Logo

ধর্ম

ইসলামে মুহতাসিব ও আধুনিক ভোক্তা অধিকার

(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৬

অ
ইসলামে মুহতাসিব ও আধুনিক ভোক্তা অধিকার

প্রথম পর্বে আমরা Hisbah ও Muhtasib-এর ইতিহাস, কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ভিত্তি এবং ইসলামী সভ্যতায় এর বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—আধুনিক ভোক্তা অধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে Hisbah-এর মৌলিক পার্থক্য, বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যকর রূপরেখা।

Hisbah ও আধুনিক Consumer Protection: কোথায় মিল, কোথায় অমিল

আধুনিক রাষ্ট্রে Consumer Rights Protection Authority, Bangladesh Food Safety Authority (BFSA) এবং Bangladesh Standards and Testing Institution (BSTI)—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে। কেউ ভোক্তার অভিযোগ নিষ্পত্তি করে, কেউ খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আবার কেউ পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করে।

অন্যদিকে Hisbah ছিল একটি সমন্বিত নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। একজন Muhtasib একই সঙ্গে বাজার তদারকি, খাদ্যের মান যাচাই, ওজন ও পরিমাপ পরীক্ষা, জনস্বাস্থ্য, মূল্যস্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতেন।

আরও বড় পার্থক্য ছিল দর্শনে। আধুনিক ব্যবস্থার প্রধান শক্তি আইন; Hisbah-এর প্রধান শক্তি ছিল আইন, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির সমন্বয়। আধুনিক আইনে অপরাধ প্রমাণের পর শাস্তি দেওয়া হয়; কিন্তু Hisbah মানুষকে অপরাধ সংঘটনের আগেই বিবেকের মাধ্যমে বিরত রাখতে চাইত।

একজন ব্যবসায়ী জানতেন—তিনি শুধু রাষ্ট্রের কাছে নন, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করবেন। এই আত্মিক দায়বদ্ধতাই ইসলামী বাজারব্যবস্থাকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল।

বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা: চ্যালেঞ্জ কোথায়?

বাংলাদেশে Consumer Rights Protection Act, 2009 এবং Safe Food Act, 2013 কার্যকর রয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। BSTI মান নিয়ন্ত্রণ করে, BFSA নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ করে এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযোগ নিষ্পত্তি ও বাজার তদারকি পরিচালনা করে। তবুও বাস্তবতা উদ্বেগজনক।

খাদ্যে ভেজাল, ওজনে কারচুপি, কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেট, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া ব্র্যান্ড, নকল পণ্য এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা আজও বাজারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এর অন্যতম কারণ হলো—আইন রয়েছে, কিন্তু সর্বত্র কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা কঠিন। কোটি কোটি লেনদেন প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের পক্ষে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। ফলে কেবল আইন দিয়ে নয়, নৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেও বাজারকে নিরাপদ করতে হবে।

Hisbah আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

প্রথম শিক্ষা—ব্যবসা কেবল লাভের জন্য নয়; এটি একটি আমানত।

দ্বিতীয় শিক্ষা—ভোক্তার অধিকার রক্ষা করা ইবাদতের অংশ।

তৃতীয় শিক্ষা—স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো ব্যবসা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— "যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম)

এই একটি হাদিস আজকের Consumer Protection দর্শনেরও মৌলিক ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বাস্তব করণীয়

প্রথমত, ব্যবসায়ীদের জন্য নৈতিক ও শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যশিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসায়ী সংগঠন কিংবা চেম্বারভিত্তিক প্রশিক্ষণে ব্যবসায়িক নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, Consumer Rights Protection Authority, BFSA এবং BSTI-এর সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অভিযোগ, পরীক্ষার ফলাফল ও বাজারতথ্য দ্রুত বিনিময় করা যায়।

তৃতীয়ত, প্রতিটি উপজেলা ও পৌরবাজারে স্থানীয় আলেম, শিক্ষক, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা এবং ভোক্তাদের সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবী Market Transparency Committee গঠন করা যেতে পারে। তারা প্রশাসনের বিকল্প নয়; বরং সচেতনতা ও সামাজিক জবাবদিহি তৈরিতে সহযোগী শক্তি হতে পারে।

চতুর্থত, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়াতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিপণ্য সরাসরি বাজারজাত করা গেলে ন্যায্যমূল্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সহজ হবে।

পঞ্চমত, অনলাইন বাণিজ্যের জন্য কঠোর মানদণ্ড প্রয়োজন। ভুয়া বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, নকল পণ্য ও প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ষষ্ঠত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোক্তা অধিকার, নিরাপদ খাদ্য ও নৈতিক ব্যবসা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

আইন ও নৈতিকতার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের পথ

একটি বাজারকে নিরাপদ রাখতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিশ্বাস। আর বিশ্বাস জন্ম নেয় সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা থেকে।

Hisbah আমাদের শেখায়—রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা, কিন্তু সমাজের দায়িত্ব নৈতিকতা লালন করা। যখন এই দুটি শক্তি একত্রিত হয়, তখনই বাজারে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজ বাংলাদেশ এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তার অধিকার এবং বাজারের স্বচ্ছতা জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতায় ইসলামের Hisbah দর্শন কোনো অতীতের ইতিহাস নয়; বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করার একটি কার্যকর নৈতিক কাঠামো।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবেন, ব্যবসায়ী আমানতদার হবেন, শ্রমিক সম্মানজনক অধিকার ভোগ করবেন এবং ভোক্তা নিশ্চিন্তে নিরাপদ পণ্য কিনতে পারবেন।

ন্যায়ভিত্তিক বাজারই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি নির্মিত হয় একটি সৎ লেনদেন, একটি সঠিক ওজন, একটি সত্য উচ্চারণ এবং একজন আমানতদার ব্যবসায়ীর হাত ধরে। ইসলামের শিক্ষা আমাদের সেই পথই দেখায়।

লেখক: আলেম, লেখক ও কৃষি উদ্যোক্তা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন