কওমি ও মহিলা মাদরাসা
মিডিয়ার অপপ্রচার, বাস্তবতা ও আলেমদের করণীয়
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২১
মিডিয়ার মুখরোচক খবরের ক্ষুধা মেটাতে একেক সময় একেকটি বিষয় সামনে আসে। কিছুদিন মিডিয়ার খোরাক ছিল পাটোয়ারী, তার আগে গাজী। গাজীর পাজিগিরি ও অপকর্মের বিষয়টি যখন প্রকাশ্যে এলো, জামায়াত তাকে দ্রুত বহিষ্কার করে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর গত কয়েক মাস ধরে মিডিয়ার প্রধান খোরাকে পরিণত করা হয়েছে কওমি মাদ্রাসা এবং বিশেষ করে 'মহিলা মাদ্রাসা'কে।
যে শব্দ বা অন্যায়ের অভিযোগে আজ মাদ্রাসাগুলোকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, কুরআনে সেই অন্যায়ে লিপ্ত থাকা একটি অভিশপ্ত ও বিধ্বস্ত জাতির ইতিহাস স্পষ্ট ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা সেই কওমকে উল্টে দিয়ে ধ্বংস করেছেন, যার সাক্ষ্য আজ পর্যন্ত মৃত সাগর (Dead Sea) বহন করে চলেছে। অথচ সাড়ে ১৪ শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা শিক্ষাকে আজ মিডিয়া প্রতিনিয়ত এমন এক অপকর্ম বা অভিশপ্ত কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে সংবাদ পরিবেশন করছে!
মহিলা মাদ্রাসার উত্থান ও অপরিকল্পিত যাত্রা
আমাদের দেশে ১৯৮০ সালের আগে কোনো 'মহিলা মাদ্রাসা' ছিল না বলেই চলে। ৯০-এর দশকের শুরু এবং ২০০০-এর দশক থেকে ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামনে আসছে।
অতীতে আলেমদের পরিবারে নারীদের পারিবারিক পরিবেশেই দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া হতো। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল-কলেজে সহশিক্ষা (Co-education) থাকার কারণে আলেমরা তাদের কন্যাদের সেখানে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। ফলে তারা পৃথক মহিলা বা বালিকা মাদ্রাসা শুরু করেন।
কিন্তু সমস্যা হলো নারীরা কীভাবে, কোন কাঠামোর অধীনে শিক্ষা অর্জন করবে, এসব নীতিমালা ঠিকঠাক না করেই অপরিকল্পিতভাবে এই ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, শরীয়তের পর্দা বা হিজাবের সঠিক বিধান মানেন না এমন অনেকেই আজ বাসা ভাড়া নিয়ে মাদ্রাসা খুলে বসছেন। সেখান থেকেই একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, যার কারণে টুপি-দাড়ি ও জুব্বা পরা সাধারণ আলেমদের ব্যাপক দুর্নাম হচ্ছে।
'জঙ্গিবাদ' ট্যাগ ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা
কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে তথাকথিত 'জঙ্গি' অপবাদ দিয়ে আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি চরম জুলুম করা হয়েছে। রাস্তায় হাঁটাচলা করতে গিয়ে ব্যাগে বই বা পোশাক থাকলেও তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হতো। মিথ্যা অভিযোগে অনেকেই গুমের শিকার হয়েছেন, বছরের পর বছর জেল খেটেছেন।
মূলত এটি ছিল পশ্চিমা বিশ্বের একটি বিশ্বায়ন এজেন্ডা—মুসলিম বিশ্বে নিরবচ্ছিন্ন 'জঙ্গিবাদী ট্যাগ' আমদানি করা এবং ফান্ডিং করা। আর এই ষড়যন্ত্রের সহজ শিকার করা হয়েছিল মাদ্রাসা পড়ুয়াদের। কারণ-
মিডিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অভাব: আলেম সমাজ শীতকালে ওয়াজ মাহফিলে চিৎকার ও চিল্লাচিল্লি করলেও গত ৫০ বছরে একটি শক্তিশালী মিডিয়া গড়ে তুলতে পারেননি। এটি তাদের চরম ব্যর্থতা।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা: যোগ্য লোক বা আর্থিক সচ্ছলতার অভাবে তারা মিডিয়ার এই বিষাক্ত অপপ্রচারের মোকাবেলা করতে পারছেন না। ফলে শত শত নিরপরাধ মানুষ জেলখানায় জীবন কাটিয়েছে। অন্যদিকে, অতীতে যারা না বুঝে উগ্র ভাবধারায় জড়িত হয়ে গণতন্ত্রকে 'হারাম' বলতো, তাদের কেউ কেউ এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে আশ্রয় নিয়ে গণতন্ত্রের প্রবক্তা সেজে বসেছে!
মিডিয়ার বাড়াবাড়ি ও 'হলুদ সাংবাদিকতা'
স্কুল, কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটিতে অহরহ অপরাধ ও চারিত্রিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটে। এমনকি শাহবাগে প্রগতিশীলতার নামে বা আমাদের বিনোদন পার্কগুলোতে যে অবাধ মেলামেশা ও ফ্রি-মিক্সিং চলে, তারা কি মাদ্রাসায় পড়ে? উন্নত হোটেল বা শহরের অলিগলিতে যে পতিতাবৃত্তি বা লিভ-টুগেদার চলছে, সেগুলোর পেছনে কি মাদ্রাসা জড়িত?
অবশ্যই না! কিন্তু ফেসবুকে বা সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে মনে হয়, যাবতীয় অপকর্ম কেবল কওমি ও মহিলা মাদ্রাসাতেই হচ্ছে।
কোনো অভিযোগ উঠলেই সত্যতা বা বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই না করে একশ্রেণীর 'হলুদ মিডিয়া' ছবিসহ প্রচার শুরু করে দেয়।
অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই মিডিয়ার ভিউ ও লাইক পাওয়ার লোভে সামাজিক বিচার ও হামলা চালানো হয়।
ব্যক্তিস্বার্থ বা জমি-মাদ্রাসা দখলের উদ্দেশ্যে হুজুরদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ও চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে।
কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে কোনো সংবাদ এলে তার সততা যাচাই করে প্রচার করতে হয়। প্রমাণের আগে অপপ্রচার চালানো চরম অপরাধ।
নিজেদের আত্মসমালোচনা ও কওমি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব
মিডিয়াকে দোষ দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের ভেতরের গলদগুলোও স্বীকার করতে হবে।
১. পর্দা হিজাবের সুরক্ষা ও নারীর সঙ্গে নির্জনতা বর্জন: যেসব শিক্ষক বা পরিচালক নারী সংক্রান্ত কোনো কেলেঙ্কারি বা অন্যায়ে জড়িত হবে, তদন্ত সাপেক্ষে দোষ প্রমাণিত হলে তাকে অবিলম্বে বহিষ্কার করতে হবে। কোনো অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া যাবে না।
২. পর্নোগ্রাফি ও মোবাইল আসক্তি: প্রযুক্তি ও অনিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কারণে আলেম সমাজও প্রলোভনের বাইরে নয়। যেসব ইমাম বা শিক্ষক পর্নোগ্রাফি বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকবে, তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।
৩. অনাবাসিক মাদ্রাসা নিশ্চিতকরণ: এখন পাড়ায় পাড়ায় মাদ্রাসা হয়েছে। ছোট ছোট মেয়েদের বাসা থেকে দূরে আবাসিক মাদ্রাসায় রাখার আর প্রয়োজন নেই। যেখানে সঠিক নিরাপত্তা, বিনোদন ও পর্যাপ্ত খাবারের সুন্দর ব্যবস্থাপনা নেই, সেখানে শিশুদের আবাসিকে রাখা উচিত নয়।
৪. বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা: মহিলা মাদ্রাসার নামে ব্যবসা বা বাণিজ্য করা চরম অন্যায়। শিক্ষা ব্যবসা হতে পারে না।
5. আধুনিক ডেটাবেজ (Central Database): এআই (AI) ও আধুনিকতার এই যুগে কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা। যাতে একজন অপরাধী শিক্ষক এক মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে অন্য মাদ্রাসায় চাকরি না পেতে পারে এবং তার সনদের কার্যকারিতা বাতিল করা যায়।
কওমি মাদ্রাসা হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। আজও আমাদের সমাজে যদি পারিবারিক সৌজন্য, সামাজিক ভদ্রতা ও শরীয়তের বিধান টিকে থাকে, তবে তা এই মাদ্রাসা শিক্ষার কল্যাণেই টিকে আছে। তথাকথিত আধুনিক সমাজে যেখানে তালাক, লিভ-টুগেদার ও চারিত্রিক ধস চরম আকার ধারণ করেছে, সেখানে আলেম সমাজের পরিবারে অপরাধের হার অন্যান্য জায়গার চেয়ে বহু গুণে কম।
তাই মিডিয়া ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান প্রমাণ ছাড়া অপপ্রচার চালাবেন না। অন্যায়কারীর বিচার অবশ্যই করুন, কিন্তু একটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ও পোশাককে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না।
একই সাথে অভিভাবক ও ইসলামপন্থীদের প্রতি আহ্বান অপপ্রচারে বিচলিত হবেন না। তবে দ্বীনের সুরক্ষায় আপনাদেরকেও কলম ধরতে হবে, মিডিয়া ও সেমিনার আয়োজনে বিনিয়োগ করতে হবে। আমরা আশা করি, সকল অপপ্রচার ও অভ্যন্তরীণ ভুলত্রুটি কাটিয়ে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা তার গৌরবের সাথে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

