মিরপুরে মোসাদ্দেক-নাহিদের রূপকথা
২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারাল বাংলাদেশ
মশিউর রহমান
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ২১:১৪
২০০৫ সালের ১৮ জুন, কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেই অবিস্মরণীয় শতক আর আফতাব আহমেদের জয়সূচক ছক্কার গল্পটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক চিরন্তন লোকগাথা। ২১ বছর পর, ২০২৬ সালের জুনে এসে যেন ফিরে এলো সেই সোনালী অতীত। মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ২২ গজে রচিত হলো লাল-সবুজের ক্রিকেটের নতুন এক মহাকাব্য।
পেসার নাহিদ রানার আগুনে গতি আর প্রায়
চার বছর পর দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের অতিমানবীয় অলরাউন্ড নৈপুণ্যে শক্তিশালী
অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন
(ডিএলএস) পদ্ধতিতে ৮৬ রানের বিশাল জয় পেয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২১ বছরের দীর্ঘ
প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অজিদের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের মাত্র
দ্বিতীয় জয়।
টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশ
যখন ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের চ্যালেঞ্জিং পুঁজি দাঁড় করায়, তখন থেকেই মিরপুরের গ্যালারিতে
ছিল বারুদের গন্ধ। তবে রান তাড়া করতে নামা অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে তাসকিন আহমেদ যা করলেন,
তা এককথায় অবিশ্বাস্য। ইনিংসের প্রথম ওভারের প্রথম বল। তাসকিনের দুর্দান্ত এক ডেলিভারি
সিমে পড়ে চমৎকার সুইং করে ভেতরে ঢুকল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অজি ওপেনার ম্যাথু শর্ট
আবিষ্কার করলেন তাঁর স্টাম্প ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। গোল্ডেন ডাক মেরে শর্টের বিদায়ের
পর মিরপুরের গ্যালারি মেতে ওঠে গগনবিদারী উল্লাসে। তাসকিনের এই প্রথম বলে উইকেট শিকারের
কীর্তি দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ৩১ বছর আগের পুরনো স্মৃতিতে।
ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে বাংলাদেশের চতুর্থ
বোলার হিসেবে ম্যাচের প্রথম বলেই উইকেট নেওয়ার অনন্য নজির গড়লেন এই অভিজ্ঞ পেসার। এর
আগে ১৯৯৫ সালে শারজায় পেপসি এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার ওপেনার অশঙ্কা গুরুসিংহাকে ম্যাচের
প্রথম বলে আউট করে এই কীর্তির সূচনা করেছিলেন পেসার সাইফুল ইসলাম। এরপর ২০০৬ সালে নাইরোবির
জিমখানা মাঠে কেনিয়ার ওপেনার কেনেডি ওটিয়েনোকে প্রথম বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে দ্বিতীয়বার
এই গৌরব এনে দেন বাঁহাতি পেসার সৈয়দ রাসেল। দীর্ঘ ২০ বছর পর ওয়ানডেতে সেই স্মৃতি আবার
ফিরিয়ে আনলেন তাসকিন। (উল্লেখ্য, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে এই কীর্তি রয়েছে
মাশরাফি বিন মর্তুজার, আর টি-টোয়েন্টিতে মাশরাফি দুবার, এবং মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মোসাদ্দেক
হোসেন ও তানজিম হাসান সাকিব একবার করে এই গৌরব অর্জন করেছেন)।
তাসকিনের দেওয়া শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠার
আগেই দ্বিতীয় ওভারে আঘাত হানেন ‘কাটার মাস্টার’ মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর একটি চমৎকার ফুল লেংথ ডেলিভারি
মার্নাস লাবুশেনের পায়ে লাগলে এলবিডব্লিউর জোরালো আবেদন জানায় বাংলাদেশ। আম্পায়ার সাড়া
না দিলেও অধিনায়ক রিভিউ নেন এবং সফল হন। মাত্র ২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে
পড়ে সফরকারী দল। এরপর শুরু হয় ২১ বছর আগের কার্ডিফ জয়ের সময় মাত্র ৩ বছর বয়সী তরুণ
গতিদানব নাহিদ রানার গতির ঝড়।
পাওয়ার প্লেতে ভারপ্রাপ্ত অজি অধিনায়ক
জশ ইংলিশ (১৯) ও কুপার কনোলি ৪৯ রানের জুটি গড়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু
১১তম ওভারে ১৪৭.৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতির এক বুলেট ডেলিভারিতে ইংলিশকে উইকেটের
পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন নাহিদ। আউট করার পর নাহিদের আগ্রাসী উদযাপন মাঠের ভেতরে
কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি করলেও তা বড় হতে দেননি আম্পায়ারেরা। এরপর একে একে অজি মিডল
ও লোয়ার অর্ডারকে একাই ধসিয়ে দেন নাহিদ। একপ্রান্ত আগলে রাখা বিপজ্জনক ব্যাটার অ্যালেক্স
কেয়ারিকে (৪৭) লিটন দাসের গ্লাভসবন্দী করার পর ম্যাট রেনশ, লিয়াম স্কট ও জাভিয়ের
বার্টলেটকে উইকেটের পেছনে ও বোল্ডের ফাঁদে ফেলেন তিনি। ৪১ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়ে ওয়ানডেতে
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ৪ উইকেট নেওয়ার নতুন রেকর্ড গড়েন
নাহিদ রানা। এর আগে ২০০৬ সালে ঘরের মাঠে আব্দুর রাজ্জাকের নেওয়া ৩৬ রানে ৩ উইকেটই ছিল
অজিদের বিপক্ষে সেরা বোলিং ফিগার, যা আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
বিগত সাড়ে তিন থেকে চার বছর ধরে জাতীয়
দলের ওয়ানডে স্কোয়াডের বাইরে থাকা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের জন্য এই ম্যাচটি ছিল একপ্রকার
অগ্নিপরীক্ষা। আর সেই ফেরার মঞ্চকে তিনি রাঙালেন রাজকীয়ভাবে। প্রথমে ব্যাটিং বিপর্যয়ের
মুখে তাওহিদ হৃদয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে ধীরস্থিরভাবে ইনিংসের হাল ধরেন ৩০ বছর বয়সী এই
অলরাউন্ডার। ২১ রানে থাকার সময় লং অফে কুপার কনোলি তাঁর একটি সহজ ক্যাচ মিস করলে জীবন
পান তিনি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাননি।
অজি স্পিনার অ্যাডাম জাম্পাকে রিভার্স
সুইপে টানা দুটি চার এবং ইনসাইড আউট শটে দৃষ্টিনন্দন ছক্কা মেরে মাত্র ৪৯ বলে ওয়ানডে
ক্যারিয়ারের চতুর্থ ফিফটি তুলে নেন। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদকে (১৬ বলে ২০ রান) সঙ্গে
নিয়ে ৪৫ রানের এক ঝড়ো জুটি গড়েন। শেষ ওভারের শেষ বল পর্যন্ত অপরাজিত থেকে মাত্র ৭০
বলে ৭টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে খেলেন ৮৬ রানের এক টর্নেডো ইনিংস। এটি তাঁর ওয়ানডে
ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সংগ্রহ (এর আগে উইন্ডিজের বিপক্ষে করা ২৭ বলে ৫২ রান ছিল তাঁর
ক্যারিয়ার সেরা)। ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও সমান উজ্জ্বল ছিলেন মোসাদ্দেক। ১০ ওভার বোলিং
করে ১টি মেডেনসহ মাত্র ৩৭ রান দিয়ে তুলে নেন কুপার কনোলি (৩৫) ও ম্যাট রেনশর গুরুত্বপূর্ণ
২টি উইকেট। শুধু তাই নয়, মিড অফ থেকে অনেকটা দৌড়ে গিয়ে লং অফে এক অসাধারণ ক্যাচ নিয়ে
অজিদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে টসে হেরে ব্যাটিংয়ে
নেমে ওপেনার সাইফ হাসানের উইকেট দ্রুত হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় উইকেটে পাল্টাক্রমণ
শুরু করেন তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত। মাত্র ৯১ বলে ৯৬ রানের এক কার্যকারী
পার্টনারশিপ গড়েন এই দুই বাঁহাতি। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা তানজিদ তামিম ৪১ বলে ফিফটি
পূর্ণ করে ৪৪ বলে ৫৪ রান (৭ চার, ১ ছক্কা) করে নাথান এলিসের বলে আউট হন। অন্যদিকে শুরুতে
ব্যক্তিগত ৫ রানে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাওয়া শান্ত ফিফটি করেন ৫৭ বলে। তবে ম্যাট
রেনশর বলে ইনসাইড আউট খেলতে গিয়ে ৯টি চার ও ১টি ছক্কায় ৬৭ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি।
এরপর লিটন দাস (৭) ও তাওহিদ হৃদয় (৩১) বড় রান না পেলেও মোসাদ্দেকের ৮৬ রানের ওপর ভর
করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের লড়াকু স্কোর পায় বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে নাথান এলিস ৩টি এবং
রেনশ ও স্কট ২টি করে উইকেট নেন। ২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের সম্মিলিত
বোলিং তোপের মুখে ১৫ রানেই ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলে অলআউট হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে যায়
অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে এর আগে কখনো ৮ উইকেটের বেশি হারায়নি তারা।
এমনকি ২০০৮ সালের ওয়ানডে সিরিজে করা ৫ উইকেটে ১৯৮ রানই ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের
সর্বনিম্ন স্কোর, আজ ১৯১ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে সেই লজ্জার রেকর্ডও নতুন করে লিখল অজিরা।
১৫৬ রানে ৯ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের
জয় যখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার, ঠিক তখনই শেষ উইকেটে ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যাডাম জাম্পা
মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। ৪২.২ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ
যখন ৯ উইকেটে ১৯১ রান, তখন মিরপুরের আকাশে হঠাৎ মেঘের ঘনঘটা এবং তীব্র বজ্রপাত শুরু
হয়। পরবর্তীতে নামে তুমুল বৃষ্টি। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ এক ঘণ্টারও বেশি সময়
খেলা বন্ধ থাকে। অবশেষে আম্পায়ার ও ম্যাচ অফিসিয়ালরা খেলা আর সম্ভব না হওয়ায় ডিএলএস
মেথডে বাংলাদেশকে ৮৬ রানে জয়ী ঘোষণা করেন। শেষ জুটিতে গ্রিন ও জাম্পা ৩৪ বলে ৩৫ রান
করে অবিচ্ছিন্ন থাকলেও ম্যাচের ফলাফলে তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ঘরের মাঠে সেরা তারকাদের ছাড়া খেলতে আসা
অস্ট্রেলিয়ার অহংকার যেভাবে গুঁড়িয়ে দিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা, তা দেশের ক্রিকেট
ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করল। এই স্মরণীয় জয়ের ফলে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-০
ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার একই ভেন্যুতে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে
মুখোমুখি হবে দুই দল। মিরপুরের এই জয় কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং এটি ২১ বছরের এক দীর্ঘস্থায়ী
আক্ষেপ ও অপেক্ষার অবসান।

