ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রূপকথার সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। আগামী ১৯ জুলাই আমেরিকার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। তবে এই ফাইনাল কেবল দুটি দলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রাজকীয় ‘ব্যাটন বদল’ বা মশাল হস্তান্তরের রাত। যেখানে আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ৩৯ বছর বয়সী ‘ফুটবল ঈশ্বর’ লিওনেল মেসির মুখোমুখি হচ্ছেন তার সিংহাসনের যোগ্য উত্তরসূরি, ১৯ বছর বয়সী স্প্যানিশ বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল।
বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের কাছে এই ম্যাচটি
হতে যাচ্ছে এক মহাকাব্যিক সমাপ্তি। একদিকে আন্তর্জাতিক জার্সিতে ফুটবল সম্রাট মেসির
সম্ভাব্য শেষ বিদায়, অন্যদিকে ফুটবলের নতুন রাজপুত্র ইয়ামালের রাজ্যাভিষেক। মাঠের লড়াইয়ে
এটিই হতে যাচ্ছে মেসি ও ইয়ামালের প্রথম দ্বৈরথ। তবে এই দুই মহাতারকার নিয়তির লিখন শুরু
হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে, যা কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ২০০৭ সালে ইউনিসেফ
ও বার্সেলোনা ফাউন্ডেশনের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ক্যাম্প ন্যু-তে একটি ফটোশুট
হয়েছিল। সেখানে ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি প্লাস্টিকের টবে জল ভর্তি করে মাত্র সাত মাস
বয়সী এক কোঁকড়া চুলের শিশুকে স্নান করাচ্ছিলেন। সেই ফ্রেমে বন্দি থাকা শিশুটিই আর কেউ
নন, আজকের স্প্যানিশ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল! ভক্তরা মজার ছলে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ইয়ামালের
‘ফুটবল বাপ্তিস্ম’
বা মেসির আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন, যার পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে এই ফাইনাল মঞ্চে।
বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী ‘লা মাসিয়া’ একাডেমি থেকে উঠে আসা ইয়ামালের
সঙ্গে মেসির ফুটবলীয় মিল রূপকথার মতোই। মেসির মতোই বাঁ পায়ের জাদুকর এবং রাইট উইঙ্গার
হিসেবে খেলা ইয়ামাল ২০২৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বার্সার মূল দলে ডেবিউ করে ইতিহাস
গড়েন। আর গত বছর ১৮ বছর বয়সে পদার্পণের পর বার্সেলোনায় মেসির ফেলে যাওয়া আইকনিক ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি এখন তার গায়ে। গত মরশুমে
১৬টি গোল ও লা লিগায় সর্বোচ্চ ১১টি অ্যাসিস্ট করে বার্সাকে টানা দ্বিতীয়বার লিগ শিরোপা
জেতাতে মূল ভূমিকা রাখেন তিনি। মাঠের ভেতর বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ডিফেন্ডারদের বোকা বানানোর
ড্রিবলিং শৈলী এবং বারুদ ঠাসা পরিস্থিতিতেও মেসির মতো এক অদ্ভুত শীতলতা ও ইয়ামালকে
ফুটবল বিশ্বের ভবিষ্যৎ মহাতারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এবারের বিশ্বকাপে চোটের কারণে শতভাগ ফিট
না থাকলেও স্পেনের ফাইনালের যাত্রায় ইয়ামাল ছিলেন অনন্য। গত মঙ্গলবার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে
সেমিফাইনালে ২-০ ব্যবস্থার জয়ে পেনাল্টি আদায়সহ পুরো ম্যাচে ফরাসি ডিফেন্সকে নাচিয়েছেন
তিনি। তবে নিজের অর্জনের দিক থেকে মেসিকেও এক জায়গায় ছাড়িয়ে গেছেন এই তরুণ। মেসি যেখানে
প্রথমবার ২০১৪ সালে ২৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিলেন, সেখানে ইয়ামাল মাত্র
১৯ বছর বয়সেই বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চে পা রাখলেন। যদিও চলতি বিশ্বকাপে ৮টি গোল ও ৪টি
অ্যাসিস্ট নিয়ে আসরের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন ৩৯ বছর বয়সী বুড়ো
মেসি।
ইয়ামালকে নিয়ে স্বয়ং লিওনেল মেসিও গত মে
মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "নতুন প্রজন্মের অনেক ভালো ফুটবলার আসছে, তবে বয়স
এবং বর্তমান পারফরম্যান্সের বিচারে আমি যদি কাউকে বেছে নিই, তবে সে লামিন। আমার কোনো
সন্দেহ নেই যে ও-ই সেরা।" অন্যদিকে ইয়ামালও মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন,
"আমার লক্ষ্য কারও সঙ্গে তুলনায় যাওয়া নয়, বরং মেসি-রোনালদোদের পাশে নিজের নামটি
প্রতিষ্ঠিত করা।" আগামী রবিবার নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বের কোটি
চোখ থাকবে এই জাদুকরী লড়াইয়ের দিকে—মেসি কি তার ক্যারিয়ারের রূপকথা জয় দিয়ে শেষ করবেন,
নাকি ফুটবলের নতুন রাজা হিসেবে লামিন ইয়ামাল নিজের সাম্রাজ্য ঘোষণা করবেন!
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

