মানব সমাজে যেসব মন্দ স্বভাবের কারণে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয় তন্মধ্যে অন্যতম একটি মন্দ স্বভাব হচ্ছে মিথ্যা অপবাদ। অপবাদকে কেন্দ্র করে বহু বিধ ঝগড়া, মারামারি এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটে। আমাদের চারপাশ লক্ষ্য করলে প্রতিনিয়ত অপবাদের ভয়ানক পরিণতি দেখতে পাবো। তাই আমাদের জানা উচিত; কেন অপবাদ সৃষ্টি হয়? এর উৎস কি? এর পরিণতি কী? এবং এই মন্দ স্বভাব থেকে উত্তরণের পথ কী?
অপবাদের পরিচয়: প্রথমেই আমরা অপবাদের পরিচয় নিয়ে আলোচনা করছি। বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা সুয়ূতী রহ. বলেন, অপবাদ হলো; মনগড়া বানোয়াট কোনো কথা বা ঘটনা। অর্থাৎ কারো সম্পর্কে এমন কোনো বিষয়ের অভিযোগ আরোপ করা যার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। আমাদের সমাজে দেখা যায় শত্রুতা বশত অন্যের নামে বহু মিথ্যা কাহিনী রটানো হয়। কারো চরিত্র হরন করা হয়, কারো মানহানি করা হয়। কেউ কেউ স্বার্থলাভের আশায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। এসবই অপবাদের অন্তর্ভুক্ত।
অপবাদের উৎস: অপবাদের মূল উৎস হলো; মিথ্যা। যেকোনো মানুষের পক্ষে অপবাদ রটানো সহজ নয়। যেসব মিথ্যা বলে অভ্যস্ত তারা অতি সহজেই অপবাদ রটনার কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। কারণ, অপবাদের মূল ভিত্তি হচ্ছে মিথ্যা। কারো নামে কোনো কাহিনী বা দোষ রটানো। অতএব, মিথ্যা বলার অভ্যাস না থাকলে এটা করা সহজ সাধ্য হয় না। অথচ মিথ্যা পরিণতির ব্যাপারে হাদীসে রাসূল সা. এরশাদ করেছেন; "তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ মিথ্যা পাপাচার বা অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায় এবং অন্যায় জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যার অন্বেষণ করতে থাকে, অবশেষে আল্লাহর কাছে সে মহা-মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।" (সহীহ বুখারী-৬০৯৪, সহীহ মুসলিম-২৬০৭)
আরেকটা উৎস হলো; যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বলা। বর্তমানে আমাদের মাঝে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমরা যা শুনি তা-ই বলতে আরম্ভ করি। যাচাই করার কোনো প্রয়োজন বোধ হয় না। আর এ কারণে সমাজে বহু ঝগড়া-বিবেধ লেগেই থাকে। অথচ আল্লাহ রাসূল সা. হাদীসে স্পষ্ট বলেছেন; 'কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে যা শোনে, তাই (যাচাই না করে) বর্ণনা করে।' (সুনানে আবু দাউদ-৪৯৯২)
বিশেষ একটা উৎস হলো; মানব হৃদয়ে আখেরাতের ভীতির কমতি এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমানের অভাব। আখেরাতের পরিপূর্ণ ভীতি এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান থাকলে মানুষ কখনোই এমনটা করতে পারে না। অথচ আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনের সুরা আন-নহলের ১০৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'মিথ্যা অপবাদ তো তারাই তৈরি করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না এবং তারাই হলো মিথ্যুক।'
অপবাদের কারণসমূহ: মানুষ নানা কারণে এই মন্দ স্বভাব গ্রহণ করে। সেগুলোর প্রায় সবগুলোই শরীয়তে নিষিদ্ধ। যেমন: অন্যের প্রতি হিংসাবশত, শত্রুতাবশত, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইত্যাদি। এ সবগুলোই শরীয়তে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,' তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা নেক আমলকে সেভাবে খেয়ে ফেলে যেভাবে আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়।' (সুনানে আবু দাউদ-৪৯০৩)
অপবাদরে ধরণ ও পদ্ধতি: এক ধরনের অপবাদ তো আছে যেটা আল্লাহর শানে কাফেররা করে থাকে। যেমন তারা একাধিক খোদা মানে আবার বলে; তাদের এই বানোয়াট খোদা তাদের ব্যাপারে স্রষ্টার কাছে সুপারিশ করবে। তারা বলে, আল্লাহর সন্তান আছে ইত্যাদি (নাঊযুবিল্লাহ)। এসব কথাবার্তাকে আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বহুবার অপবাদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আরেক ধরনের অপবাদ আছে যেটা আল্লাহর রাসূলগনের ব্যাপারে। কাফেররা বলত; তারা জাদুকর, তারা পাগল (নাঊযুবিল্লাহ)।
আরেকটা ধরন হলো নবীর পরবর্তী গোমরাহ উম্মতরা নবীদের নামে এমন সব কথা রটানো যা তারা কখনো করেন বা বলেন নি। এমনকি তাদের সাথে এরূপ কোনো ঘটনা ঘটেনি। যেমন ঈসা আ. কে হত্যা করা, শূলে চড়ানো। এসব মিথ্যাচার পরবর্তীতে খ্রিস্টানদের মুখেও শুনা যেত।
আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সা. এর ব্যাপারেও তার কিছু গোমরাহ উম্মত বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে নবীজি হাদীসে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। এরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিল।' (সহীহ বুখারী-৩৪৬১) আমরা অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়া হাদীস বর্ণনা করতে থাকি, এভাবে কখনো কখনো জাল হাদীসও বলে ফেলি। এ ব্যাপারে সতর্কতা একান্ত কাম্য।
আমাদের সমাজে আমরা বিভিন্নভাবে অপবাদে লিপ্ত হই। আদালতে এর দৃষ্টান্ত অনেক বেশী। টাকার জন্য, সম্পত্তির জন্য কিংবা মামলায় জেতার জন্য মানুষ অপবাদ দিতে থাকে। কখনো চুরির অপবাদ, কখনো খুনের, কখনো ব্যভিচারের কিংবা অন্য কোনো অপরাধের। কাউকে দমানোর উদ্দেশ্যেও নানাবিধ অপবাদ তৈরি করা হয়। যার নজীর বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে নিদোর্ষ আলেম সমাজ। তাদেরকে অকারণে মিথ্যা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নাটকীয় কায়দায় জেলে ভরে রাখা হয়েছিলো। যাতে তারা দমে যায়। সমাজে অনেক গালি আছে সেগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেগুলো এমন অর্থ বহন করে যা অপবাদের পর্যায়ে।
অপবাদের ভয়ানক ক্ষতিসমূহ: অপবাদের কারণে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যাকে অপবাদ দেয়া তার মানহানী হয়। স্বয়ং নবীপত্নী আয়েশা রা. এর ক্ষেত্রেই তো এমনটি ঘটেছে। অকারণে শাস্তির শিকার হয়। তিরমীযী শরীফের ১৪১৭নং হাদীসে বর্ণিত আছে, "নবী করীম সা. অন্যের দেয়া অপবাদের কারণে এক ব্যক্তিকে আটকে রেখেছিলেন, পরবর্তীর্তে তাঁর নিকট বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেন।" ডিপ্রেশনে ভুগে, কখনো মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে যায়। স্বয়ং আয়েশা রা. এর ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছিল। অপবাদের স্বীকার ব্যক্তি সত্য বলারও সুযোগ পায় না, বলতে পারলেও তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। যে অপবাদ তৈরি করে এবং যে বা যারা তা রটাতে থাকে বাস্তবতা প্রকাশ পাওয়ার পর সমাজে তারা গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মানুষ তাদের আর মান দিতে চায় না। তাদের মুহাব্বাতের চোখে দেখে না। সমাজেও নানাবিধ ক্ষতি হয়। মানুষের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি হয়। এই সবগুলো ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। অপবাদের শাস্তি: এত বড় একটা মন্দ স্বভাবে যা মানব সমাজে নানাবিধ ফেতনার জন্ম দেয়। যা শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং ভালো স্বভাব বিশিষ্ট লোকদের নিকটও অপছন্দনীয়। এমনকি আল্লাহর রাসূল সা. যখন বাইয়াত নিতেন তখনও যেন এভাবে
বাইয়াত নেন, সে জন্য আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এত বড় অপরাধের জন্য আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতে শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অপবাদের অন্যতম শাস্তি এই পাপের কোনো কাফফারা (ক্ষতিপূরণ বা মোচন) নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "পাঁচটি অপরাধ এমন রয়েছে যার কোনো কাফফারা নেই। তন্মধ্যে একটি হলো; কোনো মুমিনকে অপবাদ দেওয়া। (মুসনাদে আহমদ-৮৭৩৭)
পবিত্র কুরআনে সতীসাধ্বী ও নিরীহ নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদের নির্দিষ্ট শাস্তি হলো আশিটি চাবুক মারা, সাক্ষ্য অযোগ্যতা এবং তাদের ফাসেক বা সত্যত্যাগী হিসেবে গণ্য করা। (সূরা আন-নূর: ০৪) আখেরাতেও রয়েছে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে সেই ব্যক্তিই দেউলিয়া (সর্বস্বান্ত), যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; অথচ সে (দুনিয়াতে) একে গালি দিয়েছিল, ওকে অপবাদ দিয়েছিল, এর সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, ওর রক্ত প্রবাহিত (অন্যায়ভাবে হত্যা) করেছিল এবং একে প্রহার করেছিল। অতঃপর (পাপের খেসারতস্বরূপ) তার নেক আমল থেকে একে দেওয়া হবে, ওকে দেওয়া হবে। এভাবে পাওনা চুকানোর আগেই যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে তাদের (মজলুমদের) গুনাহসমূহ নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" (সহীহ মুসলিম-২৫৮১)
উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রা. কে কেন্দ্র করে যেই মুনাফিক অপবাদ তৈরি করেছিল তার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন; "...আর তাদের মধ্যে যে এই অপবাদের প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল (বা যে এর সিংহভাগ প্রচার করেছিল), তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (সূরা আন-নূর: ১১)
অপবাদের মতো মন্দ স্বভাব থেকে মুক্তির উপায়: এই মন্দ স্বভাব থেকে বাঁচার জন্য আমাদের অন্তরে আল্লাহ তা'আলার শাস্তির ভয় অন্তরে বদ্ধমূল করতে হবে। মিথ্যা বলার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। সৎ হতে হবে। অন্যের ব্যক্তিত্ব পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি যদি কেউ এসব কাজে পূর্বে থেকে লিপ্ত থাকে তাহলে আল্লাহর আযাবকে ভয় করে অপবাদ আরোপিত ব্যক্তির নিকট ক্ষমা চেয়ে এরপর আল্লাহর দরবারে তওবা করতে হবে। একে অপরকে অপবাদ দেওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে দাওয়াত দিতে হবে।
লেখক: জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।

