Logo

খেলা

‘মিরাকল অব বার্ন’

বিশ্বকাপে জার্মানির রাজকীয় ইতিহাস

Icon

মশিউর রহমান

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ২১:১৮

বিশ্বকাপে জার্মানির রাজকীয় ইতিহাস

টানা চার বছর কোনো ম্যাচে হারেনি হাঙ্গেরি, যাদের ফুটবল দুনিয়া চিনত 'মাইটি ম্যাজিয়ার্স' বা স্বর্ণালী প্রজন্ম নামে। ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই অপরাজেয় হাঙ্গেরির মুখোমুখি হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের মাত্র আট মিনিটের মাথায় দুই-শূন্য গোলে পিছিয়ে পড়েছিল জার্মানরা। যে দলটির বিপক্ষে মাত্র দুই সপ্তাহ আগে গ্রুপ পর্বে আট-তিন গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল, তাদের বিপক্ষে এমন শুরুর পর পশ্চিম জার্মানির পক্ষে বাজি ধরার মতো মানুষ তখন পৃথিবীতে একজনও ছিল না।

কিন্তু সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের ওয়াঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামে সেদিন মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে অলৌকিক কিছুই ঘটেছিল। হাঙ্গেরিকে তিন-দুই গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে পশ্চিম জার্মানি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই প্রত্যাবর্তন ও রূপকথাকে বলা হয় 'দ্য মিরাকল অব বার্ন'। এই এক ম্যাচ কেবল জার্মানির ফুটবল ইতিহাসই বদলে দেয়নি, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি চূর্ণ-বিচূর্ণ জাতিকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিল।

বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব ও নাৎসি জমানার অবসানের পর জার্মানির ফুটবল পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছিল। ১৯৪৪ সালে ক্লাব ফুটবল বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশ ভাগ হয় চার ভাগে, যার ফলে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপেও জার্মানিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৫০ সালের নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরে পশ্চিম জার্মানি। কোচ সেপ হারবার্গার শূন্য থেকে দল গোছাতে শুরু করেন এবং ১৯৫৪ বিশ্বকাপের টিকিট কাটলেও জার্মানিকে নিয়ে কারও কোনো বড় প্রত্যাশা ছিল না।

অন্যদিকে হাঙ্গেরি তখন বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা। পুসকাস, কোকসিস, জিবরদের নিয়ে গড়া হাঙ্গেরি দল ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ সালের ফাইনালের আগ পর্যন্ত টানা ত্রিশ ম্যাচ অপরাজিত ছিল, যার মধ্যে তারা ১৯৫২ সালের অলিম্পিক সোনা জেতে এবং লন্ডনের ওয়েম্বলিতে গিয়ে ইংল্যান্ডকে ছয়-তিন গোলে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।

সুইজারল্যান্ডের সেই ফাইনালে ভারী ও কাদাটে মাঠে ম্যাচের ছয় মিনিটে পুসকাস এবং আট মিনিটে জিবরের গোলে দুই-শূন্যতে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরি। সবাই যখন ধরে নিয়েছে হাঙ্গেরির জয় কেবল সময়ের ব্যাপার, তখনই দৃশ্যপটে হাজির হয় জার্মানদের ইস্পাতকঠিন মানসিকতা। দশ মিনিটে ম্যাক্স মরলকের গোলে ব্যবধান কমায় জার্মানি এবং এর আট মিনিট পর হেলমুট রান কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে পা ছুঁইয়ে সমতা আনেন। এরপর ম্যাচ শেষের মাত্র ছয় মিনিট আগে সেই হেলমুট রানই বক্সের প্রান্ত থেকে বাঁ পায়ের এক দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়িয়ে জার্মানিকে তিন-দুই গোলে এগিয়ে নেন।

ধারাভাষ্যকার হার্বার্ট জিমারম্যান তখন রেডিওতে চিৎকার করে বলছিলেন, জার্মানি তিন-দুই গোলে এগিয়ে, আমাকে পাগল ভাবুন, কিন্তু জার্মানিই জিতছে। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে রচিত হয় ফুটবলের সর্বকালের সেরা রূপকথা। বিখ্যাত জার্মান ঐতিহাসিক জোয়াকিম ফেস্টের মতে, ১৯৫৪ সালের ওই ফাইনালের দিনটিই ছিল আসলে আধুনিক জার্মানির প্রকৃত বা জন্মক্ষণ, কারণ বিশ্বযুদ্ধের গ্লানি আর অপরাধবোধে ভুগতে থাকা একটি জাতি হঠাৎ করেই বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর উপলক্ষ পেয়েছিল।

১৯৫৪ সালের সেই 'বার্নের অলৌকিক' জয়ের পর জার্মানি আর কখনো পেছনে ফিরে তাকায়নি এবং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও ধারাবাহিক দলে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত জার্মানি মোট চারবার বিশ্বকাপ জয় করেছে, যা যথাক্রমে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালে। ব্রাজিলের পাঁচবারের পর ইতালির সাথে যৌথভাবে এটিই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড।

এছাড়া তারা ১৯৬৬, ১৯৮২, ১৯৮৬ এবং ২০০২ সালে রানার্স-আপ হয়েছে, যার ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মোট আটবার ফাইনাল খেলার রেকর্ডটি জার্মানির দখলে। পাশাপাশি ১৯৩৪, ১৯৭০, ২০০৬ এবং ২০১০ সালে তারা তৃতীয় স্থান অধিকার করে। ২০ বার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া জার্মানি দল ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা চারবার সেমিফাইনাল খেলার অনন্য রেকর্ড গড়েছে। বিশ্বকাপে জার্মানির পক্ষে সর্বোচ্চ ১৬টি গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, আর এক বিশ্বকাপে জার্মানদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০টি গোল করার রেকর্ড রয়েছে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে গের্ড ম্যুলারের।

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার গ্যারি লিনেকার জার্মানির এই অপরাজেয় মানসিকতা নিয়ে একবার বলেছিলেন যে, ফুটবল একটি সহজ খেলা, যেখানে ২২ জন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট ধরে একটি বলের পেছনে দৌড়ায় এবং দিনশেষে সবসময় জার্মানরাই জেতে।

১৯৫৪ সালের বার্নের সেই বৃষ্টিভেজা দিনে শুরু হওয়া জার্মান ফুটবল মেশিনের পথচলা আজও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা, যা তাদের এক চিরন্তন ফুটবল পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন