Logo

ধর্ম

ইসলামের বাণিজ্যনীতি

নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার অধিকার

দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৪৪

নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার অধিকার

(পূর্ব প্রকাশের পর...)

ইসলাম শুধু প্রতারণাকে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদের নিরাপত্তাকে শরিয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সর্বজনীন নীতি ঘোষণা করেছেন— "লা দারার ওয়া লা দিরার"—অর্থাৎ, "ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০; ইমাম মালিক, আল-মুওয়াত্তা)

ইসলামী আইনশাস্ত্রে এই হাদিসকে এমন একটি মৌলিক নীতি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ওপর অসংখ্য ফিকহি বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইমাম নববী (রহ.) এবং ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বলী (রহ.) এটিকে ইসলামের অন্যতম সর্বজনীন আইনগত নীতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা এমন কোনো কাজ করতে পারে না, যার মাধ্যমে অন্য মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, সম্পদ বা অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই নীতির আলোকে খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য পুনরায় বাজারজাত করা, ভুয়া লেবেল লাগানো কিংবা কম ওজন দিয়ে পণ্য বিক্রি—সবই শুধু অনৈতিক নয়; ইসলামের মৌলিক নীতিরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ইসলাম ভোক্তার অধিকারকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আধুনিক বিশ্বে "Consumer Rights" নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার বহু শতাব্দী আগে ইসলামী ফিকহে "খিয়ারুল আইব" নামে একটি সুসংহত নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অর্থ, বিক্রিত পণ্যে কোনো গোপন ত্রুটি থাকলে ক্রেতা সেই পণ্য ফেরত দেওয়া বা চুক্তি বাতিল করার অধিকার রাখেন। 

ইমাম ইবনু কুদামা (রহ.) তাঁর আল-মুগনি গ্রন্থে এবং ইমাম কাসানি (রহ.) বাদায়িউস সানায়ি-এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে একজন বিক্রেতার দায়িত্ব শুধু পণ্য বিক্রি করা নয়; বরং পণ্যের প্রকৃত মান, অবস্থা ও ত্রুটি সম্পর্কে ক্রেতাকে সত্য তথ্য জানানো।

বাস্তব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই বিষয়গুলোর গুরুত্ব আমি প্রতিদিন নতুন করে উপলব্ধি করি। 'কতকিছুর হাট' পরিচালনা করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষক, পাইকারি বাজার এবং ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেখানে দেখেছি, অধিকাংশ কৃষকই সৎভাবে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য চান। কিন্তু সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কখনো কখনো অসাধু কিছু মানুষের কারণে সেই সততার মূল্য ক্ষুণ্ন হয়।

অনেক সময় বাজারে এমন সবজি বা কৃষিপণ্য দেখা যায়, যা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও মানের দিক থেকে প্রত্যাশা পূরণ করে না। কখনো ওজনে অসংগতি, কখনো নিম্নমানের পণ্যের সঙ্গে ভালো পণ্য মিশিয়ে দেওয়া, আবার কখনো প্রকৃত মান গোপন করে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। 

ব্যবসায়িক জীবনে এমন ঘটনাও এসেছে, যখন সাময়িক লাভের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা মান নিয়ে আপস না করে পুরো চালান ফিরিয়ে দিয়েছি অথবা ক্রেতাকে প্রকৃত অবস্থা জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছি। 

স্বল্পমেয়াদে এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস অর্জিত হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাজারে মূলধনের চেয়েও মূল্যবান সম্পদ হলো বিশ্বাস। একবার সেই বিশ্বাস হারিয়ে গেলে তা অর্থ দিয়ে আর ফিরে পাওয়া যায় না।

এ কারণেই আমি বিশ্বাস করি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়; এটি কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবেশক, বিপণনকারী এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একজন কৃষক যদি নিরাপদ উৎপাদনে সচেতন হন, একজন ব্যবসায়ী যদি পণ্যের প্রকৃত মান গোপন না করেন, আর একজন ভোক্তা যদি সচেতনভাবে প্রশ্ন করেন ও প্রয়োজনে অভিযোগ জানান, তবে বাজারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসা সম্ভব।

বাংলাদেশেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার এবং অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বা বিপণনের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান দিয়েছে। একইভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ কম ওজন দেওয়া, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রিকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার বাস্তবায়নের পাশাপাশি সমাজে নৈতিকতার চর্চাও শক্তিশালী হয়।

ইসলাম ব্যবসাকে শুধু লাভ-লোকসানের হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করে না; বরং ব্যবসাকে আমানত ও জবাবদিহির বিষয় হিসেবে দেখে। একজন মুসলিম ব্যবসায়ী জানেন, প্রতিটি লেনদেনের হিসাব শুধু ক্রেতার কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও দিতে হবে। তাই সততা ইসলামে কেবল একটি ব্যবসায়িক কৌশল নয়; এটি ঈমানের অংশ।

আজ আমাদের প্রয়োজন এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে পণ্যের দাম যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি তার মানও হবে নির্ভরযোগ্য; যেখানে ওজন হবে সঠিক, তথ্য হবে সত্য এবং মুনাফার চেয়ে মানুষের কল্যাণ বেশি গুরুত্ব পাবে। কারণ একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হতে পারে তখনই, যখন তার বাজারব্যবস্থার ভিত্তি হবে বিশ্বাস, ন্যায়বিচার এবং নৈতিকতা।

সুরা আল-মুতাফফিফীনের প্রথম তিনটি আয়াত তাই শুধু কয়েকটি ধর্মীয় উপদেশ নয়; এগুলো একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা এবং মানবিক বাজার সংস্কৃতির মৌলিক সনদ। যে সমাজে মাপ, ওজন, গুণগত মান এবং তথ্য—সবকিছুতেই সততা প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সমাজেই মানুষের মধ্যে আস্থা জন্মায়, ব্যবসায় বরকত আসে এবং অর্থনীতি হয় টেকসই। আর যে সমাজে প্রতারণা স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে আইন কঠোর হলেও মানুষের বিশ্বাস ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়।

সুতরাং খাদ্যে ভেজাল, কম ওজন কিংবা প্রতারণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুধু প্রশাসনিক অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের দায়িত্ব নয়; এটি একটি নৈতিক আন্দোলন। এই আন্দোলন শুরু হতে হবে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর বিবেক থেকে, প্রত্যেক ভোক্তার সচেতনতা থেকে এবং আমাদের প্রত্যেকের আল্লাহভীতি থেকে।

কোরআনের ভাষায়, যারা মানুষের অধিকার পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে কিন্তু দিতে গিয়ে কমিয়ে দেয়, তাদের জন্য সতর্কবার্তা আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। আর যারা সততা, আমানতদারিতা ও ন্যায়বিচারকে ব্যবসার ভিত্তি বানায়, তারাই প্রকৃত অর্থে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের পথপ্রদর্শক।

(তথ্যসূত্র)

১. আল-কুরআন, সুরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত ১–৩। ২. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০২ (প্রতারণা বিষয়ক)। ৩. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৩৪০; আল-মুওয়াত্তা, ইমাম মালিক (লা দারার ওয়া লা দিরার)। ৪. ইমাম ইবন কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম। ৫. ইমাম ইবনু কুদামা, আল-মুগনি (খিয়ারুল আইব অধ্যায়)। ৬. ইমাম কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি। ৭. World Health Organization (WHO), Food Safety Fact Sheet। ৮. Food and Agriculture Organization of the United Nations (FAO), Food Safety and Food Quality বিষয়ক প্রকাশনা। ৯. Marfella, R. et al. “Microplastics and Nanoplastics in Atheromas and Cardiovascular Events.” The New England Journal of Medicine, ২০২৪। ১০. বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩। ১১. বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন