জমে উঠেছে সিলেট টেস্ট
বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩ উইকেট, পাকিস্তানের ১২১ রান
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ২০:৪৩
রোমাঞ্চ, নাটক আর অবিশ্বাস্য এক প্রতীক্ষার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট। চায়ের নগরী সিলেটের আকাশে এখন জয়ের সুবাস, আর গ্যালারিজুড়ে আকুলিবিকুলি করছে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশার ঢেউ। রাওয়ালপিন্ডির পর এবার ঘরের মাঠেও পাকিস্তানকে টেস্টে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করার সুবর্ণ সুযোগ এখন নাজমুল হোসেন শান্তর দলের সামনে।
৪৩৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ
দিন শেষে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেট হারিয়ে ৩১৬ রান তুলেছে পাকিস্তান। টেস্টের
১৪৯ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে এত রান তাড়া করে জেতার কোনো নজির নেই।
সমীকরণ বলছে, টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিনে
আজ ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লিখতে বাংলাদেশের প্রয়োজন মাত্র ৩টি উইকেট, আর অলৌকিক কিছু
ঘটিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ম্যাচ জিততে পাকিস্তানের চাই আরও ১২১ রান। পরিসংখ্যান, অভিজ্ঞতা
আর বর্তমান পরিস্থিতি—সবকিছুই এখন বাঘের থাবায় বন্দি। তবে সিলেটের
উইকেটে শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে জয়ের পথে প্রধান ‘কাঁটা’ হয়ে এক প্রান্ত
আগলে দাঁড়িয়ে আছেন পাকিস্তানি উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ান।
ম্যাচের ভিতটা গড়ে উঠেছিল মূলত তৃতীয় দিনেই।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ২৭৮ রানের জবাবে পাকিস্তান তাদের প্রথম ইনিংসে অলআউট হয় মাত্র
২৩২ রানে। ৪৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমের
অনবদ্য ও দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে ভর করে ৩৯০ রানের বিশাল স্কোর দাঁড় করায় বাংলাদেশ।
ফলে প্রথম ইনিংসের লিডসহ পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৩৭ রানের এক অসম্ভব হিমালয়।
তৃতীয় দিনের শেষ বিকেলে পাকিস্তান কোনো রান না তুলেই ২ ওভার পার করেছিল।
চতুর্থ দিন সকালে শূন্য রান নিয়ে খেলতে
নামা পাকিস্তানের দুই ওপেনার আব্দুল্লাহ ফজল ও আজান আওয়াইস বেশ দেখেশুনে খেলা শুরু
করেন। তবে ইনিংসের ১১তম ওভারে পাকিস্তান শিবিরে প্রথম আঘাত হানেন বাংলাদেশের গতিদানব
নাহিদ রানা। রানার একটি অফ-স্ট্যাম্প ঘেঁষা গতিশীল শর্ট বল কাট করতে গিয়ে পরাস্ত হন
আব্দুল্লাহ ফজল (৬)। বল ব্যাটের কানায় লেগে গালিতে চলে গেলে সেখানে বাজপাখির মতো চিতপটাং
ডাইভ দিয়ে এক অবিশ্বাস্য ক্যাচ লুফে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
১৪ রানের ব্যবধানে পাকিস্তানের দ্বিতীয়
উইকেটের পতন ঘটান মিরাজ নিজেই। ১৬তম ওভারের শেষ বলে তার একটি ফুলার লেন্থ ড্রিফট করা
বল ফরোয়ার্ড ডিফেন্স করতে গিয়ে লাইন মিস করেন আরেক ওপেনার আজান আওয়াইস (২১)। বাংলাদেশের
জোরালো আবেদনে আম্পায়ার রিচার্ড কেটলবোরো আঙুল তুলে দেন। আজান রিভিউ নিলেও 'আম্পায়ার্স
কলে' তাকে প্যাভিলিয়নের পথ ধরতে হয়। ৪১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে তখন কাঁপছিল পাকিস্তান।
টপ অর্ডারের ব্যর্থতার পর পাকিস্তানের
হাল ধরেন দুই অভিজ্ঞ যোদ্ধ বাবর আজম ও অধিনায়ক শান মাসুদ। সিলেটের উইকেট কিছুটা পাটা
হয়ে ওঠায় বোলারদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে এই জুটি টেস্ট ও ওয়ানডের মিশেলে প্রতি-আক্রমণ
শুরু করেন। বাজে বল পেলেই তারা সীমানাছাড়া করছিলেন। দুজনে মিলে স্কোরবোর্ডে ৯২ রান
যোগ করে স্বাগতিক শিবিরে অস্বস্তি বাড়াতে থাকেন।
তবে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর বাংলাদেশকে
ম্যাচে ফেরান তাইজুল ইসলাম, যার নেপথ্য কারিগর ছিলেন লিটন দাস। ৩৫তম ওভারের প্রথম বলে
তাইজুলের লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বলটিতে আলতো ফ্লিক করতে যান বাবর
আজম। বল তার ব্যাটের সামান্য কানা ছুঁয়ে পেছনে গেলে উইকেটরক্ষক লিটন দাস অবিশ্বাস্য
দক্ষতায় নিচু হয়ে আসা ক্যাচটি গ্লাভসবন্দী করেন। ৪৭ রান করা বাবর আজম ক্রিজে কিছুক্ষণ
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মাঠ ছাড়েন।
বাবর আজম ফেরার পর সিরিজ জুড়ে ব্যর্থ হতে
থাকা সৌদ শাকিলও টিকতে পারেননি। নাহিদ রানার করা অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরের এক রিভার্স
ইয়র্কার ডেলিভারিতে ব্যাট ছুঁইয়ে উইকেটরক্ষক লিটনের দ্বিতীয় শিকার হন শাকিল (৬)। ১৫৪
রানে ৪ উইকেট হারানো পাকিস্তানের একমাত্র আশার আলো হয়ে এক পাশ আগলে খেলছিলেন অধিনায়ক
শান মাসুদ। তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৪তম ফিফটি।
কিন্তু ৪৫তম ওভারে তাইজুলের বলে ডিফেন্ড
করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনেন তিনি। মাসুদের ব্যাটের ইনসাইড-এজ হয়ে বল শর্ট লেগের
দিকে বাতাসে ভেসে উঠলে সেখানে প্রস্তুত থাকা মাহমুদুল হাসান জয় চিতাবাঘের মতো ডাইভ
দিয়ে মাটি ঘেঁষা বলটি তালুবন্দী করেন। ১১৬ বলে ৮টি চারের সাহায্যে ৭১ রান করে বিদায়
নেন শান মাসুদ। কাকতালীয় বিষয় হলো, শান মাসুদ যখন ৭১ রানে আউট হন, তখন ফরোয়ার্ড শর্ট
লেগে তার সেই ক্যাচ নেওয়া ফিল্ডার মাহমুদুল হাসান জয়ের জার্সি নম্বরও ছিল ‘৭১’! ১৬২ রানে ৫
উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান তখন দ্রুত ম্যাচ শেষ হওয়ার শঙ্কায় পড়ে।
১৬২ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর ক্রিকেটপ্রেমীরা
আশা করেছিলেন চতুর্থ দিনেই হয়তো টেস্টের ফল চলে আসবে। কিন্তু পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে
যখন-তখন ধসে পড়াটাই যেখানে নিয়ম, সেখানে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক প্রতিরোধ গড়ে
তোলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলী আগা। এই দুই ব্যাটার চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে
স্পিন ও পেস আক্রমণ সামলাতে থাকেন।
মাঝেমধ্যে সময় নষ্ট করার কৌশল নিলেও তাদের
ব্যাটিংয়ে ছিল দৃষ্টিনন্দন শটের পসরা। বাংলাদেশের বোলারদের ক্লান্ত করে দুজনই তুলে
নেন নিজ নিজ হাফসেঞ্চুরি। ষষ্ঠ উইকেটে ২২৪ বলে ১৩৪ রানের এক বিশাল পার্টনারশিপ গড়ে
তারা ম্যাচটি কার্যত পঞ্চম দিনে টেনে নিয়ে যান এবং বাংলাদেশকে হারের ভয় দেখাতে শুরু
করেন।
চায়ের বিরতির পর যখন রিজওয়ান-সালমান জুটি
ম্যাচটি বাংলাদেশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তখন অধিনায়ক শান্ত নতুন
বল নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৮০ ওভারের পর নতুন বল হাতে নিয়ে প্রথম ওভারে শরিফুল ইসলাম
চাপ তৈরি করেন। ৮২তম ওভারে আক্রমণে আসেন স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ওই ওভারের পঞ্চম বলে
তাইজুল তার চেনা ম্যাজিক দেখান। একটি দুর্দান্ত আর্ম ডেলিভারিতে বাউন্ডারি হাঁকানো
সালমান আলী আগাকে পরাস্ত করে সরাসরি বোল্ড করেন তিনি।
১০২ বলে ৭১ রান করে সালমান আগা বোল্ড হতেই
উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা বাংলাদেশ দল। সালমানের বিদায়ের পর ক্রিজে আসেন পেসার হাসান আলী।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি থাকা এই ব্যাটারকে কোনো সুযোগই দেননি তাইজুল। নিজের
পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে (৮৩.২ ওভারে) হাসান আলীকে (০) প্রথম স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর
ক্যাচ বানিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান তাইজুল। ৮ বলের ব্যবধানে এই ২ উইকেট তুলে নিয়ে
শেষ বিকেলে ম্যাচটি পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। চতুর্থ দিনে ১১৩ রান খরচ
করে একাই ৪ উইকেট শিকার করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। এছাড়া নাহিদ রানা ২টি ও মিরাজ ১টি
উইকেট নেন।
হাসান আলী দ্রুত বিদায় নিলেও শেষ ১৬টি
বল পার করে দিয়ে সাজিদ খানকে সাথে নিয়ে ক্রিজ ছাড়েন মোহাম্মদ রিজওয়ান। দিন শেষে রিজওয়ান
১৩৪ বলে ৭৫ রানে অপরাজিত আছেন। তার সাথে ৯ বলে ৮ রান নিয়ে খেলছেন সাজিদ খান। সিলেটের
মাঠে তখন ফ্লাডলাইট জ্বালানো হলেও ঘড়ির কাটায় বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট বাজায় দিনের খেলা
শেষ ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের হাতে এখনো ৩টি উইকেট থাকলেও তাদের জয়ের জন্য আরও ১২১
রান করতে হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য মূল চিন্তার কারণ হলো সাজিদ খান।
প্রথম ইনিংসে সাজিদ মাত্র ২৮ বলে ৩৮ রানের
একটি ক্যামিও ইনিংস খেলেছিলেন এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে তার সেঞ্চুরিও রয়েছে। তাই পঞ্চম দিনের
প্রথম সেশনেই সাজিদ খান এবং সেট হয়ে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ানের উইকেট দ্রুত তুলে নেওয়াটাই
হবে শান্ত-তাইজুলদের প্রধান লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, রাওয়ালপিন্ডির পর এবার সিলেটেও
২-০ ব্যবধানকে ৪-০-তে রূপান্তর করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
আজ সকালের সেশনে বোলাররা যদি নিজেদের লাইন-লেংথ বজায় রেখে দ্রুত বাকি ৩টি উইকেট তুলে
নিতে পারেন, তবে পাকিস্তানের মাটিতে জেতার পর এবার ঘরের মাঠেও পাকিস্তানকে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ
করার এক নতুন ও স্বর্ণালী ইতিহাস লিখবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

