Logo

ধর্ম

সন্তানের প্রথম পাঠশালা তার পরিবার

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:০২

অ
সন্তানের প্রথম পাঠশালা তার পরিবার

একটি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগেই অনেক কিছু শিখে ফেলে। তার প্রথম শব্দ, প্রথম হাসি, প্রথম অভ্যাস, প্রথম ভালো-মন্দের ধারণা, সবকিছুর সূচনা হয় ঘর থেকেই। সে প্রথম যে মানুষটির মুখে কথা শোনে, যে আচরণ দেখে, যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, সেখান থেকেই তার ব্যক্তিত্বের ভিত তৈরি হতে থাকে। তাই সন্তানের প্রথম মাদরাসা কোনো ভবন নয়; তার পরিবার। আর তার প্রথম শিক্ষক কোনো পাঠ্যবই নয়; বাবা-মায়ের জীবনাচরণ।

আমরা সন্তানের জন্য ভালো মাদরাসা খুঁজি, যোগ্য উস্তাদ খুঁজি, দামি বই কিনে দিই। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন নিজেদের করা জরুরি, মাদরাসায় যে শিক্ষা সন্তান পাচ্ছে, ঘরে ফিরে সে কি তার বাস্তব চর্চা দেখতে পাচ্ছে?

শিক্ষক যদি তাকে সত্যবাদিতা শেখান, কিন্তু ঘরে সে বড়দের মিথ্যা বলতে দেখে; মাদরাসায় যদি তাকে নামাজের গুরুত্ব বোঝানো হয়, অথচ ঘরে নামাজের সময় সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে; শিক্ষক যদি তাকে সুন্দর ভাষায় কথা বলতে শেখান, অথচ পরিবারের বড়রা পরস্পরের সঙ্গে রূঢ় ভাষায় কথা বলেন, তাহলে শিশুর মনে কোন শিক্ষাটি স্থায়ী হবে?

শিশু কেবল উপদেশ শোনে না; সে অনুকরণ করে। তাই সন্তানের চরিত্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ হলো পরিবারের মানুষের জীবন।

সন্তানের প্রথম বই বাবা-মায়ের আচরণ:

একটি শিশু বই পড়ার আগেই মানুষের আচরণ পড়তে শুরু করে। বাবা কীভাবে কথা বলেন, মা কীভাবে রাগ সামলান, পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে কীভাবে সম্মান করেন, এসব তার ছোট্ট মনে গভীর ছাপ ফেলে।

বাবা আজান শুনে কাজ থামিয়ে নামাজে দাঁড়ালে শিশু শেখে নামাজ গুরুত্বপূর্ণ। মা কুরআন হাতে নিলে সে বুঝতে শেখে কুরআন শুধু আলমারিতে রাখার বই নয়। বাবা-মা পরস্পরের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বললে সে শেখে ভালোবাসার ভাষা কেমন। ভুল করলে বাবা যদি সন্তানের কাছে 'আমি ভুল করেছি' বলতে পারেন, শিশুও একদিন নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখবে।

তাই সন্তানের সামনে বড় বড় নসিহত করার আগে আমাদের নিজেদের জীবনকে একটু দেখা দরকার। সন্তানকে যে মানুষটি বানাতে চাই, তার একটি জীবন্ত নমুনা কি আমরা নিজেরা হতে পারছি?

ঘরের পরিবেশই চরিত্রের কারখানা:

একটি শিশুর চরিত্র হঠাৎ করে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনা, কথাবার্তা ও অভ্যাস তার চরিত্র নির্মাণ করে।

খাবারের আগে বিসমিল্লাহ বলা, ডান হাতে খাওয়া, সালাম দেওয়া, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, কারও জিনিস অনুমতি ছাড়া না নেওয়া, ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া, মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা–এসব ছোট মনে হলেও শিশুর ভবিষ্যৎ চরিত্রের বড় উপাদান। এসব শেখানোর জন্য প্রতিদিন আলাদা ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাবা-মায়ের জীবনই হতে পারে সেই ক্লাস।

মা যদি সন্তানকে বলেন, 'সালাম দাও', অথচ নিজে ঘরে ঢুকে সালাম না দেন, তাহলে শিশু দ্বিধায় পড়ে যায়। বাবা যদি বলেন, 'মিথ্যা বলবে না', অথচ ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় সন্তানের সামনে মিথ্যা বলেন, তখন শিশু কথার চেয়ে কাজকেই সত্য মনে করবে। সন্তানের কান দিয়ে যে শিক্ষা ঢোকে, তার চেয়ে চোখ দিয়ে দেখা শিক্ষা অনেক বেশি গভীরে পৌঁছে যায়।

প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ঘরে ফিরিয়ে আনতে হবে:

সন্তানকে মাদরাসায় বা স্কুলে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সেখান থেকে সে যে শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসে, ঘরে তার চর্চার সুযোগ তৈরি করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব।

আজ মাদরাসায় একটি দোয়া শিখেছে, রাতে তাকে দিয়ে সেটি পড়ানো যেতে পারে। আজ শিক্ষক কোনো সাহাবির ঘটনা বলেছেন, রাতে খাবারের টেবিলে সেই ঘটনা নিয়ে দু-এক মিনিট কথা বলা যেতে পারে। আজ শিক্ষক পরিচ্ছন্নতার কথা বলেছেন, বাড়িতে তাকে নিজের বই-খাতা গুছিয়ে রাখার অভ্যাস করানো যেতে পারে।

এভাবে মাদরাসার শিক্ষা যখন ঘরের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন শিক্ষা শুধু মুখস্থ থাকে না; অভ্যাসে পরিণত হয়।

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন: 

সন্তানকে ভালো মানুষ বানানোর জন্য শুধু শাসন যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে সম্পর্কও গভীর করতে হবে।

সে মাদরাসা থেকে ফিরে এলে শুধু 'আজ কতটুকু পড়েছ?' কিংবা পরীক্ষার পর 'কত নম্বর পেয়েছ?' এমন প্রশ্ন না করে জিজ্ঞেস করা যায়, 'আজ কী শিখলে?', 'উস্তাদ কী সুন্দর কথা বলেছেন?' 'কোনো বন্ধু তোমাকে সাহায্য করেছে?' 'আজ তুমি কাউকে সাহায্য করেছ? এসব প্রশ্ন শিশুকে বুঝিয়ে দেয়, তার বাবা-মায়ের কাছে সে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়; তার অনুভূতি, আচরণ ও মানুষ হয়ে ওঠাও গুরুত্বপূর্ণ।

যে সন্তান নিজের কথা নিশ্চিন্তে বাবা-মাকে বলতে পারে, সে ভুল পথে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগও বেশি থাকে।

তুলনা নয়, উৎসাহ দিন: 

'তোমার বন্ধু এত ভালো পড়ে, তুমি পারো না কেন?' এই কথাটি হয়তো অভিভাবকের কাছে সাধারণ। কিন্তু শিশুর মনে এটি গভীর কষ্ট তৈরি করতে পারে।

প্রতিটি শিশুর মেধা, গতি ও সক্ষমতা এক নয়। কারও হাতের লেখা সুন্দর, কারও মুখস্থশক্তি ভালো, কেউ দ্রুত বোঝে, কেউ একটু সময় নিয়ে ভালো শেখে। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে শিশুকে তার নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা উচিত।

গতকাল যে কাজটি পারত না, আজ যদি একটু ভালো করতে পারে, তাকে উৎসাহ দিন। একটি ছোট সাফল্যের প্রশংসা কখনো কখনো একটি শিশুর ভেতরে বড় স্বপ্ন জাগিয়ে দিতে পারে।

মোবাইলের বিকল্প হোক পরিবার: 

আজকের শিশুর জীবনে মোবাইল একটি বড় বাস্তবতা। সন্তানকে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে চাইলে শুধু তার হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে আবার তাকে নিষেধ করলে হবে না। বাবা-মায়ের নিজেদের ব্যবহারও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শিশুর সঙ্গে গল্প করুন, বই পড়ুন, হাঁটতে বের হন, একসঙ্গে খেলুন, তার কথা শুনুন। তাকে এমন একটি ঘর দিন, যেখানে বিনোদনের জন্য সব সময় একটি পর্দার প্রয়োজন হয় না।

শাসন হোক মমতার সঙ্গে:

সন্তান ভুল করবে, এটাই স্বাভাবিক। ভুল করলেই অপমান, চিৎকার কিংবা কঠোর শাস্তি তার সংশোধনের একমাত্র পথ নয়। কখনো দৃঢ় হতে হবে, কখনো বুঝিয়ে বলতে হবে, কখনো সময় দিতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্তান ভুল করলে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসতে ভয় না পায়।

তাকে বোঝাতে হবে, তোমার কাজটি ভুল হতে পারে, কিন্তু তুমি আমাদের কাছে মূল্যবান। এই একটি অনুভূতি শিশুর মনে নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।

শুধু ভালো প্রতিষ্ঠান নয়, ভালো ঘরও চাই:

আমরা সন্তানের জন্য ভালো মাদরাসা খুঁজি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ভালো একটি ঘর। এমন ঘর, যেখানে নামাজের পরিবেশ আছে, কুরআনের সুর আছে, সালামের চর্চা আছে, সত্য বলার সাহস আছে, বড়দের সম্মান আছে, ছোটদের প্রতি মমতা আছে।

এমন ঘর, যেখানে সন্তান প্রশ্ন করলে তাকে ধমক দেওয়া হয় না; ভুল করলে শুধরে দেওয়া হয়; ভালো কাজ করলে উৎসাহ দেওয়া হয়; আর রাতে ঘুমানোর আগে তার জন্য বাবা-মায়ের হৃদয় থেকে দোয়া বের হয়। কারণ সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, জীবনে ভালো মানুষ হওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

একদিন সে বড় হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে যাবে, সমাজে চলবে, নিজের পরিবার গড়বে। তখন আমরা তার পাশে প্রতিটি মুহূর্তে থাকব না। কিন্তু শৈশবে পরিবার থেকে পাওয়া শিক্ষা তার সঙ্গে থাকবে।

তাই সন্তানের হাতে শুধু বই তুলে দিলেই হবে না; তাকে একটি আদর্শ জীবন দেখাতে হবে। শুধু মাদরাসায় বা স্কুলে পাঠালেই হবে না; ঘরকেও তার শিক্ষার সহায়ক মাদরাসা বানাতে হবে।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন