সন্তানের বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের দায়িত্ব
আমীনুর রহমান নড়াইলী
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:২৬
মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের প্রভাব অনেক গভীর। বন্ধু কখনো তাকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে, আবার কখনো অজান্তেই তাকে ভুল পথে ঠেলে দিতে পারে। তাই সন্তানের পড়াশোনা, খাবার, পোশাক কিংবা দৈনন্দিন রুটিনের দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি সে কার সঙ্গে মিশছে, কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে-এ বিষয়েও অভিভাবকের সচেতন থাকা জরুরি।
শৈশব ও কৈশোর এমন একটি সময়, যখন সন্তান তার চারপাশের মানুষদের দেখে অনেক কিছু শেখে। সে শুধু বাবা-মায়ের কথা শুনে বড় হয় না; বন্ধুদের আচরণ, ভাষা, অভ্যাস, চিন্তা ও জীবনযাপনও তার ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব ফেলে। এ কারণেই সন্তানের বন্ধু নির্বাচনকে ছোট কোনো বিষয় মনে করা উচিত নয়।
বন্ধু মানুষকে বদলে দিতে পারে:
মানুষ সাধারণত তার আশপাশের মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভালো বন্ধু নামাজের প্রতি যত্নশীল হতে উৎসাহিত করতে পারে, পড়াশোনায় মনোযোগী করতে পারে, মিথ্যা ও অশোভন আচরণ থেকে দূরে রাখতে পারে। বিপরীতে অসৎ সঙ্গ ধীরে ধীরে একজন ভালো সন্তানকেও অলসতা, মিথ্যাচার, অশ্লীলতা, অবাধ্যতা কিংবা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত অভ্যাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে বন্ধুত্ব শুধু স্কুল, মাদরাসা বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সন্তান এমন অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যাদের সম্পর্কে অভিভাবকের কোনো ধারণাই নেই। ফলে বন্ধু নির্বাচনের বিষয়টি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘কার সঙ্গে মিশছ?’-শুধুএ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়:
অনেক অভিভাবক সন্তানকে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করেন, ‘কার সঙ্গে মিশছ?’ কিন্তু প্রশ্ন করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানার জন্য তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
সন্তানের বন্ধুদের নাম জানা, তারা কোথায় পড়ে, তাদের পরিবার কেমন, অবসরে কী করে—এসব বিষয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যেতে পারে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের মতো করে নয়। সন্তান যেন মনে না করে, বাবা-মা তার ব্যক্তিগত জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন; বরং সে যেন অনুভব করে, তার ভালো-মন্দ নিয়ে বাবা-মা আন্তরিকভাবে ভাবেন।
সন্তানকে ভালো-মন্দ বন্ধু চেনাতে হবে:
শুধু ‘ওর সঙ্গে মিশবে না’ বললে সন্তান সব সময় তা মানবে না। বরং তাকে বোঝাতে হবে-কেমন বন্ধু তার জন্য উপকারী এবং কেমন সঙ্গ তাকে ক্ষতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
যে বন্ধু বিপদে পাশে থাকে, ভালো কাজে উৎসাহ দেয়, পড়াশোনায় সহযোগিতা করে, গোপন ভুল কাজে প্ররোচিত করে না, বাবা-মা ও শিক্ষকদের সম্মান করে এবং অন্যের অধিকারকে মূল্য দেয়, সে বন্ধুত্বের জন্য উপযুক্ত।
অন্যদিকে যে বন্ধু মিথ্যা বলতে শেখায়, পড়াশোনা থেকে দূরে রাখে, অশোভন ভাষা ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে, নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর কাজে প্ররোচিত করে, বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিষয় গোপন করতে শেখায় কিংবা অন্যকে নিয়ে উপহাস করতে অভ্যস্ত, তার সঙ্গ সম্পর্কে সন্তানকে সতর্ক করা দরকার।
তবে কোনো শিশুকে শুধু তার একটি ভুলের কারণে ‘খারাপ ছেলে’ বা ‘খারাপ মেয়ে’ বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়। মানুষ পরিবর্তিত হতে পারে। অভিভাবকের লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানকে সঠিক সঙ্গ বেছে নিতে শেখানো, কাউকে অপমান করা নয়।
সন্তানের নিজের বিচারবোধ তৈরি করুন:
সন্তানের বন্ধু নির্বাচন নিয়ে অভিভাবকের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও কখনো কখনো বিপরীত ফল দিতে পারে। সব বন্ধু নিজে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া, প্রতিটি সম্পর্ক সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা সামান্য কারণে বন্ধুত্ব ভেঙে দিতে বাধ্য করা সন্তানের মধ্যে গোপনীয়তা তৈরি করতে পারে।
তাই ছোটবেলা থেকেই সন্তানের মধ্যে ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে বাবা-মা পাশে না থাকলেও সে বুঝতে পারে—কোন সঙ্গ তাকে এগিয়ে নেবে আর কোন সঙ্গ তাকে পিছিয়ে দেবে।
এ জন্য গল্প, বাস্তব ঘটনা, সাহাবায়ে কেরামের জীবন, নেককার মানুষের জীবনী এবং সমসাময়িক বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে ভালো সঙ্গের গুরুত্ব বোঝানো যেতে পারে। উপদেশের পাশাপাশি সন্তানকে চিন্তা করার সুযোগ দিতে হবে।
বাবা-মাকেও হতে হবে সন্তানের বন্ধু:
সন্তানের বন্ধু নিয়ে চিন্তা করার আগে অভিভাবকদের নিজেদের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের দিকে তাকানো দরকার। সন্তান যদি নিজের কথা বাবা-মাকে বলতে না পারে, নিজের আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নিতে না পারে, ভুল করলে শুধু বকা খাওয়ার আশঙ্কা করে-তাহলে সে নিজের সমস্যার সমাধান বন্ধুদের কাছেই খুঁজবে।
তাই সন্তানকে সময় দিতে হবে। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। সব কথায় সঙ্গে সঙ্গে ধমক না দিয়ে কখনো কখনো তার দৃষ্টিভঙ্গিটাও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সন্তান যেন জানে-ভুল করলে বাবা-মা তাকে শুধরে দেবেন, কিন্তু তাকে একা ফেলে দেবেন না।
ডিজিটাল বন্ধুতেও সতর্কতা জরুরি:
বর্তমানে সন্তানের ‘বন্ধু’ মানেই শুধু পাশাপাশি বসা কোনো শিশু নয়। অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে পরিচিত ব্যক্তিরাও তার চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই সন্তান কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং অনলাইনে কী ধরনের বিষয় দেখছে-এসব সম্পর্কে অভিভাবকের বয়সোপযোগী সচেতনতা থাকা দরকার। তবে গোপনে সবকিছু অনুসন্ধান করার বদলে সন্তানকে অনলাইন নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি সম্পর্কে শেখানো বেশি কার্যকর।
ভুল সঙ্গ পেলে কী করবেন:
কখনো দেখা যেতে পারে, সন্তান ইতোমধ্যে এমন কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে, যার কিছু আচরণ তার জন্য ক্ষতিকর। এ অবস্থায় হঠাৎ রাগ করে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে প্রথমে সন্তানের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলা উচিত।
কেন সে ওই বন্ধুকে পছন্দ করে, বন্ধুর কোন বিষয়গুলো তার ভালো লাগে, তা জানতে হবে। এরপর বন্ধুটির ভালো ও খারাপ দিকগুলো নিয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে শিক্ষক, উস্তাদ বা পরিবারের বিশ্বস্ত কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তান যেন মনে না করে, বন্ধুকে হারালে সে একা হয়ে যাবে। তাকে ভালো পরিবেশ, ভালো সহপাঠী এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হবে।
ভালো বন্ধু পাওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ:
শুধু খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে রাখলেই হবে না; ভালো সঙ্গ পাওয়ার সুযোগও তৈরি করতে হবে। মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, লাইব্রেরি, খেলাধুলা, কুরআন শিক্ষা, সামাজিক ও সেবামূলক কার্যক্রম, এসব সুন্দর পরিবেশে সন্তান ভালো মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।
সন্তানের সামনে বাবা-মা নিজেরাও ভালো সম্পর্কের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। কারণ সন্তান অনেক সময় উপদেশের চেয়ে আচরণ দেখে বেশি শেখে।
সন্তানের ভবিষ্যৎ শুধু তার পরীক্ষার ফলাফল কিংবা একাডেমিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; তার চরিত্র, অভ্যাস, চিন্তা ও সঙ্গও তার ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানকে ভালো স্কুল বা মাদরাসায় ভর্তি করানোর পাশাপাশি ভালো বন্ধু বেছে নেওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে।
অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নয়; বরং তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে মানুষের সঙ্গে চলতে পারে, কিন্তু ভুল সঙ্গের কাছে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে।
আজ যে সন্তান বন্ধুর কথায় প্রভাবিত হচ্ছে, আগামী দিনে সেই সন্তানই হয়তো নিজের বন্ধুদের প্রভাবিত করবে। তাই তার হাতে শুধু ভালো বই তুলে দেওয়া নয়, ভালো মানুষের সঙ্গও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি ভালো বন্ধু কখনো কখনো একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

