আলেমদের গণমুখী ব্যবসা : কেন ও কীভাবে
দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৩০
(পূর্ব প্রকাশের পর..)
একটি আদর্শ ব্যবসা কেবল মূলধনের ওপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় মানুষের বিশ্বাসের ওপর। অর্থ দিয়ে ব্যবসা শুরু করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া ব্যবসাকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। ইসলামী অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিও এখানেই—এটি মানুষকে শুধু লাভ করতে শেখায় না, বিশ্বাস অর্জন করতেও শেখায়।
আজকের বাংলাদেশে কৃষক উৎপাদন করেন, ব্যবসায়ী বাজারজাত করেন, আর ভোক্তা পণ্য কিনে থাকেন। কিন্তু এই তিন পক্ষের মাঝখানে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিই আমাদের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা। কৃষক মনে করেন, তিনি তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান না। ভোক্তা মনে করেন, তিনি ন্যায্য দামে মানসম্মত পণ্য পান না। আর মাঝখানে অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হয় অবিশ্বাস, অস্বচ্ছতা ও সুযোগসন্ধানী বাণিজ্য।
আমার উদ্যোক্তা জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি উপলব্ধি করেছি, এই সংকটের সমাধান শুধু নতুন প্রযুক্তি বা বড় বিনিয়োগে নয়; বরং সততা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত।
এই চিন্তা থেকেই "কতকিছুর হাট"-এর পথচলা। শুরু থেকেই আমাদের চেষ্টা ছিল কৃষকের কাছ থেকে যতটা সম্ভব সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করা এবং সেগুলো যথাযথভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমরা কখনো নিজেদের শুধু পণ্যের ব্যবসায়ী মনে করিনি; বরং কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে একটি বিশ্বাসের সেতু নির্মাণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হিসেবে কাজ করেছি।
আমি বহু কৃষকের সঙ্গে মাঠে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। দেখেছি, একজন কৃষকের সবচেয়ে বড় চাওয়া শুধু বেশি দাম নয়; ন্যায্য দাম। আবার শহরের একজন ক্রেতারও সবচেয়ে বড় চাওয়া কম দাম নয়; নির্ভরযোগ্য পণ্য। এই দুই চাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই একজন ইসলামী উদ্যোক্তার অন্যতম দায়িত্ব।
ইসলামী অর্থনীতি আমাদের শেখায়, ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু সম্পদ সঞ্চয় নয়; সম্পদের সুষম প্রবাহ নিশ্চিত করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, যাতে সম্পদ শুধু ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয় (সুরা আল-হাশর: ৭)। এই নীতিই আমাদের শেখায়—অর্থনীতি তখনই সুস্থ হয়, যখন উৎপাদক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং ভোক্তা—সবাই ন্যায্য অধিকার পায়।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আলেম সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ মানুষের কাছে তাঁদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে—বিশ্বস্ততা। যদি এই বিশ্বস্ততার সঙ্গে দক্ষ ব্যবস্থাপনা যুক্ত হয়, তাহলে আলেমদের নেতৃত্বে অনেক আদর্শ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা সম্ভব।
তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলেমদের ব্যবসা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সমাজের প্রকৃত উপকারে আসে। শুধু বিলাসপণ্য বা সীমিত বাজারের ব্যবসা নয়; বরং কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ফার্মেসি, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, কৃষিভিত্তিক শিল্প, মাছ ও গবাদিপশুর খামার, নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ—এসব গণমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ এসব খাত শুধু লাভের সুযোগই সৃষ্টি করে না; কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও বাড়ায়।
আমাদের দেশে হাজারো শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা হতে চান। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, বড় ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই সুদভিত্তিক ঋণ বা প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে। বাস্তবে ইসলামী অর্থনীতি বিকল্প পথও দেখিয়েছে।
শিরকাহ (অংশীদারিত্ব) ও মুযারাবা (লাভের অংশীদারিভিত্তিক বিনিয়োগ) শুধু ফিকহের অধ্যায় নয়; এগুলো বাস্তব ব্যবসায়িক কাঠামো। কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষ স্বচ্ছ চুক্তির ভিত্তিতে অংশীদার হতে পারেন। আবার দক্ষ উদ্যোক্তা মূলধন ছাড়াও তাঁর শ্রম ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মুযারাবার ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এই দুটি পদ্ধতি অসংখ্য সফল প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি ছিল।
অবশ্য এসব ব্যবস্থার সফলতার পূর্বশর্ত একটিই—আমানতদারিতা। লিখিত চুক্তি, স্বচ্ছ হিসাব, নিয়মিত নিরীক্ষা, ন্যায্য লাভ বণ্টন এবং পারস্পরিক জবাবদিহি ছাড়া কোনো ইসলামী ব্যবসায়িক মডেল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যবসার উন্নতি শুধু মালিকের জন্য নয়; প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনা উচিত। একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক, বিক্রয়কর্মী কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলে তাঁকে বৈধ উপায়ে উৎসাহিত করা ইসলামী ন্যায়বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ন্যায্য বেতন, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ এবং উন্নতির সুযোগ—এসবই একটি সুস্থ প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য।
আমাদের সমাজে আরেকটি ভুল ধারণা রয়েছে—হালাল ব্যবসা করলে খুব বড় হওয়া যায় না। বাস্তবে ইতিহাস তার উল্টো কথাই বলে। পৃথিবীর বহু মুসলিম বণিক সততা, ন্যায্যতা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে শুধু ব্যবসায় সফল হননি; ইসলামের দাওয়াতও মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চলে ইসলামের বিস্তারে বণিকদের অবদান ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশেও সেই ঐতিহ্য নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের দরকার এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে ব্যবসা হবে শরিয়াহর সীমার মধ্যে, কর্মসংস্থান হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে, কৃষক পাবেন তাঁর প্রাপ্য, ভোক্তা পাবেন নিরাপদ পণ্য এবং কর্মীরা পাবেন সম্মানজনক পরিবেশ। একটি প্রতিষ্ঠান যদি এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটি শুধু ব্যবসা করবে না; সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠবে।
আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনের বাংলাদেশে ইসলামী উদ্যোক্তা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হবে উৎপাদন, নৈতিকতা এবং আস্থা। আমরা যদি কৃষিকে শক্তিশালী করি, হালাল শিল্প গড়ে তুলি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করি এবং শরিয়াহসম্মত ব্যবসায়িক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে শুধু কিছু প্রতিষ্ঠান নয়; একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারা গড়ে উঠবে।
আজ আমার ব্যক্তিগত স্বপ্ন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সফলতা নয়। আমি চাই, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত তরুণ আলেম, শিক্ষিত যুবক ও উদ্যোক্তা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলুন। তাঁরা যেন প্রমাণ করেন—হালাল পথে থেকেও সফল হওয়া যায়, সততা দিয়েও বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায় এবং ব্যবসাও মানুষের সেবা ও ইবাদতের একটি মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
আমরা প্রায়ই বলি, ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতি কোনো বিমূর্ত স্লোগান নয়; এটি শুরু হয় একটি সৎ লেনদেন থেকে, একটি ন্যায্য ওজন থেকে, একটি সত্য কথার মাধ্যমে এবং একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে।
সম্ভবত একটি আদর্শ সমাজও এভাবেই গড়ে ওঠে—একজন সৎ মানুষ, একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান এবং একটি হালাল লেনদেনের মধ্য দিয়ে।
ইসলামের ইতিহাস আমাদের শেখায়, সভ্যতা কেবল মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে নয়; ন্যায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেও বিকশিত হয়। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন উদ্যোক্তা, যিনি লাভের পাশাপাশি জবাবদিহিতাকেও সমান গুরুত্ব দেন; এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, কর্মচারী ও ভোক্তা—সবার অধিকার সংরক্ষিত থাকে। হালাল রিজিক কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।
যদি আমরা সততা, দক্ষতা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতিকে ব্যবসার মূলনীতি করতে পারি, তবে ইনশাআল্লাহ আগামী দিনের বাংলাদেশে ইসলামী অর্থনীতির একটি বাস্তব, কার্যকর ও অনুসরণযোগ্য মডেল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত তরুণ আলেম, শিক্ষিত যুবক ও উদ্যোক্তা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলবেন। তাঁরা প্রমাণ করবেন—হালাল পথে থেকেও সফল হওয়া যায়, সততা দিয়েও বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায় এবং ব্যবসাও মানুষের সেবা, জাতির কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট
ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

