Logo

ধর্ম

খেলাফতে রাশেদা : ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়

Icon

যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:২১

খেলাফতে রাশেদা : ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়

খেলাফতে রাশেদার সময়কাল

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ ছিল বিশ্বের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর থেকে এই যুগের সূচনা, যা সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর স্থায়ী ছিল। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নবুয়তের ভিত্তিতে পরিচালিত খেলাফত ত্রিশ বছর অব্যাহত থাকবে। -(সূত্র: আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬৪৬)

* হজরত আবু বকর (রাযি.)-এর খেলাফতকাল ছিল দুই বছর তিন মাস।

* হজরত উমর (রাযি.)-এর খেলাফতকাল ছিল দশ বছর ছয় মাস।

* হজরত উসমান (রাযি.)-এর খেলাফতকাল ছিল বারো বছর।

* হজরত আলী (রাযি.)-এর খেলাফতকাল ছিল চার বছর নয় মাস।

* হজরত হাসান (রাযি.)-এর খেলাফতকাল ছিল ছয় মাস। 

এভাবে নবুয়তের ভিত্তিতে পরিচালিত খেলাফত ত্রিশ বছর পূর্ণ হয়েছে।

খেলাফতে রাশেদার খলিফাগণের মনোনয়ন পদ্ধতি 

হজরত আবু বকর (রাযি.): রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম জাহানের খলিফা হবেন আবু বকর (রাযি.)। পরবর্তীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর মদিনার সাকিফা বনু সাদায় মুসলমানগণ জমায়েত হন। আলোচনার এক পর্যায়ে ওমর (রাযি.) আবু বকর (রাযি.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারপর সকলেই তাঁর হাতে হাত রেখে বাইয়াত হন। 

হজরত উমর (রাযি.) : ইন্তেকালের সময় আবু বকর (রাযি.) বিশিষ্ট ও অভিজ্ঞ সাহাবিগণের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ওমর (রাযি.)-কে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। তারপর উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের নিকট এ সিদ্ধান্ত উত্থাপন করেন। সকলের নিকট তা গৃহীত হয় এবং আবু বকর (রাযি.)-এর মৃত্যুর পর ওমর (রাযি.) খেলাফতের মসনদে অধিষ্ঠিত হন। 

হজরত উসমান (রাযি.) : ওমর (রাযি.) শাহাদাত বরণকালে পৃথিবীতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছয় জন সাহাবির সমন্বয়ে একটি শুরা গঠন করেন। উক্ত শুরার পরামর্শক্রমে উসমান (রাযি.) পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হন।

হজরত আলী (রাযি.) : উসমান (রাযি.) -এর শাহাদাতের পর মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণের অনুরোধে আলী (রাযি.) খেলাফতের আসন অলঙ্কৃত করতে রাজি হন। সর্বপ্রথম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস (রাযি.) বাইয়াত হন। তারপর অন্যান্য মুসলমান আলী (রাযি.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন।

হজরত হাসান (রাযি.) : আলী (রাযি.) শহীদ হওয়ার পর কুফাবাসী জামে মসজিদে জমায়েত হন এবং তাঁর বড়ো সন্তান হাসান (রাযি.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তিনি ছয় মাস খলিফার দায়িত্ব পালন করার পর স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে সরে আসেন।

খেলাফতে রাশেদার খলিফাগণের বৈশিষ্ট্য

ত্রিশ বছরের খেলাফতে রাশেদা কোনো গতানুগতিক রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র ছিল না; বরং এর মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খোলাফায়ে রাশেদিন অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন এবং জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতেন।

ধুলোর তখতে বসে তাঁরা সর্বত্র কোরআনি হুকুম বাস্তবায়ন করেছেন; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত জিন্দা করেছেন এবং অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন। 

খেলাফতে রাশেদার সোনালি যুগে যেকোনো বিষয়ে কেবল যোগ্য ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করা হতো; ফলে, অজ্ঞ ও অযোগ্যদের পরামর্শ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।

জনগণের উপর খোলাফায়ে রাশেদিন কর্তৃত্বকারী ও জুলুমকারী ছিলেন না; বরং তাঁরা ছিলেন মানবদরদী ও আমানতদার শাসক। তাঁদের প্রশাসনিক নীতি উদার ও জনকল্যাণকর ছিল। সবসময় তাঁরা আখেরাতে মহান আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার ভয় করতেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে তাঁরা বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে সমাজের সকল স্তরের মানুষ সুখে-স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতেন।

খেলাফতে রাশেদার শাসন ব্যবস্থা

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে শাসন ব্যবস্থা দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিলো। ১. কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা; ২. প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা।

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা : কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার মূলভিত্তি ছিল রাজধানী। সেখানে খলিফাতুল মুসলিমিন প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থাকতেন। তিনি কোরআন-হাদিসের বিধান অনুযায়ী এবং ন্যায়পরায়ণ, যোগ্য ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত মজলিসে শুরার পরামর্শক্রমে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।

প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা : খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে ইসলামি সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় শাসনকাজ পরিচালনার সুবিধার জন্য গোটা রাষ্ট্রকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়েছিল। খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত ওয়ালিগণ সেসব প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। প্রদেশগুলোকে আবার কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করা হয়েছিল। ওয়ালির সহায়তাকারী হিসেবে প্রত্যেক জেলায় আমির নিযুক্ত করা হয়েছিল। আমির স্বীয় কৃতকর্মের জন্য ওয়ালির নিকট দায়বদ্ধ থাকতেন এবং ওয়ালি নিজ কর্মের জন্য খলিফার নিকট কৈফিয়ত দিতেন।

খেলাফতে রাশেদার সামরিক ব্যবস্থা

খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে দক্ষ ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। সেনাবাহিনী তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল- অশ্বারোহী, পদাতিক ও তীরন্দাজ। তাছাড়া আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি ছিলÑ গোয়েন্দা বাহিনী ও রসদ সরবরাহ বাহিনী। খোলাফায়ে রাশেদিনের কালে বেশ কয়েকটি সামরিক বিভাগ ছিল। সেগুলো মদিনা, কুফা, বসরা, প্যালেস্টাইন, দামেস্ক, হিস, উরদুন ও ফুসতাতে অবস্থিত ছিল। তাছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সামরিক ঘাঁটি ছিল।

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে প্রথমদিকে পুলিশ বাহিনী না থাকলেও পরবর্তীতে দক্ষ পুলিশ বাহিনী গঠিত হয় এবং প্রত্যেক প্রদেশ ও শহরে তাদের নিযুক্ত করা হয়। এ সকল পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব ছিল- অপরাধ দমন করা, আসামি গ্রেপ্তার করা এবং দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

খেলাফতে রাশেদার বিচার ব্যবস্থা 

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে স্বয়ং খলিফা ছিলেন সর্বোচ্চ বিচারপতি। তাছাড়া প্রত্যেক প্রদেশে একজন প্রধান বিচারক এবং প্রত্যেক জেলায় একজন কাজি নিযুক্ত ছিলেন। বিচারক ও কাজিগণ ছিলেন সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ। তাঁরা শরিয়তের চার মূলনীতিÑ কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের উপর ভিত্তি করে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। বিচারে তাঁদের রায় হতো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। তাঁদের আদালতের কাঠগড়ায় ধনী-গরিব ও শাসক-শাসিতের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকত না। খলিফা ওমর (রাযি.) ও ঘোড়া বিক্রেতার ঘটনা এবং খলিফা আলী (রাযি.) ও অমুসলিম এক নাগরিকের বর্মের মামলার ঘটনা হচ্ছে এর জ্বলন্ত প্রমাণ। উভয় ঘটনায় বিচারকের রায় খলিফাদের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। তাঁরা অবনতচিত্তে তা মেনে নিয়েছিলেন।

খেলাফতে রাশেদার রাজস্ব ব্যবস্থা

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস ছিল গনিমত, জাকাত, সদকা, উশর, খারাজ, জিজিয়া, হিমা ইত্যাদি। এসব থেকে সংগৃহীত অর্থ সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করা হতো এবং নাগরিকদের ভাতা প্রদান করা হতো। উদ্বৃত্ত রাজস্ব বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সংরক্ষিত থাকত, যেগুলো জনকল্যাণমূলক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহার করা হতো। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কাজে বিশ্বস্ত, আমানতদার ও সত্যবাদী মানুষ নিয়োজিত থাকতেন। ফলে, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ থাকত না।

উপসংহার

গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে খেলাফতে রাশেদা সততা, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের অন্যতম এক স্বর্ণযুগ। খেলাফতে রাশেদা চিরন্তন অনুকরণীয় শাসন ব্যবস্থার বাস্তব রূপরেখা। খেলাফতে রাশেদার আদর্শ ও সুশাসনের মূলনীতিগুলো অনুসরণ করলে বর্তমান অশান্ত এ পৃথিবীতে ইনসাফভিত্তিক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভবপর হবে ইনশাআল্লাহ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন