Logo

ধর্ম

ক্বায়েদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)

ইন্তেকালের আগের দিনগুলো

Icon

মুফতী জুনাইদ আহমদ

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯

ইন্তেকালের আগের দিনগুলো

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজ্জত রক্ষার্থে শাহবাগে অবস্থান করা নাস্তিক-মুরতাদদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

​আমীরে হেফাজত শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর ডাকে, ক্বায়েদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দলমত নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ তৌহিদি জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ মে-র ঐতিহাসিক ঢাকা অবরোধ। ৬ এপ্রিলের লংমার্চ, ৫ মে-র অবরোধসহ হেফাজতের সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রভাগে ছিলেন আপসহীন ক্বায়েদ আল্লামা বাবুনগরী (রহ.)।

​অবরোধের পরদিন ৬ মে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডসহ ২২ দিন কারানির্যাতন ভোগ করেছিলেন। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, হাই প্রেসারসহ নানা অসুস্থতা নিয়ে রিমান্ডে মানবেতর জীবনযাপন করেছিলেন। রিমান্ডের পর কারাগারে যখন বাবুনগরী (রহ.) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন অনেকটা বেকায়দায় পড়ে আইনজীবীকে ডেকে নিয়ে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

​মুক্তির পর ঢাকার বারডেম, খিদমাহ, চট্টগ্রামের সিএসসিআর ইত্যাদি হাসপাতালে বারবার চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি বাবুনগরী (রহ.)। রিমান্ডের আগে যেই দুই পায়ে ভর করে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতেন, রিমান্ডের পর সেই পা দুটি ছিল প্রায় পঙ্গু। হাঁটতে পারতেন না। হুইলচেয়ার ছিল নিত্যসঙ্গী। দু-চার জনের কাঁধে ভর করে দাঁড়াতে হতো। পা দুটো সব সময় ফোলা থাকত। আফসোস করে বলতেন— "আহ, এক সময় কত হাঁটাচলা করেছি! আজ আমার পা দুটো অচল প্রায়। কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় এক হিন্দু ডাক্তার আমার চিকিৎসা করেছে। কিডনির সমস্যা সত্ত্বেও সেই ডাক্তার আমাকে ব্যথার ওষুধ খাওয়াত। জানি না কী কী ওষুধ খাইয়েছে, কী কী ইনজেকশন পুশ করেছে! দুনিয়ায় কারও নিকট কোনো অভিযোগ করব না, সবকিছু আল্লাহ তাআলার সোপর্দ করেছি।"

​বাবুনগরী (রহ.)-এর জামাতা মাও. আবদুল্লাহ সাহেবের মুখে শুনেছি, রিমান্ড শেষে যখন গুরুতর অবস্থায় বাবুনগরী (রহ.)-কে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন কিডনির সমস্যা ছিল খুব বেশি। বেশ কবার ডায়ালিসিস করাতে হয়েছে। অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে, একাধিক ডাক্তার তখন বলেছিলেন, বাবুনগরী সাহেবের কিডনির যেই খারাপ অবস্থা, এমন রোগী বছর দেড়েকের বেশি বাঁচবে না। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি, ২০১৩ সালের পর ৯ বছর জীবিত ছিলেন তিনি।

​ডায়াবেটিস বেশি থাকায় তিন বেলা ইনসুলিন দিতে হতো। দৈনিক প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি ট্যাবলেট খাওয়াতে হতো। সারা বছরই অসুখ লেগে থাকত। রক্তের জন্য মাস ছয়েক পর পর দামি ইনজেকশন পুশ করতে হতো। শারীরিক এমন গুরুতর অসুস্থতা নিয়েই দরস-তাদরীস, ওয়াজ-নসিহত, লিখনীসহ দ্বীনের বহুমুখী খেদমত করে গেছেন দুনিয়াবিমুখ এ আল্লাহর ওলী।

​ইন্তেকালের আগের দিনগুলোতে খুব বেশি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন আল্লামা বাবুনগরী (রহ.)। চার-পাঁচ জন মিলেও হযরতকে দাঁড় করাতে কষ্ট হয়ে যেত। পায়ে একেবারেই ভর করতে পারতেন না, শক্তি পেতেন না। পানির গ্লাসটাও নিজ হাতে ওঠাতে পারতেন না। খাবারও মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হতো। বিশেষ করে হেফাজত নেতাকর্মীসহ ওলামায়ে কেরাম গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে অসুস্থতার সাথে সাথে মানসিকভাবেও খুব বেশি ভেঙে পড়েছিলেন। যখনই কোনো আলেমের গ্রেপ্তার বা রিমান্ডের খবর শোনানো হতো, তখন অস্থির হয়ে যেতেন। হাউমাউ করে কেঁদে উঠতেন। হাত তুলে মোনাজাত শুরু করতেন। আসমানের দিকে তাকিয়ে বলতেন— "ও আল্লাহ! আমি কমজোর, আমার থেকে এত বড় ঈমানী পরীক্ষা নিও না। আলেম-ওলামাদের তুমি হেফাজত করো। জুলুমের সামনে হকের উপর অটল-অবিচল থাকার তাওফীক দান করো।"

​প্রায়ই তাহাজ্জুদের পর, ফরজ নামাজের পর ছোট বাচ্চাদের মতো কেঁদে কেঁদে ওলামায়ে কেরামের মুক্তির জন্য দোয়া করতেন। এত বেশি কাঁদতেন যে, কান্নার দরুন হযরতের বুকে-পিঠে ব্যথা শুরু হতো। একদিন হঠাৎ হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। আমি তখন কাছেই ছিলাম। বিভিন্ন কিছু বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হযরতের কান্না আরও বেড়ে গেল। আমি বললাম, "হযরত! এভাবে কান্নাকাটি করলে আপনার সমস্যা হবে, বুকের ব্যথা বেড়ে যাবে। সবর করুন, আলেম-ওলামাদের জন্য দোয়া করুন।" তখন হযরত বললেন, "যদি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হতো যে আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হবে এবং এর বিনিময়ে গ্রেপ্তারকৃত সকল আলেমদের মুক্তি দেওয়া হবে, তাহলে আমি নিজের জীবনকে আলেমদের মুক্তির জন্য কুরবান করে দিতাম।"

​একদিন ঘুম থেকে উঠে হযরতের ভাগ্নে আল্লামা আনোয়ার শাহ (দা.বা.) এবং আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন— "আজ আমার নানা আল্লামা হারুন বাবুনগরী (রহ.) এবং আমার আম্মাজানকে স্বপ্নে দেখেছি। আমি মনে হয় বেশিদিন বাঁচব না।" ইন্তেকালের আগে প্রায়ই বলতেন, "আমার মন চায় জেলখানায় গিয়ে কয়েদি আলেমদের দেখে আসি। কারাগারে থাকা আলেমদের সাথে কি আর সাক্ষাৎ হবে? আমি তো এতদিন বাঁচব না।"

​ইন্তেকালের আগে তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াতসহ অন্যান্য আমল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শারীরিক দুর্বলতা তখন অনেক বেশি, এরপরও প্রায় নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন। রাত্রিবেলায় কম ঘুমাতেন। ফজরের নামাজ মসজিদে পড়তেন। নামাজের পর হুইলচেয়ারে করে জামিয়ার কবরস্থানে যেতেন। বর্তমানে যেই জায়গায় শায়িত আছেন, ঠিক সেই জায়গায় বসে দীর্ঘ সময় দোয়া-দরূদ পড়ে আল্লামা আহমদ শফী (রহ.)-সহ অন্যদের কবর জিয়ারত করতেন।

