Logo

খেলা

পাকিস্তানকে ‘বাংলাওয়াশ’, টাইগারদের ইতিহাস

Icon

মশিউর রহমান

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ২১:১৮

পাকিস্তানকে ‘বাংলাওয়াশ’, টাইগারদের ইতিহাস

২০০৩ সালের মুলতান টেস্টের সেই বেদনাবিধুর স্মৃতি আজো দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে। ইনজামাম-উল-হকের সেই মহাকাব্যিক সেঞ্চুরি আর হাতের মুঠোয় থাকা জয় হাতছাড়া হওয়ার পর তৎকালীন অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য ছিল বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক।

সেই আক্ষেপ, সেই হারের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়েছে দীর্ঘ ২১ বছর। যে পাকিস্তান ছিল এক অপরাজেয় জুজুর নাম, যাদের সামনে পেলেই একসময় হারের প্রহর গুনতে হতো, সেই পাক-বাহিনীকে এবার ঘরের মাঠেও বাংলাওয়াশ করার লজ্জায় ডুবাল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

বুধবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে সফরকারী পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। রাওয়ালপিন্ডির পর সিলেটেও মিলল ব্যাক-টু-ব্যাক হোয়াইটওয়াশের স্বাদ।

আর এই মহাকাব্যিক জয়ের হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে একের পর এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক- আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের ইতিহাসে প্রথমবার সাতে আরোহণ, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের টেবিলে ভারতকে টপকে পাঁচে উঠে আসা এবং নিজেদের আড়াই যুগের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার টানা ৪ টেস্ট জয়ের এক অনন্য কীর্তি।

সিলেটের রুদ্ধশ্বাস ঐতিহাসিক জয়: সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতেই ছিল। ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৬২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল পাকিস্তান। মনে হচ্ছিল চতুর্থ দিনেই ম্যাচ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সেখান থেকে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান এবং সালমান আলি আগা। দুইজনের ১৩৪ রানের লড়াকু জুটি কিছুটা হলেও ভয় ও দুশ্চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিল টাইগার শিবিরে। তীব্র গরমের মাঝে ফিল্ডারদের শরীরী ভাষায় ভর করেছিল ক্লান্তি, গালিতে ক্যাচ মিস করেছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এমনকি তাইজুল ও লিটনের ভুল বোঝাবুঝিতে আরেকটি হাফ-চান্স হাতছাড়া হয়। তবে পঞ্চম ও শেষ দিনের সকালে জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটান অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। আগের ৪ দিন রাতের মুষলধারে বৃষ্টির পর এদিন সকালেও ১৫ মিনিট খেলা বন্ধ ছিল বৃষ্টির কারণে।

তবে ম্যাচ শুরু হতেই টি-টোয়েন্টি স্টাইলে দ্রুত রান তুলতে থাকা সাজিদ খানকে (২৮) স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ বানিয়ে নিজের ফাইফার (৫ উইকেট) পূর্ণ করেন তাইজুল। ঠিক তার পরের ওভারেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন পেসার শরীফুল ইসলাম। সেঞ্চুরির দোরগোড়ায় থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ৯৪ রানে গালিতে মিরাজের তালুবন্দী করান শরীফুল। ১৬৬ বলের প্রতিরোধ ভাঙার পর পাকিস্তানের পরাজয় ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার। শেষ ব্যাটার খুররম শাহজাদকে বোল্ড করে ইনিংসে নিজের ৬ষ্ঠ উইকেট তুলে নেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের ইনিংস ৩৫৮ রানে গুটিয়ে দেন তাইজুল। ৭৮ রানের এই ঐতিহাসিক জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো সিলেট স্টেডিয়াম।

টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার টানা চার জয়: ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ঘরের মাঠ কিংবা বাইরে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের কোনো নজিরই ছিল না বাংলাদেশের। আগের ১৩ টেস্টের ১২টিতেই হার আর সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল স্রেফ একটি ম্যাচ ড্র। সেই খরা কেটেছিল রাওয়ালপিন্ডির ১০ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় দিয়ে। এরপর পাকিস্তানের মাটিতে দ্বিতীয় টেস্টে ৬ উইকেটে জিতে প্রথমবার হোয়াইটওয়াশের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। এবার ঘরের মাঠে মিরপুরে প্রথম টেস্টে ১০৪ রান এবং সিলেটে দ্বিতীয় টেস্টে ৭৮ রানে হারিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা ৪ টেস্ট জয়ের বিশ্বরেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ।

নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে আর কোনো নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে টানা এত ম্যাচ জেতার রেকর্ড নেই টাইগারদের। একই সাথে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার টানা ৪টি টেস্ট ম্যাচ জেতার অনন্য কীর্তিও গড়ল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এর আগে কখনোই টানা চার টেস্ট জেতা হয়নি। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ে ও উইন্ডিজের বিপক্ষে এবং ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টানা ৩টি করে টেস্ট জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে গেল। গত ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ডকে ইনিংস ও ৪৭ রান এবং দ্বিতীয় টেস্টে ২১৭ রানে হারানোর পর চলমান মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে এলো ব্যাক-টু-ব্যাক জয়।

ডব্লিউটিসি টেবিলে ভারতকে টপকে পাঁচে বাংলাদেশ: এই জয়ের সুবাদে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে এসেছে এক বিশাল ওলটপালট। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে পেছনে ফেলে টেবিলের পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছে টিম বাংলাদেশ। কোচ ফিল সিমন্সের অধীনে এটিই এখন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে বাংলাদেশের সেরা অবস্থান। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের টেবিল নির্ধারিত হয় মূলত জয়ের রেটিং শতাংশের ওপর ভিত্তি করে। চলমান চক্রে ৪টি ম্যাচ খেলে ২ জয়, ১ হার এবং ১ ড্র নিয়ে বাংলাদেশের জয়ের হার দাঁড়িয়েছে শতকরা ৫৮.৩৩ শতাংশে, পয়েন্ট সংখ্যা ২৮। অন্যদিকে, ৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৪টি জয়, ৪টি হার এবং ১টি ড্র নিয়ে ভারতের সংগ্রহ ৫২ পয়েন্ট হলেও শতাংশের হিসাবে (৪৮.১৫%) তারা বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়ে ৬ নম্বরে নেমে গেছে। উল্লেখ্য, স্লো ওভার রেটের জরিমানা ও টানা হারে মাত্র ৮.৩৩% পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের আট নম্বরে তলিয়ে গেছে পাকিস্তান।

প্রথমবারের মতো সাতে: মাঠের এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই আইসিসি থেকে এসেছে আরও এক বড় সুখবর। প্রথমবারের মতো আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের ৭ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, যা দেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ অষ্টম স্থানে উঠেছিল বাংলাদেশ। সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট ছিল ৬৭, আর পাকিস্তানের ছিল ৮৯। তবে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পর বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট এক লাফে ১১টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮-এ।

ফলে নবম স্থান থেকে সরাসরি সাতে উঠে এসেছে টাইগারেরা। অপরদিকে, ১৪ রেটিং পয়েন্ট হারিয়ে (বর্তমান পয়েন্ট ৭৫) টেবিলের ৬ নম্বর থেকে দুই ধাপ পিছিয়ে ৮ নম্বরে নেমে গেছে পাকিস্তান। এক ধাপ পিছিয়ে ৬৮ পয়েন্ট নিয়ে ৯ নম্বরে অবস্থান করছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অর্থাৎ, ক্রিকেট বিশ্বের দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে পেছনে ফেলে টেবিলের ছয়ে থাকা শ্রীলঙ্কার (৮৬ পয়েন্ট) ঠিক নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

ম্যাচসেরা লিটন ও সিরিজসেরা মুশফিকের মহাকাব্য: সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ যখন মাত্র ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে, তখন টেল-এন্ডারদের নিয়ে দলের ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন লিটন দাস। খেলেন ১২৬ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংসেও তাঁর ব্যাট থেকে আসে মূল্যবান ৬৯ রান। ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে লিটন জানান, কঠিন সময়ে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দেওয়া পরামর্শই তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। লিটন বলেন, অধিনায়ককে জিজ্ঞেস করেছিলাম কী করব? সে আমাকে স্রেফ নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে যেতে বলেছিল। টেইলএন্ডারদের সাথে প্রথম দিনের কঠিন উইকেটে ব্যাট করা সহজ ছিল না। এটি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সেঞ্চুরি।

অন্যদিকে, পুরো সিরিজে ব্যাট হাতে অনন্য ধারাবাহিকতা দেখিয়ে সিরিজসেরার পুরস্কার জিতেছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। রাওয়ালপিন্ডির সেই ১৯১ রানের পর সিলেটেও দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১৩৭ রানের অনবদ্য এক সেঞ্চুরি। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মুশফিক বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, ছেলেরা এই সাফল্য ডিজার্ভ করে। দেশের জন্য খেলা সহজ কাজ নয়, এর পেছনে রয়েছে প্রচুর কঠোর পরিশ্রম। লিটন প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে আমাদের ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিল, বোলাররাও বেসিক ধরে রেখে বল করেছে।

পিচ কৌশলে সাহসী পরিবর্তন: বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট ও কিউরেটরদের এক সাহসী সিদ্ধান্ত। মিরপুরের ঐতিহ্যগত মন্থর ও স্পিন সহায়ক 'টার্নিং ট্র্যাক'-এর চেনা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে এবার পেস বোলিং এবং ব্যাটিং সহায়ক ফ্ল্যাট পিচ বেছে নেওয়া হয় মিরপুর ও সিলেটে। আর এই নতুন কন্ডিশনেই বাজিমাৎ করেছে শান্তর দল। তরুণ পেসার নাহিদ রানার গতি এবং হাসান মাহমুদ-শরীফুলদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে খেই হারিয়েছে পাকিস্তানি ব্যাটাররা।

প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার অভিনন্দন: পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক ও গৌরবময় সিরিজ জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, প্রধানমন্ত্রী এই জয়ে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও বিসিবি সংশ্লিষ্ট সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, দলীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলা ধরে রেখে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে আরও এগিয়ে যাবে এবং এই অর্জন তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় অনুপ্রাণিত করবে।

একই সাথে গভীর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এই ঐতিহাসিক বিজয় আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অর্জন। খেলার ৫ম দিনে ক্রিকেটাররা যেভাবে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও দলগত ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সমগ্র জাতিকে এক অনন্য গৌরব এনে দিয়েছে। আমি খেলোয়াড় ও বিসিবিসহ সবাইকে দেশবাসীর পক্ষ থেকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন