Logo

ধর্ম

ডিজিটাল দাসত্ব ও ইসলামের নির্দেশনা

(প্রথম পর্ব)

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৩৪

ডিজিটাল দাসত্ব ও ইসলামের নির্দেশনা

একসময় আমাদের পরিবারের সন্ধ্যাগুলো ছিল ভিন্ন রকম। মাগরিবের নামাজ শেষে ঘরে বসে গল্প হতো, বাবা-মায়ের সঙ্গে দিনের কথা ভাগাভাগি করা হতো, শিশুদের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া হতো, আর প্রবীণদের অভিজ্ঞতা শুনে বড় হতো নতুন প্রজন্ম।

এখন সেই দৃশ্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একই ঘরে বসে থাকা পরিবারের সদস্যরা যেন চারটি আলাদা পৃথিবীতে বাস করছেন। কারও হাতে স্মার্টফোন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, কেউ ছোট ছোট ভিডিও দেখছেন, আবার কেউ অনলাইনের অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন। ঘরে মানুষ আছে, কিন্তু কথোপকথন নেই; চোখ আছে, কিন্তু একে অপরের দিকে নয়—স্ক্রিনের দিকে।

প্রযুক্তির এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কয়েক সেকেন্ডে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খবর পৌঁছে যায়। কৃষক বাজারদর জানতে পারেন, শিক্ষার্থী অনলাইনে পাঠ গ্রহণ করেন, উদ্যোক্তা ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করেন, চিকিৎসা ও জরুরি সেবাও এখন অনেকাংশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর। অর্থাৎ প্রযুক্তি মানবজীবনের এক অপরিহার্য সহায়ক শক্তি।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রযুক্তি আমাদের প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম না হয়ে আমাদের সময়, মনোযোগ ও চিন্তার নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়। আমরা মোবাইল ব্যবহার করতে গিয়ে কখন যে মোবাইলেরই ব্যবহার্য বস্তু হয়ে উঠি, তা অনেক সময় টেরও পাই না। পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নেওয়া মানুষটি কখন এক ঘণ্টা অকারণে স্ক্রিনে কাটিয়ে দেন, তিনি নিজেও বুঝতে পারেন না। এই নীরব নিয়ন্ত্রণই আজকের সময়ের অন্যতম বড় সংকট।

বাংলাদেশে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তরুণ সমাজের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বই খুলে পড়তে বসে একটি নোটিফিকেশন দেখতে গিয়ে আধা ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেন। একজন চাকরিজীবী জরুরি একটি ই-মেইল পাঠাতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখতে শুরু করেন। পরিবারের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসেও অনেকে কথোপকথনের চেয়ে মোবাইল স্ক্রিনে বেশি মনোযোগ দেন। এমনকি অনেক সময় দেখা যায়, আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মানুষ নামাজে যাওয়ার আগে আরেকটি ভিডিও শেষ করতে ব্যস্ত।

এটি শুধু সময় নষ্টের বিষয় নয়; ধীরে ধীরে এটি মানুষের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, কর্মক্ষমতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং আত্মিক জীবনকে প্রভাবিত করে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মন দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। অবিরাম নোটিফিকেশন, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও এবং তাৎক্ষণিক বিনোদনের সংস্কৃতি মানুষকে ধৈর্যশীল চিন্তার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক উত্তেজনার প্রতি অভ্যস্ত করে তুলছে।

এই বাস্তবতা নিয়ে বহু গবেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন গণমাধ্যম বিশ্লেষক নিল পোস্টম্যান তাঁর Amusing Ourselves to Death গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন, ভবিষ্যতের মানুষকে হয়তো বলপ্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ করা হবে না; বরং এমন বিনোদনের মধ্যে নিমজ্জিত করা হবে, যেখানে তারা গভীর চিন্তা করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলবে। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলিং ও ক্ষণস্থায়ী ভিডিওর সংস্কৃতি তাঁর সেই পর্যবেক্ষণকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শশানা জুবফ দেখিয়েছেন, আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে মানুষের মনোযোগ ও ব্যক্তিগত তথ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি-নৈতিকতা বিষয়ক গবেষক ট্রিস্টান হ্যারিস বারবার বলেছেন, অনেক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী যত বেশি সময় সেখানে থাকেন। ফলে আমরা অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্তে নয়, অ্যালগরিদমের প্ররোচনায় একের পর এক কনটেন্ট দেখতে থাকি।

তবে সমস্যার জন্য কেবল প্রযুক্তিকে দায়ী করলে ভুল হবে। প্রযুক্তি একটি যন্ত্র; এর ভালো বা মন্দ ব্যবহার নির্ভর করে মানুষের ওপর। একটি ছুরি যেমন অস্ত্রোপচারে জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি অপরাধের অস্ত্রও হতে পারে। স্মার্টফোনও তেমনি—এটি কুরআন শেখার মাধ্যম হতে পারে, আবার অনর্থক সময় নষ্টের কারণও হতে পারে। তাই সংকট প্রযুক্তির নয়; সংকট মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং মূল্যবোধের।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়তো অর্থের নয়, সময়ের। প্রতিদিন অল্প অল্প করে হারিয়ে যাচ্ছে মনোযোগ, পড়ার অভ্যাস, পারিবারিক আলাপ, আত্মীয়তার উষ্ণতা এবং নিরিবিলি চিন্তা করার ক্ষমতা। এই ক্ষয় একদিনে চোখে পড়ে না; কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এটি ব্যক্তিজীবন, পরিবার এবং সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

তাই এখন আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—আমরা কি সত্যিই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি অজান্তেই প্রযুক্তিই আমাদের সময়, মনোযোগ ও জীবনযাপনের ধরন নিয়ন্ত্রণ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল প্রযুক্তির দিকে তাকালে চলবে না; তাকাতে হবে আমাদের নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি এবং ইসলামের জীবনদর্শনের দিকেও। কারণ প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্জিত হয়, যখন মানুষ নিজের প্রবৃত্তি, সময় এবং সিদ্ধান্তের ওপর নিজেই কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে।

(চলবে — দ্বিতীয় পর্বে: ইসলামের দৃষ্টিতে ডিজিটাল আসক্তি, সময়ের আমানত, কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা এবং উত্তরণের বাস্তব করণীয়)

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; ফাউন্ডার, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন