Logo

ধর্ম

যে ভুলগুলোতে ঝরে যায় শিক্ষার্থীর প্রতিভা

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪

যে ভুলগুলোতে ঝরে যায় শিক্ষার্থীর প্রতিভা

আমাদের প্রতিটি শিশুর ভেতর কোনো না কোনো সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। কেউ দ্রুত বুঝতে পারে, কেউ সুন্দর করে লিখতে পারে, কেউ মুখস্থ করতে পারে, কেউ বিশ্লেষণ করতে পারে, আবার কেউ হয়তো একটু ধীরগতির হলেও গভীরভাবে শেখার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এক কথা নয়। অনেক শিক্ষার্থী মেধাবী হয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারে না।

সময়ের সঙ্গে তাদের আগ্রহ কমে যায়, পড়াশোনায় মন বসে না, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। একসময় পরিবারও বলে, ছেলেটা তো ছোটবেলায় বেশ মেধাবী ছিল!

সেই মেধা কোথায় হারিয়ে গেল

সব সময় মেধার অভাবই এর কারণ নয়। বরং শিক্ষার্থীর নিজের কিছু ভুল অভ্যাস, পরিবারের কিছু ভুল প্রত্যাশা, শিক্ষাপদ্ধতির কিছু দুর্বলতা এবং পরিবেশের কিছু নেতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে তার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীর ফলাফল দেখার পাশাপাশি তার পড়ার পদ্ধতি ও জীবনযাপন পদ্ধতির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

শেখার চেষ্টা না করে শুধু পড়া:

শিক্ষার্থীদের একটি বড় ভুল হলো, তারা পড়াকে অনেক সময় শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা শেষ করার কাজ মনে করে। কত ঘণ্টা পড়েছে, কত পৃষ্ঠা পড়েছে কিংবা কতবার পড়েছে, এসবের হিসাব থাকে; কিন্তু কী বুঝেছে, কতটুকু মনে আছে এবং প্রয়োজনে নিজের ভাষায় বলতে বা লিখতে পারছে কি না, সেদিকে নজর থাকে না।

একটি বিষয় পাঁচবার পড়ার চেয়ে একবার বুঝে পড়া এবং পরে নিজেকে যাচাই করা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই পড়ার সঙ্গে বোঝা, মনে রাখা, প্রয়োগ করা এবং নিজের ভাষায় প্রকাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা:

মুখস্থ করা শিক্ষার একটি অংশ হতে পারে; কিন্তু সবকিছু মুখস্থনির্ভর হয়ে গেলে চিন্তাশক্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে দেওয়া হলে উত্তর দিতে পারে না। কারণ তারা বিষয়টি বোঝেনি; শুধু নির্দিষ্ট বাক্য মুখস্থ করেছে।

বিশেষ করে পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্নের মর্ম বোঝা, প্রয়োজনীয় তথ্য বাছাই করা এবং সময়ের মধ্যে গুছিয়ে উত্তর লেখার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কী পড়তে হবে তা জানা যথেষ্ট নয়; কীভাবে পড়তে হবে এবং পরীক্ষায় কীভাবে প্রকাশ করতে হবে,‌ তাও শিখতে হবে।

শিক্ষককে প্রশ্ন না করা:

'বুঝিনি' এই কথাটি বলতে অনেক শিক্ষার্থী সংকোচ বোধ করে। ফলে না বুঝেই সামনে এগিয়ে যায়। একটি বিষয় থেকে আরেকটি বিষয়ে যেতে যেতে তার জ্ঞানের ভিতরে ফাঁক তৈরি হতে থাকে। পরে কঠিন বিষয়গুলো আরও কঠিন মনে হয়।

শিক্ষার্থীকে শেখাতে হবে, প্রশ্ন করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং শেখার আগ্রহের লক্ষণ। শিক্ষক, উস্তাদ বা অভিভাবকের কাছে না-বোঝা বিষয় জানতে হবে। একটি ছোট প্রশ্ন অনেক সময় একটি বড় জ্ঞানের দরজা খুলে দিতে পারে।

মোবাইল ও বিনোদনে অতিরিক্ত সময় দেওয়া:

বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীর মেধা ও মনোযোগের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার। প্রয়োজনীয় কাজে প্রযুক্তি অবশ্যই উপকারী। কিন্তু অবিরাম ভিডিও, গেম, শর্টস, রিলস ও অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার মনকে দ্রুত পরিবর্তনশীল উত্তেজনায় অভ্যস্ত করে ফেলতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বইয়ের সামনে বসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।

তাই শুধু 'মোবাইল ব্যবহার করো না' বললেই হবে না; বরং সময়ের মূল্য বোঝাতে হবে এবং বিকল্প হিসেবে বই পড়া, খেলাধুলা, পরিবারকে সময় দেওয়া ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

অনিয়মিত ঘুম ও অগোছালো জীবন:

মেধা বিকাশের সঙ্গে সুস্থ জীবনযাপনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাত জেগে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় কাটানো, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, খাবারের প্রতি অমনোযোগ এবং শরীরচর্চার অভাব শিক্ষার্থীর মনোযোগ ও কর্মক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

একজন শিক্ষার্থীর জীবনে নিয়মিত ঘুম, পরিমিত খাবার, কিছুটা শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকা প্রয়োজন। অগোছালো জীবন থেকে গুছানো পড়াশোনা আশা করা কঠিন।

লিখে পর্যাপ্ত অনুশীলন না করা:

অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, বই পড়লেই পরীক্ষা ভালো হবে। কিন্তু পরীক্ষার খাতা পড়ার জায়গা নয়; সেখানে নিজের জানা বিষয় লিখে প্রকাশ করতে হয়। ফলে লিখিত অনুশীলনের বিকল্প নেই।

বিশেষ করে যারা দীর্ঘ উত্তর লিখবে, তাদের নিয়মিত লিখে সময় মেপে অনুশীলন করা দরকার। নিজের লেখা নিজে দেখে বানান, বাক্য, উপস্থাপন, অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি ও সময় ব্যবস্থাপনার ভুল চিহ্নিত করা যেতে পারে। এতে পড়া জ্ঞান পরীক্ষার উপযোগী দক্ষতায় রূপ নেয়।

নিজের ভুলকে ভয় পাওয়া:

'ভুল করলে সবাই হাসবে'–এই ভয়ও অনেক শিক্ষার্থীর বিকাশ থামিয়ে দেয়। অথচ ভুল শেখার স্বাভাবিক অংশ। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ না দিলে শিক্ষার্থী নতুন কিছু করার সাহস হারিয়ে ফেলে।

অভিভাবক ও শিক্ষককে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে অপমান না করে ভুলটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ভুলকে লজ্জার বিষয় না বানিয়ে সংশোধনের সুযোগ করে দিতে হবে।

অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা:

'ও এত ভালো করে, তুমি পারো না কেন?' এ ধরনের কথা অনেক সময় উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মেধা, গতি, আগ্রহ ও শেখার ধরন এক নয়।

তুলনার পরিবর্তে তার নিজের গতকালের সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করা বেশি ফলপ্রসূ। সে গত মাসের চেয়ে এখন একটু ভালো লিখছে কি না, আগের চেয়ে বেশি বুঝছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া দরকার।

অতিরিক্ত চাপ ও ভয়:

ভালো ফলের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ফলাফলকে জীবনের একমাত্র পরিচয় বানিয়ে দিলে শিক্ষার্থী মানসিক চাপে পড়ে যেতে পারে। পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত ভয়, ব্যর্থতার আতঙ্ক কিংবা পরিবারের কঠোর প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

তাই শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে, পরিশ্রম তার দায়িত্ব; ফলাফল আল্লাহর হাতে। ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। ভুল ফলাফল থেকেও নতুনভাবে শুরু করা যায়।

সময়ের মূল্য না বোঝা: 

একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার সময়। কিন্তু 'পরে পড়ব' এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। অল্প অল্প করে জমতে থাকা কাজ একসময় পাহাড়ের মতো হয়ে যায়।

তাই নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট কাজের জন্য রাখা, ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

মোট কথা, একজন শিক্ষার্থীর মেধা হঠাৎ করে নষ্ট হয়ে যায় না। ছোট ছোট ভুল অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে চলতে চলতেই তার মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস, আগ্রহ ও শেখার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। আবার একইভাবে ছোট ছোট ভালো অভ্যাসও ধীরে ধীরে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে অসাধারণ করে তুলতে পারে।

তাই শিক্ষার্থীর দুর্বলতা দেখেই তাকে 'মেধাবীহীন' বলে দেওয়া ঠিক নয়। বরং দেখতে হবে, সে কীভাবে পড়ছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে, কীভাবে ঘুমাচ্ছে, কীভাবে লিখছে, কীভাবে ভুল করছে এবং ভুল থেকে কীভাবে শিখছে। মেধা শুধু জন্মগত বিষয় নয়; মেধার বিকাশের জন্য প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতি, নিয়মিত অনুশীলন, সুন্দর পরিবেশ, আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রম।

একজন শিক্ষার্থীর হাতে শুধু বই তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাকে বই পড়ার পদ্ধতি শেখাতে হয়, প্রশ্ন বুঝতে শেখাতে হয়, উত্তর গুছিয়ে লিখতে শেখাতে হয়, সময়ের মূল্য বোঝাতে হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস করতে শেখাতে হয়।

কারণ অনেক সময় শিক্ষার্থীর মেধা হারিয়ে যায় না; ভুল পদ্ধতির আড়ালে তার মেধা চাপা পড়ে যায়। আমাদের দায়িত্ব সেই আড়াল সরিয়ে তার সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন