মানুষ স্বভাবতই কাউকে না কাউকে ভালোবাসে। কেউ আলেমকে ভালোবাসে, কেউ কবিকে, কেউ বিজ্ঞানীকে, আবার কেউ খেলোয়াড়কে। ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু এই ভালোবাসা যখন সীমা অতিক্রম করে অন্ধ অনুসরণে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তি, সমাজ ও ঈমানের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সময়ে মুসলিম যুবসমাজের একটি বড় অংশ বিভিন্ন অমুসলিম খেলোয়াড়কে এমনভাবে ভালোবাসে যে, তারা তাদের জীবনাদর্শ, পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের স্টাইল, এমনকি কথাবার্তাও অনুসরণ করে।
অনেক সময় দেখা যায়, প্রিয় দল বা খেলোয়াড় পরাজিত হলে কেউ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ে, আবার কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথও বেছে নেয়। এ পরিস্থিতি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করে না।
খেলাধুলা করা, কোনো খেলোয়াড়ের দক্ষতার প্রশংসা করা বা খেলা উপভোগ করা-এসব মূলত বৈধ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তার চিন্তা, আদর্শ ও জীবনধারাকে নিজের আদর্শ বানিয়ে নেওয়া হয়, তখন তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'মানুষ যাকে ভালোবাসে, কিয়ামতের দিন সে তার সাথেই থাকবে।' [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৬৮]
এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষের ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি তার চরিত্র, চিন্তা ও পরকালের সঙ্গী নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এ হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন, এখানে সেই ভালোবাসার কথা বোঝানো হয়েছে, যা কাউকে তার আদর্শ, ঈমান ও নেক আমলের কারণে অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই একজন মুসলমানের উচিত সর্বাগ্রে আল্লাহ, তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, নেককার আলেম ও সৎ মানুষের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা।
আজ অনেক যুবক প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখে, মোবাইলের ওয়ালপেপার বানায়, তাদের নামে জার্সি পরে, তাদের মতো চুল কাটে এবং তাদের জীবনকে আদর্শ মনে করে।
অথচ তারা হয়তো ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানে। এটা দুঃখজনক বাস্তবতা। অন্ধ অনুকরণ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন-'যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।' [সুনান আবি দাউদ, হাদিস: ৪০৩১]
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমগণ উল্লেখ করেছেন, কোনো জাতির বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়, স্বাতন্ত্র্যসূচক রীতি বা তাদের নৈতিকভাবে আপত্তিকর আচরণকে অনুকরণ করা নিন্দনীয়। তবে সাধারণ পোশাক, খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক বিষয়-যা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক নয়-সেগুলোর বিধান প্রসঙ্গভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
মুসলমানের প্রকৃত আদর্শ হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।' [সুরা আহযাব: ২১] যে যুবক রাসুলের আদর্শকে ছেড়ে কোনো খেলোয়াড়ের জীবনধারাকে অনুসরণ করে, সে প্রকৃত আদর্শ থেকে দূরে সরে যায়। কারণ খেলোয়াড়ের সাফল্য সীমাবদ্ধ পৃথিবীর মাঠে; কিন্তু রাসুলের শিক্ষা মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সফলতা দান করে।
বর্তমানে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যায়-আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। প্রিয় দল হারলে কেউ হতাশ হয়ে যায়, কেউ পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করে, আবার সংবাদমাধ্যমে মাঝে-মধ্যেই আত্মহত্যার ঘটনাও শোনা যায়। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইসলামে আত্মহত্যা একটি মহাপাপ। কোনো অবস্থাতেই মানুষ নিজের জীবন নষ্ট করার অধিকার রাখে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'যে ব্যক্তি দুনিয়াতে যে জিনিস দিয়ে আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সেই জিনিস দিয়েই শাস্তি দেওয়া হবে।' [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৪৭] একটি খেলা, একটি গোল, একটি ট্রফি বা কোনো খেলোয়াড়ের পরাজয় কখনো মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। পৃথিবীর সব খেলাই সাময়িক; কিন্তু মানুষের জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে অমূল্য আমানত। তাই খেলাকে খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, জীবন-মরণের প্রশ্নে পরিণত করা যাবে না।
মুসলিম যুবকদের মনে রাখতে হবে, তারা একটি মহান উম্মাহর সদস্য। তাদের ইতিহাসে রয়েছেন বদরের বীর সাহাবিগণ, রয়েছেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.), উমর ফারুক (রা.), উসমান গনী (রা.) ও আলী (রা.)। রয়েছেন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতো জ্ঞানসূর্য ব্যক্তিত্ব। এঁদের জীবন অধ্যয়ন করলে মানুষ ঈমান, জ্ঞান, চরিত্র ও আত্মত্যাগের শিক্ষা পায়। তাই মুসলিম যুবকদের উচিত খেলাধুলাকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করা, কিন্তু কখনোই তা জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করা। কোনো খেলোয়াড়ের দক্ষতার প্রশংসা করা যেতে পারে, কিন্তু তার প্রতি এমন মোহ সৃষ্টি করা উচিত নয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসাকে আড়াল করে দেয়। একজন মুসলমানের পোশাক, চিন্তা, চরিত্র ও জীবনাদর্শ হওয়া উচিত ইসলামের শিক্ষার আলোকে গঠিত।
খেলাধুলা মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু খেলোয়াড়প্রেম যদি অন্ধ অনুসরণে রূপ নেয়, যদি তা ঈমানি চেতনা দুর্বল করে, যদি তা মানুষকে আত্মবিস্মৃত করে তোলে, তবে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
একজন সচেতন মুসলমান খেলাকে ভালোবাসবে, কিন্তু খেলাকে নিজের ঈমান ও পরিচয়ের উপরে স্থান দেবে না। সে মনে রাখবে-দুনিয়ার সব খ্যাতি ও সাফল্য একদিন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং নেককারদের সঙ্গই চিরস্থায়ী সফলতার পথ। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করা-আমরা কার অনুসারী হতে চাই, কার আদর্শে জীবন গড়তে চাই এবং কাদের সঙ্গে আখিরাতে অবস্থান করতে চাই। এই সিদ্ধান্তই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