​বাদ ফজর কুরআন তিলাওয়াত করতেন। শারীরিক দুর্বলতার কারণে তখন হাতে ভারী কিছু ধরার শক্তি পেতেন না। কুরআন শরীফটা নিজ হাতে ধরে পড়তেও কষ্ট হতো। চোখের জ্যোতিও তখন অনেকটা কমে গিয়েছিল। হাতে ধরার শক্তি নেই, চোখের জ্যোতি কম—এরপরও হযরত কুরআন তিলাওয়াত ছাড়েননি। কখনো আমি কুরআন শরীফ খুলে ধরে রাখতাম আর হযরত এক এক করে আয়াত পড়তেন। কোনো আয়াত ছুটে গেলে আমি পড়ে দিতাম।

​কুরআন তিলাওয়াত, কিতাব মোতালাআ ইত্যাদির সুবিধার জন্য ইন্তেকালের মাত্র নয় দিন আগে ১০ আগস্ট ডান চোখের অপারেশন করিয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিল, অপারেশনের ফলে চোখে ভালো দেখবেন, বুখারী শরীফসহ অন্যান্য কিতাবের দরস দেবেন। কিন্তু সেই ইচ্ছে আর পূরণ হলো না, এর আগেই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিলেন...

​ফজরের পর তিলাওয়াত শেষে কুরআন শরীফটা হাতে নিয়ে চুমু খেতেন, নাকে-মুখে লাগাতেন, বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতেন আর এই কবিতাটি পড়তেন—

​وَفينا رَسولُ اللَهِ يَتلو كِتابَهُ

إِذا اِنشَقَّ مَعروفٌ مِنَ الصُبحِ ساطِعُ

​ইন্তেকালের আগে মাদরাসা খোলার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যখনই কথা বলতেন, মাদরাসা খোলার বিষয়টি জোর দিয়ে বলতেন।

​বাদ ফজর রুমের বারান্দায় বসে শিক্ষা ভবনের দিকে তাকিয়ে বলতেন— "মাদরাসা কখন খোলা হবে? ছাত্ররা কবে আসবে? হাদীসের দরস দিতে পারব তো! আহ, ছাত্ররা যদি চলে আসত! হাদীসের দরসে বসলে আমার শারীরিক অসুস্থতা ভালো হয়ে যেত। ছাত্রদের দেখলে আমার মনে খুশি লাগে, ছাত্রদের সাথে কথা বললে মনটা হালকা লাগে।"

​আজ মাদরাসা খোলা হয়েছে, ছাত্ররা সবাই এসেছে, হাদীসের দরসও চলছে; কিন্তু হযরত বাবুনগরী (রহ.) আমাদের মাঝে নেই।

যেভাবে হযরত রহিমাহুল্লাহুর ইন্তেকাল

​১৮ আগস্ট ২০২১ ইং, বুধবার। অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই হযরতের দিন শুরু হয়েছিল। ফজরের নামাজের পর তাসবিহ-তাহলিল শেষ করে ইশরাকের নামাজ পড়লেন। নাস্তার পর কিছু সময় বিশ্রাম করলেন। বেলা ১১টার দিকে চক্ষু চেক-আপের জন্য শেভরন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। খাদেম ছাড়াও সাথে ছিলেন জামাতা মাও. আবদুল্লাহ সাহেব।

​হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় শারীরিক অবস্থা ছিল স্বাভাবিক। গাড়িতে ওঠার আগে দারুল উলুম হাটহাজারীর বর্তমান সহকারী পরিচালক আল্লামা মুফতী জসিমউদদীন (দা.বা.) মাদরাসার মাঠে হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন— "আপনার চোখের অপারেশনের খবর পেয়েছি। আপনাকে দেখার জন্য বেশ কয়েকবার রুমে গিয়েছিলাম।" হযরত বললেন— "হ্যাঁ! ডান চোখের অপারেশন হয়েছে। এখন অবস্থা ভালো, আলহামদুলিল্লাহ। আজ একটু চেক-আপের জন্য যাচ্ছি।" মুফতী সাহেব বললেন, "আজ বাদ আসর নাজিরহাট মাদরাসায় মহিউদ্দিনের মেয়ের আকদে নিকাহ।" হযরত বললেন— "হ্যাঁ, আমিও যাব ইনশাআল্লাহ। মহিউদ্দিন আমাকে আকদ পড়ানোর কথা বলেছে।"

​চেক-আপ শেষে আশকারদিঘীর পাড় এক মাদরাসায় দুপুরের খাবারের জন্য গেলেন। দু-এক লোকমা খাওয়ার পর বমি করলেন। সেখান থেকে হযরতকে মাদরাসায় নিয়ে আসা হলো। হযরত তখন গাড়ির সামনের সিটে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। ঘুম দেখে বোঝা যাচ্ছিল হযরতের শরীর বেশ দুর্বল। গাড়ি থেকে নামানোর আগে আমরা বললাম— "আসরের পর নাজিরহাটে একটি বিয়ে পড়ানোর কথা রয়েছে। কিন্তু আপনার শরীর তো দুর্বল, নাজিরহাট না গেলে ভালো হয়।" হযরত বললেন, "মহিউদ্দিনকে কথা দিয়েছি আকদ আমি পড়াব। আমাকে নাজিরহাট নিয়ে যাও। নাজিরহাট থেকে একটু বাড়িতেও (বাবুনগর) যাব। আমার ব্যাগটা সাথে নিয়ে নাও।" ইন্তেকালের আগের দিন বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে করেছিলেন, কিন্তু যেতে পারলেন না।

​কারো সাথে ওয়াদা দিলে হযরত (রহ.) শত কষ্ট স্বীকার করে হলেও ওয়াদা রক্ষা করতেন। এটা ছিল হযরতের একটি মহৎ গুণ। কথা দিয়েছেন বিয়ে পড়াবেন, তাই কথা রক্ষা করতে হবে। নাজিরহাট গেলেন, কোনো রকম আকদ পড়ালেন। আকদের পর হালকা নাস্তা করলেন। সেখানে হযরতের ছোট ভাই মাও. জুবায়ের বাবুনগরী সাহেবও ছিলেন। তাঁদের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বললেন।

​মাগরিবের কিছুক্ষণ পর হাটহাজারী পৌঁছালেন। গাড়ি থেকে নামানোর সময় পায়ের উপর একেবারেই ভর করতে পারছিলেন না। চার-পাঁচ জনে ধরাধরি করে গাড়ি থেকে নামিয়ে হুইলচেয়ারে করে শোয়ার রুমে বিছানার কাছে নিয়ে গেলাম। শরীর তখন এতটাই দুর্বল ছিল যে, হুইলচেয়ার থেকে খাটে বসাতে পারছিলাম না। কয়েকজন মিলে অনেক কষ্ট করে খাটে বসালাম। আমি নিজ হাতে হযরতের জুব্বা, টুপি, আংটি এবং ঘড়ি খুলে দিলাম। হযরত বললেন, "আমাকে শুইয়ে দাও।" দ্রুত শুইয়ে দেওয়া হলো। শুইয়ে দেওয়ার পর হযরত ডান কাত হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে নিমজ্জিত হয়ে গেলেন। ঘুমন্ত বা জাগ্রত—সব সময়ই আমাদের খাদেমদের মধ্য থেকে ২/৩ জন হযরতের পাশে থাকত। এটা আমাদের নিয়ম ছিল।

​শরীর খারাপ থাকলে মাঝে মাঝে মাগরিবের পর শুয়ে যেতেন। আবার জাগ্রত হয়ে ইশার নামাজ পড়ে খাবারদাবার খেতেন। তবে সেদিন মাগরিবের পর শোয়াটা যে হযরতের জীবনের শেষ শোয়া ছিল, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে সারা রাত হযরতকে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখতাম; নাকে-মুখে, কপালে চুমু খেতাম। এই সোনার মানুষটা হঠাৎ এভাবে চলে যাবেন, তা সেদিন ভাবতেও পারিনি।

​হযরতকে শুইয়ে দিয়ে তিনটি রুটি বানিয়ে রাখা হলো। হযরত রাতে যখনই উঠবেন, অল্প হলেও কিছু খাওয়াতে হবে। মহিষের পায়া খেতে হযরত বেশ পছন্দ করতেন। ইন্তেকালের আগের রাতে আমার এক পরিচিতজন থেকে মহিষের পায়া আনিয়ে রেখেছিলাম। রুটি এবং মহিষের পায়া—হযরত রাতে ঘুম থেকে উঠে খাবেন; কিন্তু নাহ! হযরত ঘুম থেকে আর উঠলেন না। খাবারগুলো আপন জায়গায় রয়ে গেল।

​ইন্তেকালের দিন ১৯ আগস্ট, বৃহস্পতিবার। প্রায় প্রতিদিনই ফজরের নামাজ আমি পড়াতাম। বিশেষ করে বন্ধুবর এনামুল হাসান ফারুকী গ্রেপ্তার হওয়ার পর তো আমিই নিয়মিত পড়াতাম। সেদিনও ফজরের নামাজ পড়ানোর জন্য হযরতের রুমের দরজায় আওয়াজ দিলাম, কিন্তু ভিতর থেকে কেউ দরজা খুলল না। সেদিন রাতে হযরতের রুমে জিয়া, নাঈম ও হোসাইন—তিনজন খাদেম ছিল। তারা হুজুরের রুমেই শুত। নক করার পরও দরজা না খোলায় ভাবলাম হযরতের শরীর দুর্বল, তাই হয়তো রুমের ভিতর থাকা খাদেমদের নিয়ে ফজর পড়ে হযরত আবার বিশ্রাম করছেন।

​ফজরের পর সূরা ইয়াসীন পড়ে মাদরাসার মাঠে কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম। রুমে গিয়ে আবারও হযরতের দরজায় আওয়াজ করলাম। কিন্তু রুমের ভিতর থেকে কারও কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। সবাই তখন ঘুমে।

​মাগরিবের পর শুইলেন, সারা রাত উঠলেন না, খাবারও খেলেন না। আমার মনে সন্দেহ জাগল। তাই আবারও দ্রুতগতিতে হযরতের রুমে গেলাম। তখন সকাল আনুমানিক সাড়ে নয়টা বা দশটা বাজে। দরজা খোলা পেয়ে রুমে ঢুকে দেখলাম লাইট অফ। রুমের মেঝেতে খাদেম দুজন (জিয়া, হোসাইন) ঘুমাচ্ছে। মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে হযরতের মাথার পাশে গেলাম। দেখলাম হযরত ডান কাত হয়ে শুয়ে আছেন এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কনিষ্ঠ আঙুলের সাথে লাগানো। অর্থাৎ ডান হাতের আঙুল তাসবীহ পাঠ অবস্থায় পেলাম। গায়ের কাঁথাটা সরিয়ে আমি প্রথমে হযরতের দুই পায়ে হাত দিলাম, বেশ ঠান্ডা অনুভব হলো। হাতের আঙুলের মাথায় ধরলাম, তাও ঠান্ডা। শ্বাস-নিঃশ্বাস নিচ্ছেন কিনা সেটা বোঝার জন্য নাকের কাছে আমার হাতের আঙুলটা ধরলাম। তখন আমার বুকটা ধুকধুক করছিল, গলা শুকিয়ে আসছিল।

সর্বশেষ হার্টবিট আছে কিনা সেটা বোঝার জন্য বুকের উপর হাতটা চেপে ধরলাম। হাতটা কিছুক্ষণ রাখার পর আমার আর বুঝতে বাকি রইল না...। মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ল, চোখ দুটো অন্ধকার হয়ে গেল। একটা চিৎকার দিয়ে অন্য খাদেমদের ডাকলাম। আমি তখন অঝোরে কাঁদছি। অন্য খাদেমরা রুমে এসে হযরতের নিথর দেহটা দেখে কান্না শুরু করল। নিজেকে একটু নিয়ন্ত্রণ করে ওদেরকে বললাম, "ওষুধের ফাইলপত্র দ্রুত রেডি করো, হযরতকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।" আলিফ হাসপাতালের ইলিয়াস ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম, "পাঁচ মিনিটের মধ্যে মাদরাসায় অ্যাম্বুলেন্স পাঠান, হযরতের অবস্থা গুরুতর।" এর মধ্যে হযরতের জামাতা মাও. আবদুল্লাহ সাহেব এবং ভাগ্নে মাও. আনোয়ার শাহ সাহেবকে ফোন করে দ্রুত হযরতের রুমে আসতে বললাম।

মাও. মীর ইদরিস সাহেব, মাও. মুনির আহমদ, মাও. শফীউল আলম (শফী বদ্দা), মাও. কামরুল কাছেমী ভাইসহ পরিচিত যারা মাদরাসায় ছিলেন, তাদেরকে ফোন করে হযরতের রুমে ডেকে আনলাম। এর মধ্যে খবর পেয়ে মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.) এবং মুফতী জসিমউদদীন (দা.বা.) এসে হযরতকে দেখে গেলেন, দোয়া করলেন।

​আলিফ হাসপাতাল থেকে আমাকে জানাল, তাদের অ্যাম্বুলেন্স খালি নেই, পাঠাতে পারবে না। মাও. মুনির আহমদ সাহেব হাটহাজারী ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সের জন্য যোগাযোগ করলেন, সেটাও ব্যবস্থা হলো না। শফী বদ্দা একাধিক জায়গায় ফোন করে একটি অ্যাম্বুলেন্স আনালেন। মাও. আবদুল্লাহ সাহেবসহ আমরা দ্রুত হযরতকে নিয়ে সিএসসিআরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গাড়িতে আমি সূরা ইয়াসীনসহ বিভিন্ন দোয়া-দরূদ পড়ছিলাম এবং আমার জানের বদলে হযরতের হায়াতের জন্য দোয়া করছিলাম। বারবার হযরতের চেহারার দিকে তাকাচ্ছিলাম আর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল।

​সিএসসিআর পৌঁছালাম। হযরতের ছোট ভাই মাও. জোবায়ের সাহেবসহ অনেক পরিচিত জন তখন হাসপাতালে অপেক্ষমাণ ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হযরতকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলাম। কর্তব্যরত ডাক্তার ইসিজিসহ কয়েকটা পরীক্ষা করে বললেন, "রোগীর গার্ডিয়ান কাছে আসুন, বাকি সবাই বাইরে যান।" এ কথা শোনার পর আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, গার্ডিয়ান ডেকে নিয়ে ডাক্তার কি বলবে! আমি হাউমাউ করে কান্না শুরু করলাম।

​ডাক্তারকে বললাম, "আপনার রিপোর্ট পরে দেখব, হযরতকে আমরা আইসিইউতে নিয়ে যাব।" ডাক্তার বললেন, "ঠিক আছে, আপনারা চাইলে নিতে পারেন।" আইসিইউতে নিয়ে গেলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হযরতের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ইব্রাহিম চৌধুরী স্যার এলেন। হযরতের চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন— "আহ! বাবুনগরী সাহেব তো আর নেই! ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করে নিয়ে যান।"

​এভাবেই আমাদেরকে এতিম বানিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন মুসলিম উম্মাহর অতন্দ্র প্রহরী আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহ। আল্লাহ তাআলা হযরতকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন, আমীন।

লেখক: খাদেম, আল্লামা বাবুনগরী (রহ.); পরিচালক, মারকাযুল কুরআন আল ইসলামি, পূর্বধলা, নেত্রকোনা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন