Logo

ধর্ম

ডিজিটাল দাসত্ব ও ইসলামের নির্দেশনা

(দ্বিতীয় পর্ব)

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৭

ডিজিটাল দাসত্ব ও ইসলামের নির্দেশনা

(প্রথম পর্বের পর..)

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অ্যালগরিদমনির্ভর ডিজিটাল পরিবেশ ধীরে ধীরে মানুষের সময়, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। প্রশ্ন উঠেছিল—আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল প্রযুক্তিবিদ্যা বা মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে মানুষের নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে। কারণ ইসলাম মানুষকে শুধু বাহ্যিক স্বাধীনতার শিক্ষা দেয় না; বরং অন্তরের স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। যে মানুষ নিজের প্রবৃত্তি, সময় ও অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। এর মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন সহজ হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা ও জনসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তাই ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধিতা করে না; বরং কল্যাণকর কাজে তার ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। কিন্তু যখন কোনো বৈধ বিষয় মানুষের ইবাদত, দায়িত্ব, পরিবার, কর্মজীবন এবং আত্মশুদ্ধির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটিই আত্মসমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আজ প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি আমাদের সামনে এমনই এক নৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, "নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।" (সূরা আল-ইসরা: ৭০)

মানুষের এই মর্যাদার অন্যতম প্রকাশ হলো তার বিবেক, বিচারবোধ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। কিন্তু যখন একজন মানুষ একটি নোটিফিকেশনের ডাক উপেক্ষা করতে পারেন না, প্রয়োজন না থাকলেও বারবার মোবাইল হাতে তুলে নেন, কিংবা বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন, তখন ধীরে ধীরে তার আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অবস্থাই এক ধরনের আধুনিক দাসত্ব—যেখানে শিকল চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অভ্যাস মানুষকে বন্দি করে রাখে।

ইসলাম সময়কে মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছে। অর্থ হারালে তা ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, "এমন দুটি নিয়ামত রয়েছে, যে দুটিতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—স্বাস্থ্য এবং অবসর সময়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)

আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় এই অবসর সময়ের। কয়েক মিনিটের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করে অনেকেই বুঝতেই পারেন না কখন এক-দুই ঘণ্টা কেটে গেছে। সেই সময়ে একটি বই পড়া যেত, নতুন একটি দক্ষতা শেখা যেত, সন্তানকে সময় দেওয়া যেত, বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসা যেত কিংবা কয়েক পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত করা যেত। কিন্তু অদৃশ্য এক টানে আমরা বারবার স্ক্রিনে ফিরে যাই।

ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) তাঁর ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন গ্রন্থে মানুষের অন্তরের রোগ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, যে বিষয় মানুষকে আল্লাহর স্মরণ, দায়িত্ব ও আত্মশুদ্ধি থেকে গাফেল করে দেয়, তা ধীরে ধীরে হৃদয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল আসক্তি সেই গাফেলতার একটি নতুন রূপ বলেই মনে হয়। অনেকের দিন শুরু হয় মোবাইলের স্ক্রিন দিয়ে, শেষও হয় স্ক্রিনেই; অথচ একজন মুমিনের দিন শুরু হওয়ার কথা আল্লাহর স্মরণে এবং শেষ হওয়ার কথা আত্মপর্যালোচনায়।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেছেন, মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত। মানুষ যখন নিজের প্রবৃত্তি বা অন্য কোনো কিছুর অন্ধ অনুসারী হয়ে যায়, তখন সে প্রকৃত স্বাধীন থাকে না। আজকের বাস্তবতায় এই কথাটি নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়। যদি একটি অ্যাপ আমাদের সময়ের মালিক হয়ে যায়, যদি একটি নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে, তবে সেটি কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি আত্মনিয়ন্ত্রণেরও সংকট।

তবে এই সংকটের সমাধান প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে নয়; বরং প্রযুক্তিকে তার যথাযথ স্থানে ফিরিয়ে আনার মধ্যে। প্রযুক্তি হবে মানুষের সেবক, মানুষের প্রভু নয়। এটি হবে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম, সময় নষ্টের ফাঁদ নয়। এটি হবে যোগাযোগের সেতু, সম্পর্ক ভাঙার কারণ নয়।

এ জন্য ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সচেতন উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রথমত, প্রতিদিন কিছু সময় ডিজিটাল বিরতি (Digital Detox) নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নামাজের সময়, পারিবারিক খাবারের সময় এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকা উচিত।

দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা এবং উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিবারে 'স্ক্রিন-ফ্রি সময়' চালু করা যেতে পারে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সবাই একসঙ্গে বসে কথা বলা, বই পড়া বা সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে।

চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ডিজিটাল নৈতিকতা ও ডিজিটাল আত্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে নিজেকে রক্ষা করার শিক্ষাও সমান জরুরি।

পঞ্চমত, প্রতিদিন কিছু সময় মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনার জন্য রাখা উচিত। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আজ আমি যে সময় ব্যয় করেছি, তার কতটুকু আমার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য উপকারী ছিল?

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের সময়কে গ্রাস করা নয়; বরং মানুষকে তার আসল লক্ষ্য থেকে গাফেল করে দেওয়া। আর একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—সে জানে তার সময়, জীবন ও প্রতিটি নিয়ামত একদিন আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হবে।

তাই আজ প্রয়োজন প্রযুক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; প্রয়োজন নিজের প্রবৃত্তি ও আসক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু প্রযুক্তির দাসত্ব থাকবে না; সামাজিক যোগাযোগ থাকবে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; তথ্য থাকবে, কিন্তু তা ইবাদত, নৈতিকতা ও মানবিকতাকে গ্রাস করবে না।

প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চরিত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। তাই ডিজিটাল যুগে প্রকৃত সফলতা সেই মানুষের, যিনি স্মার্টফোনের নয়, নিজের নফসের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন; যিনি অ্যালগরিদমের নয়, বিবেকের অনুসারী হন; এবং যিনি প্রযুক্তিকে জীবনের সহায়ক বানান, জীবনের নিয়ন্ত্রক নয়।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; ফাউন্ডার, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন