Logo

ধর্ম

নেপাল থেকে বাংলাদেশ

কুদরাতের বার্তা ও আমাদের শিক্ষা

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৫৬

কুদরাতের বার্তা ও আমাদের শিক্ষা

প্রকৃতির সামনে মানুষ বারবার নিজের সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে যায়। আমরা বহুতল ভবন গড়ে তুলি, পাহাড় কেটে রাস্তা বানাই, নদীর গতিপথ বদলাই, প্রযুক্তির বিস্ময়ে মুগ্ধ হই। তখন মনে হয়, সবকিছুই যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু হঠাৎ একটি দুর্যোগ এসে সেই আত্মবিশ্বাসকে মুহূর্তেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

সম্প্রতি নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সংবাদ পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে নাড়া দিয়েছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল নেমে এসেছে জনপদের ওপর। কোথাও ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, কোথাও সড়ক ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আরও অনেকে নিখোঁজ। উদ্ধারকারীরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। নিহতদের মধ্যে শুধু নেপালের মানুষই নন, বিভিন্ন দেশের পর্যটকও রয়েছেন। একটি দুর্যোগ মুহূর্তেই বুঝিয়ে দিয়েছে—প্রকৃতির কাছে মানুষের জাতীয়তা, পরিচয় কিংবা সম্পদের কোনো আলাদা মূল্য নেই।

নেপালের জন্য এমন ঘটনা নতুন নয়। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি আজও দেশটির মানুষের মনে তাজা। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই একের পর এক বিমান দুর্ঘটনা, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদের নতুন করে শোকের মুখোমুখি করেছে। প্রকৃতি যেন বারবার একই প্রশ্ন করছে—মানুষ কি সত্যিই নিজেকে এতটা শক্তিশালী ভাবতে পারে?

নেপালের এই খবর পড়তে পড়তে আমার বারবার বাংলাদেশের কথাই মনে হয়েছে। okoohghআমাদের দেশও যেন একের পর এক প্রাকৃতিক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলছে। বর্ষা এলে কোথাও নদী ভাঙে, কোথাও বন্যা হয়। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।

রাজধানী ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহে মানুষ অতিষ্ঠ হয়, আবার কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ খরায় কৃষকের জমি ফেটে যায়। উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে মানুষের লড়াই যেন বছরের নিয়মিত অধ্যায়। এর পাশাপাশি ভূমিকম্পের ঝুঁকির কথাও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।

অর্থাৎ, নেপাল আর বাংলাদেশ—ভূগোল আলাদা হলেও উদ্বেগের ভাষা প্রায় একই। এমন সময়ে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—একজন মুসলমান এসব ঘটনাকে কীভাবে দেখবে?

কেউ বলেন, এগুলো কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। আবার কেউ কোনো দুর্যোগ ঘটলেই সেটিকে আল্লাহর গজব বলে ঘোষণা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইসলামের শিক্ষা এ দুই চরম অবস্থানের কোনোটিকেই সমর্থন করে না।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।" (সূরা আর-রূম, ৩০:৪১)

এই আয়াত আমাদের অন্যের দিকে আঙুল তুলতে শেখায় না; নিজের দিকে তাকাতে শেখায়। দুর্যোগ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে সে সর্বশক্তিমান নয়, বরং একজন জবাবদিহিমূলক বান্দা।

হয়তো এ কারণেই বড় কোনো বিপর্যয়ের পর মানুষের ভেতরে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। তখন সে নতুন করে ভাবতে শুরু করে—আমি কী করছি? 

আমার সমাজ কোথায় যাচ্ছে? 

আমরা কি প্রকৃতির সঙ্গে, একে অপরের সঙ্গে এবং আমাদের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের জায়গাগুলো ঠিক রাখছি?

এই আত্মজিজ্ঞাসাই দুর্যোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

নেপালের পাহাড়ে ঘটে যাওয়া বিপর্যয় তাই কেবল একটি দেশের সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। অন্যের শোক দেখে ক্ষণিকের আবেগে ভেসে যাওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিজেদের ঘর, শহর, নদী, পরিবেশ এবং দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবা। কারণ দুর্যোগের আগমনের সময় আমরা ঠিক করতে পারি না, কিন্তু দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতেই থাকে।

দুর্যোগের পর আমাদের সমাজে প্রায়ই দুটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ খুব দ্রুত বলে বসেন, “এটি আল্লাহর গজব।” আবার কেউ এমনভাবে কথা বলেন, যেন এসব ঘটনার সঙ্গে আল্লাহর কোনো সম্পর্কই নেই; সবই কেবল প্রকৃতির নিয়ম। এই দুই চরম অবস্থানের কোনোটিই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নয়।

আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনার মালিক। তাঁর ইচ্ছার বাইরে একটি পাতাও নড়ে না। কিন্তু তাই বলে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা, ভূমিকম্প কিংবা ঝড়কে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বলে ঘোষণা করার অধিকার মানুষের নেই। অতীতের যেসব জাতির ওপর আল্লাহর বিশেষ শাস্তি নেমে এসেছিল, সে সম্পর্কে ওহির মাধ্যমে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল। নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর পর সেই ওহির ধারা সমাপ্ত হয়েছে। ফলে আজ কোনো দুর্যোগ সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।

তবে এটাও সত্য, কুরআন মানুষকে প্রতিটি বিপর্যয়ের ভেতরে শিক্ষা খুঁজতে বলেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।” (সূরা আর-রূম, ৩০:৪১)

এই আয়াতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অন্যকে দোষী খোঁজার আগে নিজের দিকে তাকানো। দুর্যোগ মানুষকে থামিয়ে দেয়। অহংকার ভেঙে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, আমরা যতই শক্তিশালী ভাবি না কেন, একটি প্রবল স্রোত, একটি ভূমিকম্প কিংবা একটি ঘূর্ণিঝড় মুহূর্তের মধ্যে আমাদের অসহায় করে দিতে পারে।

বাংলাদেশের দিকে তাকালেই এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকার বহু এলাকা পানির নিচে চলে যায়। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতি বর্ষার রাতে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। উত্তরাঞ্চলে কখনো খরা, কখনো বন্যা কৃষকের বছরের পরিশ্রম কেড়ে নেয়। উপকূলের মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন।

এসবের সব দায় প্রকৃতির নয়, আবার সব দায় মানুষেরও নয়। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই—আমাদের অনেক সিদ্ধান্ত দুর্যোগের ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। খাল ভরাট করে আমরা ভবন গড়ি, পরে জলাবদ্ধতার জন্য আকাশকে দোষ দিই। নদী দখল করি, তারপর বন্যার কাছে অসহায় হয়ে পড়ি। পাহাড় কেটে বসতি বানাই, পরে ভূমিধসের জন্য শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করি। প্রকৃতিরও নিজস্ব একটি ভারসাম্য আছে; সেই ভারসাম্য নষ্ট করলে তার প্রতিক্রিয়াও একদিন ফিরে আসে।

ইসলাম কখনো নিষ্ক্রিয়তার শিক্ষা দেয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করতেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও গ্রহণ করতেন। এক ব্যক্তি উট ছেড়ে রেখে বললেন, তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, “আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” এই সংক্ষিপ্ত শিক্ষার মধ্যেই জীবনের বড় একটি নীতি লুকিয়ে আছে। দোয়া থাকবে, তাওয়াক্কুল থাকবে, পাশাপাশি থাকবে দায়িত্ব, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি।

কৃষিপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে প্রকৃতির এই প্রভাব আমি খুব কাছ থেকে দেখি। উত্তরার পাইকারি বাজারে কতকিছুর হাট পরিচালনা করতে গিয়ে বুঝতে পারি, একটি জেলার অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যা কীভাবে ঢাকার বাজারকে প্রভাবিত করে। কোথাও ফসল নষ্ট হলে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; এর প্রভাব ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন উপলব্ধি করি, বাজারের প্রতিটি দামের পেছনে শুধু অর্থনীতির হিসাব থাকে না; প্রকৃতিরও একটি নীরব হিসাব থাকে।

এই বাস্তবতা আমাকে আরেকটি কথাও শিখিয়েছে। দুর্যোগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি অনেক সময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। আমরা নিহত মানুষের সংখ্যা জানি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও জানতে পারি। কিন্তু যে কৃষক বীজ হারিয়েছেন, যে জেলে নৌকা হারিয়েছেন, যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মূলধন হারিয়ে নতুন করে শুরু করার সাহস খুঁজছেন—তাঁদের অদৃশ্য কষ্টের হিসাব কোনো প্রতিবেদনে পুরোপুরি লেখা থাকে না।

হয়তো এ কারণেই ইসলাম বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। কারণ দুর্যোগের সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করে আরেকজন মানুষের হাত, একটি সহানুভূতির বাক্য এবং বিশ্বাস করার মতো একটি মুখ।

দুর্যোগের আরেকটি দিক আছে, যা আমরা অনেক সময় খেয়ালই করি না। এটি শুধু প্রকৃতির শক্তির পরীক্ষা নয়; মানুষের চরিত্রেরও পরীক্ষা। বিপদের মুহূর্তে কার হৃদয়ে কতটুকু মানবিকতা, কতটুকু সততা আর কতটুকু দায়িত্ববোধ আছে, সেটিই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক বন্যাগুলোর সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু দৃশ্য দেখা গেছে, যা বন্যার পানির চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছে। কোথাও ভেসে আসা মানুষের আসবাবপত্র, কৃষিপণ্য কিংবা গৃহস্থালির জিনিসপত্র কুড়িয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ আবার সেগুলোকে ‘পাওয়া মাল’ মনে করে নিজের ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। যে মানুষটি কয়েক ঘণ্টা আগেও নিজের ঘরে ছিলেন, যার জীবনের সঞ্চয়, স্মৃতি আর পরিশ্রম এক নিমিষে পানিতে ভেসে গেছে, তার শেষ সম্বল নিয়ে আনন্দ করা কোনো সুস্থ বিবেকের কাজ হতে পারে না।

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—“কারও আগুন মাস, আবার কারও সর্বনাশ।” এই প্রবাদ শুধু ভাষার সৌন্দর্য নয়, মানুষের স্বভাবেরও একটি নির্মম সত্য তুলে ধরে। যুগে যুগে এমন মানুষ ছিল, এখনও আছে, যারা অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ানোর বদলে নিজের লাভের সুযোগ খোঁজে। কোথাও আগুন লাগলে তারা আগুন নেভাতে এগিয়ে যায় না; সেই আগুনে আলু পোড়ানোর হিসাব করে। কোথাও বাজারে সংকট তৈরি হলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য মজুত করে। কোথাও দুর্যোগ এলে মানুষের অসহায়ত্বকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ হিসেবে দেখে।

ইসলাম এই মানসিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৫)

এই হাদিস শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার শিক্ষা নয়; এটি একটি মানবিক সমাজ গঠনের ভিত্তি। দুর্যোগের সময় এর প্রকৃত অর্থ সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায়। তখন বোঝা যায়, কে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আর কে মানুষের অসহায়ত্বকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে।

কৃষিপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে উত্তরার পাইকারি বাজারে কতকিছুর হাট পরিচালনা করতে গিয়ে আমি মানুষের এই দুই রূপই দেখেছি। সংকটের সময় কেউ ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করে মানুষের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করেন। আবার কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফার পথ খোঁজেন। তখন মনে হয়, ব্যবসার আসল পরিচয় মূলধনে নয়; মানুষের চরিত্রে। লাভ-লোকসানের খাতার বাইরে একজন ব্যবসায়ীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের আস্থা।

নেপালের পাহাড়, বাংলাদেশের নদী, উপকূল কিংবা নগর—প্রকৃতি কোনো দেশের মানচিত্র দেখে আঘাত হানে না। কিন্তু মানুষ তার প্রতিক্রিয়ায় নিজের পরিচয় প্রকাশ করে। কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অপরিচিত মানুষকে উদ্ধার করে। কেউ নিজের খাবারের অংশ অন্যের হাতে তুলে দেয়। আবার কেউ অন্যের কান্নার মধ্যেও নিজের লাভের অঙ্ক কষে।

আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এই অনিশ্চিত সময়ে আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী বাঁধ, কার্যকর পূর্বাভাস ব্যবস্থা, ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় অপরিহার্য—জাগ্রত বিবেক। কারণ ভাঙা সেতু আবার নির্মাণ করা যায়, ডুবে যাওয়া ঘর আবার গড়ে তোলা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাও একদিন মেরামত হয়। কিন্তু মানুষের ভেতরের সততা, আমানতদারিতা ও সহমর্মিতা ভেঙে গেলে সেই ক্ষতি পূরণ করতে অনেক বেশি সময় লাগে।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় হোক কিংবা বাংলাদেশের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, খরা বা জলাবদ্ধতা—প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রেখে যায়: আমরা কি শুধু দুর্যোগের সংবাদ পড়ছি, নাকি সেই দুর্যোগের আলোয় নিজেদেরও বিচার করছি?

যদি এই আত্মজিজ্ঞাসা আমাদের আরও দায়িত্বশীল করে, পরিবেশের প্রতি আরও সচেতন করে, মানুষের দুঃখে আরও সংবেদনশীল করে এবং আল্লাহর প্রতি আরও বিনয়ী করে তোলে, তবেই দুর্যোগের ভেতর থেকেও আমরা একটি মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করতে পারব।

প্রকৃতির ক্ষত একদিন শুকিয়ে যায়। নদী আবার স্বাভাবিক গতিতে বয়, মাঠে আবার সবুজ ধান দোলে, ভেঙে যাওয়া ঘরও আবার দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যদি লোভ, উদাসীনতা ও নিষ্ঠুরতা বাসা বাঁধে, সেই ক্ষত সহজে সারে না।

নেপাল থেকে বাংলাদেশ—দূরত্ব অনেক, কিন্তু শিক্ষা একটাই। দুর্যোগ আমাদের ভয় দেখাতে আসে না; দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে আসে। তাই বিপদের সময় আমরা যেন আতঙ্ক নয়, আশা ছড়িয়ে দিই; লুটপাট নয়, সহযোগিতার হাত বাড়াই; স্বার্থ নয়, মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিই। এটাই ইসলামের শিক্ষা, এটাই একটি সভ্য সমাজের পরিচয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন ঈমান, প্রজ্ঞা ও মানবিকতা দান করুন, যাতে প্রতিটি দুর্যোগ আমাদের আরও বিনয়ী, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও সহমর্মী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আমীন।

লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; ফাউন্ডার, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন