথভ্রষ্ট ও বিকৃত ইসলামের অনুসারী। অতএব তাদের সাথে কোনো ইবাদতে অংশগ্রহণ করা যাবে না; কেবল এই আন্দোলনের সাথে যুক্তদের সাথেই ইবাদতে অংশগ্রহণ করা যাবে (ঐ, পৃ. ৭৩)। এই দলটি আলেম-ওলামার প্রতি চূড়ান্ত বিদ্বেষ পোষণ করে এবং তারা মনে করে যে, হাদীস, তাফসীর, ফিকহসহ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির কারণ (ঐ, পৃ. ১৩; আকীদা, পৃ. ২৩)।

​তারা মনে করে যে, আল্লাহ ‘হেযবুত তওহীদ’কেই মানবজাতির উদ্ধারকর্তা হিসেবে মনোনীত করেছেন। কাজেই এই সময়ে যারা মুমিন-মুসলিম হতে চায়, আল্লাহর সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সত্য পথ লাভ করতে চায়, তাদের এমামুযযামানের আনুগত্য করা ছাড়া মুক্তি নেই। ‘হেযবুত তওহীদে’র মাধ্যমে গোটা বিশ্বে প্রকৃত ধর্ম প্রচার হবে—এটা আল্লাহরই নির্দেশ।

​পন্নী আল্লাহর পক্ষ থেকে মুজিযা প্রাপ্তির দাবি করে প্রকারান্তরে নিজেকে নবী দাবি করেছেন। যেমন, তিনি নিজের একটি ১০ মিনিটের ভাষণকে আল্লাহর মুজিযা হিসেবে দাবি করেন এবং প্রচার করেন যে, এই মুজিযার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে এবং হেযবুত তওহীদকে হক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এর চেয়ে বড় রহমত আর কী হতে পারে? যে মুজিযা তিনি নবীদের সময় ঘটাতেন একটা একটা করে, এখন তিনি নিজে একসাথে ৮টা মুজিযা ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটিয়ে দিলেন’ (আল্লাহ মো’জেজা হিজবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৬৯)।

​তাদের গঠনতন্ত্রে লেখা হয়েছে, ‘হেযবুত তওহীদে’র সবচেয়ে বড় মাইলফলক হচ্ছে—২ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ তারিখে মহান আল্লাহ এক মহান অলৌকিক ঘটনা (মুজিযা) সংঘটন করেন, যার দ্বারা তিনি তিনটি বিষয় সত্যায়ন করেন। যথা: হেযবুত তওহীদ হক (সত্য), এর ইমাম আল্লাহর মনোনীত হক ইমাম, এবং হেযবুত তওহীদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে আল্লাহর সত্য দীন প্রতিষ্ঠিত হবে। শুধু তাই নয়, তারা এই ভাষণটিকে কুরআনের মর্যাদা দিয়ে বলে, ‘কুরআন ও ইমামের এই ভাষণটি একই পর্যায়ভুক্ত। যারা বায়াজিদ খান পন্নীর উপর আল্লাহ প্রদত্ত এই মুজিযায় বিশ্বাস করবে না এবং এতে সন্দেহ রাখবে, তারা কুরআনকে অবিশ্বাস করার মতো অপরাধী এবং তাদের জন্য উভয় জাহানে রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি’ (গঠনতন্ত্র, পৃ. ১৬; আল্লাহ মো’জেজা হিজবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ১১-১৭, ৩৩, ৯৩; মহাসত্যের আহবান, পৃ. ২৬-২৭)।

​পন্নীর ভাষ্যমতে, কোনো ব্যক্তি ‘হেযবুত তওহীদে’ যোগ দিলেই দুই শহীদের মর্যাদা পাবে, যদি সে শেষ পর্যন্ত থাকে। শুধু তাই নয়, ‘হেযবুত তওহীদে’ যারা সত্যিকারভাবে এসেছে তাদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত; এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এখন কে কোন জান্নাতে যাবে তা আমলের উপর নির্ভর করবে (আল্লাহ মো’জেজা হিজবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৬৫)।

​তারা বলে, দাড়ি-টুপি-বোরকা ইত্যাদি ইসলামের কোনো লেবাস নয়। তাদের আকীদা হলো, আল্লাহর রাসূল (সা.) কোনো ধর্মকেই বাতিল করেননি, বরং সবগুলোকে সংরক্ষণ ও সত্যায়ন করেছেন; তাই সব ধর্মই সত্য। সকল ধর্মের মর্মকথা—সবার ঊর্ধ্বে মানবতা।

​তারা ইতিমধ্যে নিজস্ব ওয়েবসাইট ও পত্রিকা ‘দৈনিক দেশের পত্র’ ও ‘দৈনিক বজ্রকণ্ঠ’ প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের বিকৃত আকীদা ও আমল ব্যাপকভাবে প্রচার করছে এবং বাংলাদেশের বহু মানুষকে পথভ্রষ্ট করে চলেছে। অতএব এদের ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকা একান্ত জরুরি।

লেখক: সহ-সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা, পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী

ইমেইল: nazmulislam19122@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন