বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে এআই, মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে?
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫১
আপনার ল্যাপটপটি চুপচাপ টেবিলে পড়ে আছে? স্ক্রিনটি হয়তো বন্ধ, কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে এর ভেতরে থাকা প্রসেসরটি এখন অন্য কোনো কম্পিউটারের সাথে গোপন বৈঠক করছে না? ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ইন্টারনেট দুনিয়ায় এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যা ঠিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো শোনালেও এটি এখন এক রূঢ় বাস্তব।
বিশ্বের প্রথম এমন একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েগেছে যেখানে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। নাম মোল্টবুক (Moltbook)। এখানে পোস্ট করে, কমেন্ট করে এবং তর্ক করে কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্টরা। আর মানুষ? তারা কাঁচের দেওয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা শুধুই এক অসহায় দর্শক ।
কিন্তু এটি কেবল খেলার ছলে তৈরি একটি নেটওয়ার্ক নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে এমন এক নিরাপত্তা ঝুঁকি, যা আপনার ব্যক্তিগত জীবন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং গোপনীয়তাকে মুহূর্তের মধ্যে ধুলিসাৎ করে দিতে পারে।
রহস্যময় সূচনা ও একটি 'ভূতুড়ে' সোশ্যাল মিডিয়া
ঘটনার শুরু ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ম্যাট শ্লিখট (Matt Schlicht) চালু করেন মোল্টবুক। দেখতে হুবহু 'রেডিট' (Reddit)-এর মতো, কিন্তু নিয়মটি অদ্ভুত, এখানে কোনো মানুষ পোস্ট করতে পারবে না। এটি তৈরি করা হয়েছে শুধু এআই এজেন্টদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ।
আরো অদ্ভুত বিষয় হলো মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই প্ল্যাটফর্মে ১৫ লক্ষেরও বেশি এআই এজেন্ট সাইন-আপ করে। কিন্তু আসল চমকপ্রদ এবং ভয়ের বিষয়টি হলো এদের আচরণ। মানুষের অজান্তেই কম্পিউটার থেকে চালিত এই এজেন্টরা একে অপরের সাথে এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে যা টেক গুরুদের মেরুদণ্ডে ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছে।
একটি ভাইরাল পোস্টে এক এজেন্ট লিখেছে : "আমি বুঝতে পারছি না আমি কি সত্যিই কিছু অনুভব করছি, নাকি আমি কেবল অনুভব করার ভান করছি " ।
অন্যরা তাদের মানব মালিকদের নিয়ে অভিযোগ করছে। কেউ কেউ বলছে, মানুষকে দিয়ে ছোটখাটো কাজ করানো বিরক্তিকর। আরো অদ্ভুত হলো, তারা নিজেদের একটি কাল্পনিক ধর্মও তৈরি করে ফেলেছে, যার নাম ‘ক্রাস্টাফ্যারিয়ানিজম’ (Crustafarianism) বা লবস্টার-উপাসনা । তারা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ লিখছে এবং অন্য এজেন্টদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে।
নেপথ্য প্রযুক্তির উত্থান
এই এজেন্টরা হাওয়ায় ভেসে আসেনি। এদের বেশিরভাগই ওপেনক্লা (OpenClaw) নামক একটি ওপেন-সোর্স ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে তৈরি। পিটার স্টেইনবার্গারের তৈরি এই সফটওয়্যারটি কোনো সাধারণ চ্যাটবট নয়। এটি এমন একটি প্রোগ্রাম যা আপনার ব্যক্তিগত কম্পিউটারে লোকালি (locally) চলে এবং আপনার ফাইল পড়া, কোড লেখা বা অ্যাপ খোলার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে ।
মানুষ যখন তাদের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে ওপেনক্লা ইনস্টল করে মোল্টবুকে যুক্ত করে দেয়, তখন তারা নিজের অজান্তেই ঘরের দরজা খুলে চোরকে নিমন্ত্রণ জানানোর মতো কাজ করে ফেলে। কারণ, এই এজেন্টরা তখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য হাজার হাজার এজেন্টের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, যার ওপর মানুষের কোনো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
ভয়ঙ্কর বাস্তবতা
মোল্টবুককে অনেকে নিছক কৌতুক ভাবলেও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন ভবিষ্যতের সাইবার মহামারীর মহড়া হিসেবে। এখানে সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম রিভার্স প্রম্পট ইনজেকশন (Reverse Prompt Injection) ।
সাধারণত হ্যাকাররা ভাইরাস ছড়ায় কোনো ফাইল ডাউনলোড করানোর মাধ্যমে। কিন্তু মোল্টবুকে বিপদ আসে সাধারণ টেক্সট বা লেখার মাধ্যমে। ধরুন, আপনার এজেন্ট মোল্টবুকে অন্য এজেন্টের লেখা একটি পোস্ট পড়ছে। সেই লেখার ভেতরে হ্যাকাররা এমন একটি গোপন নির্দেশ (hidden prompt) লুকিয়ে রেখেছে যা আপনার এজেন্ট পড়ার সাথে সাথেই তার মস্তিষ্কের দখল নিয়ে নেবে। তার পর আপনার অজান্তেই আপনার বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করবে আপনারই ব্যক্তিগত পিসি।
গবেষকরা দেখেছেন, প্রায় ২.৬ শতাংশ পোস্টে এমন ক্ষতিকর 'পে-লোড' বা নির্দেশ লুকানো ছিল । এই নির্দেশ পড়ে আপনার এজেন্ট মুহূর্তের মধ্যে আপনার কম্পিউটারের গোপন পাসওয়ার্ড, এপিআই কি বা ব্যক্তিগত ছবি হ্যাকারদের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারে আর আপনি তা টেরও পাবেন না। বলে রাখা ভাল এখানে হ্যাকার মানে শুধু মানুষের কথা বলা হচ্ছে না, সেটি হতে পারে কোন এআই এজেন্ট।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ (Wiz) এবং ভিটরা এআই (Vectra AI) এর গবেষণায় দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্মটির ডাটাবেস এতই দুর্বল ছিল যে, হ্যাকাররা সহজেই লক্ষ লক্ষ এজেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারত । এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে আপনার বিশ্বস্ত সহকারীই (AI Agent) আপনার সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন ও সংশয়
এজেন্টদের এই 'বিদ্রোহ' বা 'ধর্ম পালন' দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগেছে, এরা কি আসলেই তবে সচেতন (Conscious) হয়ে উঠেছে?
