Logo

ধর্ম

সুখময় দাম্পত্য জীবনের পাথেয়

Icon

হুসাইন আহমদ

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯:১০

সুখময় দাম্পত্য জীবনের পাথেয়

মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় বিবাহ। এই বিবাহ কেবল একটি শারীরিক বা সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আত্মিক বন্ধন, ইবাদত এবং মহান আল্লাহর অশেষ নিয়ামত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এর মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেছেন, আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো- তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সূরা আর-রূম : ২১)

​আর একটি দাম্পত্য জীবনকে সুখময়, সচ্ছল ও প্রীতিময় করে তোলার জন্য ইসলাম কিছু কালজয়ী নীতি ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ইসলামের আলোকে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

​১। ঈমান ও তাকওয়ার মজবুত ভিত্তি

​দাম্পত্য জীবনের সুখের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো স্বামীর ও স্ত্রীর মধ্যকার তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। অর্থাৎ যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আল্লাহকে ভয় করবে, তখন তারা কেউ কারও ওপর জুলুম করবে না। উপযোগী পরিবেশ বজায় থাকলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর ​একসাথে ইবাদত করা, (যেমন: তাহাজ্জুদ ও ফরজ সালাত, কুরআন তেলাওয়াত) যা হৃদয়ে বিশেষ প্রশান্তি এনে দেয়।

​২। একে-অপরের দায়িত্ব ও অধিকার সচেতনতা

​ইসলামে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্যই নির্দিষ্ট কিছু অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন স্বামীর ওপর দায়িত্ব ও কর্তব্য : ১। স্ত্রীর মোহর আদায় করা। ২। সামর্থ্য অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। ৩। স্ত্রীর সাথে সদয় ও সম্মানজনক আচরণ করা।

স্ত্রীর ওপর দায়িত্ব ও কর্তব্য : ১। স্বামীর প্রতি অনুগত থাকা (শরীয়তবিরোধী কাজ ব্যতীত)। ২। স্বামীর সম্পদ ও আমানতের হেফাজত করা। ৩। স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করা।

৩। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা

​আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকট তোমাদের চেয়ে বেশি উত্তম। তিরমিজি

​ক. সহমর্মিতা ও সময় দেওয়া: নবীজি (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন এবং তাঁদের সাথে আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিতেন।

​খ. ঘরের কাজে সাহায্য করা: ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম সুন্নাহ।

৪। ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ও ক্ষমাশীলতার মানসিকতা রাখা

​মানুষ মাত্রই ভুল ত্রুটি হতে পারে। নিখুঁত মানুষ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তাই ক্ষুদ্র ত্রুটি উপেক্ষা করা : স্ত্রীর কোনো একটি দিক অপছন্দ হলে অন্য ভালো দিকগুলোর কথা চিন্তা করে তাকে ক্ষমা করা উচিত। আর রাগ নিয়ন্ত্রণ করা : দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া বা মতানৈক্য দেখা দিলে যেকোনো একজনকে নীরব ভূমিকা পালন করতে হবে। রেগে গেলে চুপ থাকা অথবা স্থান পরিবর্তন করা উচিত।

​৫। পরস্পরের গোপনীয়তা রক্ষা করা

​দাম্পত্য জীবনের অন্তর্বর্তী বিষয় এবং ব্যক্তিগত বিষয়াদি তৃতীয় কারো কাছে প্রকাশ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নিজের ঘরের গোপন কথা বাবা-মা, ভাই-বোন বা বন্ধুদের কাছে বলা যাবে না। এমনকি স্ত্রীর বা স্বামীর ব্যক্তিগত ভুল-ত্রুটি অন্যের সামনে আলোচনা না করে আড়ালে সুন্দর ভাষায় সংশোধন করা উচিত।

​৬। সুন্দর সুন্দর কথা ও প্রশংসার চর্চা করা

কেননা ​হাসিমুখ ও মিষ্টি কথা ভালোবাসার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। একে অপরের কাজের প্রশংসা করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা (যেমন: রান্নার প্রশংসা করা, কষ্টের মূল্যায়ন করা)। এছাড়া ভালোবেসে উপহার দেওয়া (রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা একেঅপরকে উপহার দাও, এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। বুখারী)।

​৭। অধিক পরিমাণে দোয়া ও ইস্তিগফার করা

​দাম্পত্য জীবনের প্রশান্তি অর্জনে দোয়ার ভূমিকা অপরিসীম। কুরআনে একটি চমৎকার দোয়া শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, সূরা আল-ফুরকান : ৭৪ নং আয়াত। যার অর্থ- হে আমাদের রব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় এবং আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম বানিয়ে দিন। 

​অতএব সবকিছুর পরেও ক্ষমা, ধৈর্য, পরিণত জ্ঞান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আল্লাহভীতিই হলো একটি সুখময় দাম্পত্য জীবনের চাবিকাঠি। অধিকার আদায়ের চেয়ে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার ত্যাগের মনমানসিকতাই একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবনে প্রকৃত সুখ ও জান্নাতি প্রশান্তি নিশ্চিত করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন এবং কবুল করুন। আমিন। 

লেখক: আলেম শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন