ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল শুধুই কি ৯০ মিনিটের ব্যাকরণ। এমনটি হলে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন সামুরাইদের নীল উৎসবে ভাসত। কিন্তু ফুটবল যে আসলে এক পরম অনিশ্চয়তার থ্রিলার। তারই ফলে ব্রাজিলের জয়গাঁথা লেখা হলো!
ফিফা বিশ্বকাপের বত্রিশের জমজমাট লড়াইয়ে সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় জাপানের মুখামুখি হয়েছিল ব্রাজিল। বাচা-মরার লড়াইয়ে প্রথমার্ধে ছন্দ খুঁজে ফেরা ব্রাজিলকে চমৎকার এক গোলে হতবাক করে দেন জাপানের কাইশু সানো। জবাবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ ধরে রাখলেও, অগোছালো আক্রমণে জাপানিজ রক্ষণ ভাঙতেই পারছিলেন না ভিনিসিউস-কুইয়ারা।
বিরতির পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। মরিয়া হয়ে একটি গোলের দেখা পায় তারা। কিন্তু আরেকটির অপেক্ষা আর ফুরোয় না। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে পেরিয়ে, যোগ করা সময়ও তখন শেষের দিকে। সেই সময়ে দারুণ এক আক্রমণে দলকে উচ্ছ্বাসে ভাসান গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি।
রোমাঞ্চকর ম্যাচটি ২-১ জিতে বিশ্বকাপে টিকে রইল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া দলকে সমতায় ফেরান কাসেমিরো, আর শেষ সময়ে ব্যবধান গড়ে দেন মার্তিনেল্লি।
প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে একেবারেই চেনা যায়নি। বল দখল ও আক্রমণে তাদের আধিপত্য থাকলেও, জাপানের রক্ষণ ভাঙার মতো কিছুই করতে পারেনি তারা। আর, জাপান শুরু থেকেই মূলত ঘর সামলে প্রতি-আক্রমণের কৌশল নেয়। এদিন তাদের সম্মিলিতভাবে রক্ষণ সামলানোর কৌশল ছিল এককথায় দুর্দান্ত।
কিন্তু, নকআউট পর্বের শুরুর গেরো এবারও তাদের কাটল না।
৬৫ শতাংশের বেশি সময় বল দখলে রেখে, গোলের জন্য ১৯টি শট নিয়ে সাতটি লক্ষ্যে রাখতে পারে ব্রাজিল। জাপানের পাঁচ শটের দুটি ছিল লক্ষ্যে।
প্রথম ১০ মিনিটে প্রতিপক্ষের ওপর একচেটিয়া চাপ ধরে রাখে ব্রাজিল। সোজাসুজি আক্রমণ শাণানোর কৌশল নেয় তারা। পরিস্থিতি বুঝে অনেক নিচে নেমে রক্ষণ আরও জমাট করে প্রতিপক্ষকে বিপজ্জনক হতে দেয়নি জাপান।
এরপর ধীরে ধীরে পাল্টা আক্রমণে মনোযোগ দেয় এশিয়ার দলটি। তারাও অবশ্য প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের পরীক্ষা নেওয়ার মতো কিছু করতে পারছিল না। প্রথম ২৫ মিনিটে গোলের জন্য ব্রাজিল চারটি ও জাপান একটি শট নিতে পারে, কোনোটিই ছিল না লক্ষ্যে।
হাইড্রেশন ব্রেক থেকে ফেরার পরই লড়াইয়ের মোড় ঘুরে যায়। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের একটি ভুল পাস ধরে, গতিতে কাসেমিরোকে পরাস্ত করে ছুটে যান কাইশু সানো, এরপর ডি-বক্সের বেশ খানিকটা বাইরে থেকে দারুণ এক শটে দলকে এগিয়ে নেন এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার।
জাতীয় দলের হয়ে এই প্রথম গোল পেলেন সানো, সেটাও সবচেয়ে বড় মঞ্চে। ম্যাচে এটাই লক্ষ্যে প্রথম শট।
গোল হজমের ধাক্কাও সেলেসাওদের চাঙ্গা করতে পারেনি, প্রথমার্ধে তাদের প্রতিটি আক্রমণই ছিল ধারহীন। অধিকাংশ সময় পজেশন রেখে, প্রতিপক্ষের বক্সের আশেপাশে বল রাখতে পারলেও, জাপানের জমাট রক্ষণ ভাঙার মতো সৃজনশীলতা দেখাতে পারেননি ভিনিসিউস জুনিয়র, মাতেউস কুইয়া, কাসেমিরোরা।
আক্রমণে গতি আনতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই লুকাস পাকেতাকে তুলে এন্দ্রিককে নামান আনচেলত্তি। এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে ডান দিক দিয়ে একটি আক্রমণ শাণান এই তরুণ ফরোয়ার্ড, প্রথমার্ধে এমন কিছু একবারও দেখা যায়নি।
৫৫তম মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোলও পেতে পারতো ব্রাজিল। কিন্তু ছয় গজ বক্সে থেকে কাসেমিরোর হেড গোলরক্ষকের মাথায় লাগার পর, গোললাইনে ডিফেন্ডার তোমিয়াসুর শরীরে লাগে এবং আরেক ডিফেন্ডার ইতো দ্রুত দলকে বিপদমুক্ত করেন।
পরের মিনিটেই অবশ্য সেই হতাশা মুছে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। ভিনিসিউসের কাটব্যাক ডি-বক্সের বাইরে পেয়ে ছয় গজ বক্সে দূরের পোস্টে কাসেমিরোর উদ্দেশে মাপা ক্রস বাড়ান গাব্রিয়েল মাগালাইস এবং এবার আর ব্যর্থ হননি কাসেমিরো, হেডেই দলে স্বস্তি ফেরান অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার।
ভাগ্য সহায় হলে ৬০তম মিনিটে এগিয়েও যেতে পারতো ব্রাজিল। কিন্তু গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে চার গোল করা ভিনিসিউসের শট ঝাঁপিয়ে পড়া গোলরক্ষকের হাতে লেগে, দূরের পোস্টে বাধা পায়।
এগিয়ে যাওয়ার পর, জাপান একদম রক্ষণে নেমে গিয়েছিল, স্কোরলাইনে সমতায় ফেরার পর আবার তারা আক্রমণে মনোযোগ দেয়।
সময় গড়াতে থাকে, স্কোরলাইনে পরিবর্তন আসছিল না। ঠান্ডা মাথায় ঘর সামলানোর কাজ করে যাচ্ছিল জাপান, তাদের রক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছিল ব্রাজিলের আক্রমণ।
দুই কোচই হয়তো তখন অতিরিক্ত সময়ের পরিকল্পনা সাজানো শুরু করেছিলেন। সেই অন্তিম সময়ে ব্যবধান গড়ে দেন মার্তিনেল্লি। ছয় মিনিট যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে, ডান দিক দিয়ে ওঠা আক্রমণে কয়েক সতীর্থের পা ঘুরে, ব্রুনো গিমারেসের পাস বক্সে দুই ডিফেন্ডারের মাঝে পেয়ে কোনাকুনি শটে গোলটি করেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড।
বিশ্বকাপে এই প্রথম জালের দেখা পেলেন মার্তিনেল্লি। জাতীয় দলের হয়ে ২৫ ম্যাচে তার গোল হলো পাঁচটি।
তাতেই আরও একবার কপাল পুড়ল জাপানের। এই নিয়ে পাঁচবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিবারই তারা ছিটকে গেল শুরুতেই; আগের চারবার শেষ ষোলোয়, এবার শেষ বত্রিশে। ব্রাজিল এবার আইভরিকোস্ট বা নরওয়ে অপেক্ষা করবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