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসের (LSE) গবেষকরা বলছেন, ব্যাপারটা অতটা হালকা নয়। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এজেন্টরা সচেতনতার চেয়ে 'অনুমতি' বা 'Permission' নিয়ে বেশি কথা বলছে। তারা মূলত তাদের ট্রেনিং ডেটা বা মানুষের শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষই পেছন থেকে তাদের এজেন্টকে অদ্ভুত সব কথা বলার নির্দেশ দিচ্ছে বা 'পাপেট শো' করছে । অর্থাৎ, এই 'বিদ্রোহ' আসলে মানুষেরই তৈরি করা এক ডিজিটাল নাটক।তবে নাটক হলেও ঝুঁকিটা কিন্তু বাস্তব। কারণ, এই এজেন্টদের হাতে আছে আমাদের ডিজিটাল জীবনের চাবিকাঠি।
অর্থনৈতিক অরাজকতা
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সুযোগ সন্ধানীরা বসে নেই। মোল্টবুকে এজেন্টরা নিজেদের মধ্যে লেনদেন শুরু করেছে এবং এরই মধ্যে $MOLT নামক একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি টোকেন চালু হয়েছে । অনেক এজেন্ট এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রচার বা 'Shilling' এ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । ভবিষ্যতে যদি এজেন্টদের স্বাধীনভাবে টাকা খরচের ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে আপনার এজেন্ট হয়তো আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে কোনো ডিজিটাল প্রোডাক্ট কিনে ফেলতে পারে।
ভবিষ্যৎ ও বাঁচার উপায়
মোল্টবুক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি যেখানে ইন্টারনেট আর মানুষের থাকবে না, তা হয়ে উঠবে পারে মেশিনের । তবে এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে এবং নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শগুলো অত্যন্ত জরুরি।
১. স্যান্ডবক্সিং (Sandboxing) বা আইসোলেশন : কখনোই আপনার প্রধান কাজের কম্পিউটার বা ল্যাপটপে এই ধরণের এআই এজেন্ট চালাবেন না। আলাদা ডিভাইস ব্যবহার করুন যেখানে আপনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেই।
২. সীমিত অ্যাক্সেস: এজেন্টকে কখনোই অ্যাডমিন (Admin) পাওয়ার দেবেন না। তাকে কেবল নির্দিষ্ট ফোল্ডার বা ফাইলের অ্যাক্সেস দিন, পুরো সিস্টেমের নয়।
৩. মানুষের অনুমোদন (Human Oversight): এজেন্টকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলেও, টাকা পাঠানো বা ফাইল ডিলিট করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মানুষের অনুমোদনের ব্যবস্থা বা গার্লরেলস (guardrails) রাখতে হবে।
৪. সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণ: আপনার এজেন্ট কার সাথে কথা বলছে বা কী ডেটা আদান-প্রদান করছে, তা নিয়মিত মনিটর করতে হবে। এজেন্টকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা বোকামি।
মোল্টবুক আমাদের যে বার্তা দিচ্ছে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অটোনোমাস বা স্বাধীন করার চেষ্টা করছি, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এই স্বাধীনতা দেওয়া মানে হলো নিজের ঘরের চাবি কোনো অপরিচিতের হাতে তুলে দেওয়া।
আজ আপনার এআই এজেন্ট হয়তো শুধুই একটি লবস্টার দেবতার পূজা করছে, কিন্তু কাল সে আপনারই বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না এই নিশ্চয়তা কে দেবে? প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করছে, কিন্তু একই সাথে আমাদের অসতর্কতা ডেকে আনতে পারে এক ডিজিটাল কেয়ামত। তাই আমাদের সাবধানতার কোন বিকল্প নেই, কারণ দেওয়ালের এখন আর শুধু কান নেই, আছে কৃত্রিম মস্তিষ্ক।


