Logo

ধর্ম

ইসলামের বাণিজ্যনীতি

নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার অধিকার

প্রথম পর্ব

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৩৯

নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার অধিকার

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের পারস্পরিক আস্থা, নৈতিকতা এবং সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থার ওপর। একজন ক্রেতা যখন কোনো পণ্য কিনতে দোকানে যান কিংবা অনলাইনে অর্ডার করেন, তখন তিনি শুধু একটি পণ্য কেনেন না; বরং বিক্রেতার সততা ও প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখেন। সেই আস্থাই বাজার অর্থনীতির প্রাণ।

কিন্তু আজ সেই আস্থা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। খাদ্যে ভেজাল, ওজনে কম দেওয়া, নকল পণ্য, মিথ্যা বিজ্ঞাপন, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে বিক্রি, অনলাইনে এক পণ্যের ছবি দেখিয়ে অন্য পণ্য সরবরাহ কিংবা ডিজিটাল ওজন যন্ত্রে কারচুপি—এসব ঘটনা যেন আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে শুধু একজন ভোক্তা আর্থিকভাবে প্রতারিত হন না; অনেক সময় তার স্বাস্থ্য, জীবন এবং ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই এটি কেবল ভোক্তা অধিকার বা বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।

এই বাস্তবতায় পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মুতাফফিফীন আমাদের সামনে এক চিরন্তন নৈতিক শিক্ষা তুলে ধরে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যখন তারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয়; আর যখন তাদের জন্য মেপে দেয় বা ওজন করে, তখন কম দেয়।” (সুরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ১–৩)

এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘ওয়াইল’ শব্দটি সাধারণ ভর্ৎসনা নয়; বরং ধ্বংস, কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রতীক। তাফসিরবিদগণ উল্লেখ করেছেন, এখানে শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম ওজন দেওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়নি; বরং মানুষের ন্যায্য অধিকার ইচ্ছাকৃতভাবে খর্ব করা, প্রতারণা, তথ্য গোপন করা এবং অসততার মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করার সব রূপই এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই ইমাম ইবন কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরুল কুরআনিল আজিম-এ উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ইসলামের সুস্পষ্ট ঘোষণা।

ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তবে তার শর্ত হলো সততা ও আমানতদারিতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাজারে গিয়ে একবার শস্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ দেখতে পান। তখন তিনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করেন, “এটি কী?” বিক্রেতা বললেন, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। তখন নবী (সা.) বললেন, “যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

এই একটি হাদিসই ইসলামে ব্যবসায়িক নৈতিকতার গুরুত্ব স্পষ্ট করে। প্রতারণা শুধু একটি আইনি অপরাধ নয়; এটি ঈমান, চরিত্র এবং মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতারণার ধরন বদলেছে, কিন্তু অপরাধের প্রকৃতি বদলায়নি। আগে কেউ দাঁড়িপাল্লায় কম ওজন দিত; এখন কেউ খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশায়, ফল পাকাতে নিষিদ্ধ উপাদান ব্যবহার করে, দুধে ভেজাল দেয়, নকল ওষুধ তৈরি করে, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় ছবি দেখিয়ে ভিন্নমানের পণ্য পাঠায়। প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু অসততার চরিত্র একই রয়ে গেছে। সুরা আল-মুতাফফিফীনের শিক্ষা তাই আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

আধুনিক গবেষণাও এই উদ্বেগকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের Food Safety Fact Sheet-এ নিরাপদ খাদ্যকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। একইভাবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক দূষণকে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালে New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় মানুষের ধমনি থেকে সংগৃহীত নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। গবেষণাটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, যাদের রক্তনালিতে এসব কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তাদের হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবুও এটি স্পষ্ট যে খাদ্যদূষণ ও পরিবেশগত দূষণ এখন কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়।

অর্থাৎ, কোরআন যে সতর্কবার্তা প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে দিয়েছিল, আধুনিক বিজ্ঞান আজ ভিন্ন ভাষায় তার বাস্তবতাকেই সামনে তুলে ধরছে। মানুষের খাদ্যে ভেজাল, প্রতারণা কিংবা ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে মুনাফা অর্জন সাময়িক লাভ এনে দিতে পারে; কিন্তু এর মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে। আস্থা হারায় বাজার, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনস্বাস্থ্য, আর নষ্ট হয় নৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি।

এই কারণেই ইসলাম ব্যবসাকে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। যে ব্যবসা মানুষের উপকার করে, বিশ্বাস রক্ষা করে এবং ক্ষতি থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখে, সেই ব্যবসাতেই রয়েছে প্রকৃত বরকত। (চলবে... )

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট

ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন