ইসলামি দাওয়াহ ও শিক্ষার পুনর্গঠন
শরিয়াহ বাস্তবায়নের চেতনায় মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৪৫
১. মানবজাতির একমাত্র মুক্তির সনদ ইসলাম
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন যা মানবজাতির সার্বিক মুক্তির প্রকৃত ঠিকানা। ‘ইসলাম’ শব্দের মূল অর্থ আত্মসমর্পণ; আর এর মূলে নিহিত রয়েছে সালাম বা শান্তির অমিয় ধারা। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সাজালেই কেবল ইহলৌকিক শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি সম্ভব।
ইসলাম পূর্ববর্তী সকল আসমানী শরীয়াহর নির্যাস ও চূড়ান্ত রূপ। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না, এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ নিখুঁত শরীয়াহর পর আর কোনো নতুন আইনের প্রয়োজন নেই। তিনি শ্রেষ্ঠ নবী, তাঁর শরীয়াহ শ্রেষ্ঠ শরীয়াহ। তিনি শেষ নবী, তাঁর বিধানই চূড়ান্ত বিধান।
২. নববী জীবনের দুটি অধ্যায়: ত্যাগ ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
মাক্কী জীবন; দাওয়াহ, তাযকিয়া ও ধৈর্য: মাক্কী জীবনে বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর আসহাবগণ অমানুষিক জুলুম, নির্যাতন, সামাজিক বয়কট ও হিজরতের সম্মুখীন হয়েছেন। সেখানে আবু জাহল ও আবু লাহাবের মতো শয়তানী শক্তির দাপট ছিল; ছিল রাসুল (সা.)-কে কবি, জাদুকর ও প্রাক-কথক বলে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা। তায়েফের রক্তাক্ত প্রান্তর, হাবশার হিজরত, হযরত বিলাল (রা.)-এর ওপর পাশবিক নিপীড়নের মুখে ‘আহাদ আহাদ’ ধ্বনি এবং হযরত সুমাইয়া (রা.)-এর শাহাদাতের ইতিহাস এই মাক্কী জীবনেরই অংশ। এ পর্বের মূল ভিত্তি ছিল দাওয়াহ, ঈমানী তারবিয়াত এবং আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়া)।
মাদানী জীবন: সার্বভৌমত্ব, শরীয়াহ ও বিজয়ের স্মারকহিজরতের পর মাদানী জীবনে আউস ও খাজরাজ গোত্রের ঐক্যের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেখানে একদিকে ছিল বনু নাযীর ও বনু কুরাইযার মতো ষড়যন্ত্রকারী শক্তির মোকাবিলা; অন্যদিকে ছিল সত্যকে বিজয়ী করার সশস্ত্র ও নিরস্ত্র সংগ্রাম। বদর, উহুদ, খন্দক, হুনাইন ও মুতার মতো ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় দেশ জয়ের গৌরবময় অতীত।
মাদানী জীবনেই পূর্ণাঙ্গভাবে রূপ নেয় শরীয়াহর প্রয়োগ: বিচারালয় স্থাপন এবং আল্লাহর দেওয়া ‘হুদুদ’ (সুনির্দিষ্ট আইনি শাস্তি) বাস্তবায়ন যেমন চুরির শাস্তি, ব্যভিচারের দণ্ড ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও নিরাপত্তার সুব্যবস্থা এবং শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার।
আন্তর্জাতিক নীতি: অমুসলিম রাজাদের প্রতি দাওয়াতনামা প্রেরণ এবং ‘আস্লিম তাসলাম’ (ইসলাম গ্রহণ করো, শান্তিতে থাকো)-এর ঘোষণা। হয় ইসলাম গ্রহণ, না হয় জিজিয়া প্রদানের মাধ্যমে অনুগত থাকা, অন্যথায় তরবারির ফায়সালা। মাক্কী যুগে যেখানে ঘোষিত হয়েছিল “লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন” (তোমাদের বাতিল ধর্ম তোমাদের, আমার সত্য দীন আমার), মাদানী যুগে এসে সেই সত্যই বিজয় লাভ করে। কারণ, বাতিলকে বাদ দিয়ে একমাত্র ইসলামকেই মহান রব্বুল আলামীন দীন হিসেবে কবুল করেছেন।
৩. সোনালী যুগ ও মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী পতন
খেলাফতে রাশেদা ও বিজয়ের জয়জয়কার: নববী যুগের পর সূচনা হয় খেলাফতে রাশেদার সোনালী অধ্যায়। কিসরা ও কায়সারের পরাক্রমশালী রাজসিংহাসন মুসলিমদের করতলে পরিণত হয়। কালিমার বিজয় পতাকা উড়েছে বিশ্বজুড়ে।
সেখানে দেখা গেছে- মুরতাদ ও যাকাত অস্বীকারকারীদের কঠোর হস্তে দমন।যাকাতভিত্তিক ও সুদমুক্ত সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। শরীয়াহ আদালতের মাধ্যমে আদল ও ইনসাফের শতভাগ বাস্তবায়ন। ফেনিল গানা থেকে ফারগানা, কাসাব্লাংকা থেকে জাকার্তা—উত্তর থেকে দক্ষিণ, সর্বত্রই ওড়ে ইসলামের বিজয়নিশান।
পতন ও গাদ্দারীর করুণ ইতিহাস: কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই সোনালী অতীতের পর শুরু হয় এক অন্ধকার অধ্যায়। ইখতেলাফ (আভ্যন্তরীণ মতভেদ), চক্রান্ত, গাদ্দারী ও সামরিক পরাজয়ের ধারাবাহিকতায় একপর্যায়ে খিলাফত বিলুপ্ত হয়। সূচিত হয় উম্মাহর দীর্ঘ কান্না, বিলাপ ও পরাধীনতার ইতিহাস।
৪. বর্তমান প্রেক্ষাপট
পুনর্জাগরণের বার্তা। আজ আর বিলাপের সময় নয়; এখন জেগে ওঠার সময়। প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের সময়। ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার আদায়ের সময়। খেলাফাহ যুগের ন্যায় ও ইনসাফের বিশ্বজনীন দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার সময়। মানব রচিত সকল মতবাদের ব্যর্থতা উচ্চকণ্ঠে তুলে ধরার সময়।
প্রস্তাবনা
মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের রূপরেখা: যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে শরীয়াহ বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি-
যৌক্তিক ও তুলনামূলক পাঠদান: আধুনিক মানব রচিত মতবাদগুলোর (পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদি) ব্যর্থতা যুগের ভাষায় ও যুক্তির আলোকে উপস্থাপন করতে হবে। ইসলামী শরীয়াহর সার্বিক সৌন্দর্যকে ‘কম্পারেটিভ স্টাডি’ বা তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ উপস্থাপন: খণ্ডিতভাবে নয়, বরং তালেবে ইলমদের (শিক্ষার্থীদের) সামনে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ব্লুপ্রিন্ট ও মানচিত্র তুলে ধরতে হবে।
আধুনিক বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ: শরীয়াহর এই বৈশ্বিক মানচিত্র কি রাজনৈতিক বিজ্ঞান (Political Science) ও সমাজবিজ্ঞান (Social Science) না পড়ে অনুধাবন করা সম্ভব? অর্থনীতি (Economics) না বুঝলে কি একটি সুদের বিকল্প অর্থনীতি দাঁড় করানো সম্ভব?
ফিকহের যুগোপযোগী প্রয়োগ: আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার পরিভাষা না জানলে ফিকহের বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে সম্ভব? সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাঙন এবং রূপান্তরের গতিপ্রকৃতি না বুঝলে শরীয়াহর জীবন্ত চিত্র আঁকা অসম্ভব।
চেতনার বিকাশ: শুধু ব্যক্তিগত কিছু ইবাদতের বিধান পড়ে কিংবা কিতাবের মলাটে শরীয়াহকে বন্দি রেখে কি ইলমের মূল ফযীলত ও আসল লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে?
৬.
আজকের বিশ্বে কোথায় শরীয়াহর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন রয়েছে? শরীয়াহ কি কেবল কিতাবে পড়া ও পড়ানোর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে? না! শরীয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো—একে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তাই সময় এসেছে, আমাদের মাদরাসা শিক্ষায় শরীয়াহ বাস্তবায়নের এই সুপ্ত চেতনাকে পুনরায় জাগ্রত করার।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

