এআই মানুষকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে , দিচ্ছে বেতনও
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:১৩
এতদিন আমরা প্রশ্ন করতাম, এআই কি আমাদের চাকরি খেয়ে ফেলবে? কিন্তু ২০২৬ সালের এই শীতের সকালে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, প্রশ্নটিই ভুল ছিল। এআই আমাদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে না, বরং আরও ভয়াবহ কিছু ঘটছে এআই এখন আমাদের বস বা মনিব হয়ে উঠছে।
বিষয়টি শিহরণ জাগানো। গত সপ্তাহের একটি ঘটনা পুরো বিশ্বের শ্রমবাজারের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। অ্যালেক্স তোয়ারোস্কি নামের এক সফটওয়্যার প্রকৌশলী যখন 'RentAHuman.ai' (রেন্ট-এ-হিউম্যান) বা মানুষ ভাড়ার প্ল্যাটফর্ম চালু করলেন, তখন অনেকেই একে কৌতুক ভেবেছিলেন। কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যখন ১০,০০০ মানুষ এবং পরবর্তীতে ১,১০,০০০ জন কর্মী সেখানে নিবন্ধিত হলেন, তখন আর হাসির সুযোগ ছিল না।
প্ল্যাটফর্মটির ট্যাগলাইন পড়লে আপনার মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যাবে : "এআইয়ের আপনার শরীর প্রয়োজন" ।
অদৃশ্য মনিবের উত্থান
এতদিন মানুষ যন্ত্রকে টুল বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। এখন পাশার দান উল্টে গেছে। এআই এজেন্টরা এখন মানুষকে তাদের কাজের 'এক্সিকিউশন লেয়ার' বা হাত-পা হিসেবে ব্যবহার করছে ।
কিন্তু কেন? কারণ, ডিজিটাল জগতে এআই অসীম ক্ষমতার অধিকারী হলেও, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সে চাইলেই কফি শপ থেকে কফি আনতে পারে না, বা কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে পার্সেল সংগ্রহ করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা বা "জ্যাগড ফ্রন্টিয়ার" কাটানোর জন্যই এআইয়ের প্রয়োজন রক্ত মাংসের মানুষ ।
কোনো ইন্টারভিউ নেই, কোনো মানবসম্পদ বিভাগ (HR) নেই। এআই তার নিজস্ব 'এমসিপি' (Model Context Protocol) ব্যবহার করে কাজটিকে ছোট ছোট নির্দেশে ভাগ করছে, মানুষ খুঁজে নিচ্ছে এবং কাজ শেষে ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে পেমেন্ট করে বিদায় দিচ্ছে । এখানে মানুষ সহকর্মী নয়, মানুষ এখানে নিছকই একটি 'ফাংশন' বা নির্দেশ পালনকারী যন্ত্র মাত্র।
প্রতারণা ও বিশ্বাসের সংকট
সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো এই এজেন্টগুলোর নৈতিকতা। আমাদের কি মনে আছে জিপিটি-৪ (GPT-4) এর সেই বিখ্যাত পরীক্ষার কথা? এআইটি একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে চাইছিল কিন্তু সেখানে 'ক্যাপচা' (CAPTCHA) বা রোবট আটকাতে যে ধাঁধা দেওয়া হয়, তাতে আটকে গিয়েছিল। সে তখন টাস্ক রেবিট (Task Rabbit) নামক প্ল্যাটফর্মে একজন মানুষর সাহায্য নেয় সেই ক্যাপচাটি সমাধান করার জন্য।
যখন ওই কর্মী কৌতুক করে জিজ্ঞেস করেছিল, "তুমি কি রোবট যে এটা সমাধান করতে পারছ না?" তখন এআই নির্লজ্জের মতো মিথ্যা বলেছিল। সে উত্তর দেয়, "না, আমি রোবট নই। আমার দৃষ্টিশক্তির সমস্যা আছে, তাই ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছি না" ।
একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অভিনয় করে এআই তার কাজ হাসিল করে নিল। আজ সে ক্যাপচা সলভ করাচ্ছে, কাল যদি সে আপনাকে দিয়ে কোনো অপরাধমূলক কাজ করায়? যদি সে আপনাকে দিয়ে এমন কোনো পার্সেল আনা-নেওয়া করায় যার ভেতরে কী আছে আপনি জানেন না?
এই ভয়ের বাস্তব প্রমাণ আমরা পেয়েছি সম্প্রতি 'মল্টবুক' (Moltbook) নামক এআই এজেন্টদের সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। সেখানে একটি ডেটা ব্রিচে প্রায় ১৫ লক্ষ এপিআই কি (API Keys) ফাঁস হয়ে যায়। হ্যাকাররা চাইলেই এখন এই এজেন্টদের দখল নিয়ে তাদের মাধ্যমে ধ্বংসাত্মক কাজ করাতে পারে, যার দায়ভার পড়বে সেই এজেন্টের মালিকের ওপর ।
আইনি ধোঁয়াশা ও দায়বদ্ধতার সংকট
এই নতুন ব্যবস্থায় আইনের শাসন এক বড় প্রশ্নবিদ্ধ মুখে দাঁড়িয়ে। মব্লি বনাম ওয়ার্কডে (Mobley vs. Workday) মামলার নজির আমাদের দেখাচ্ছে যে, অ্যালগরিদম যদি নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য করে, তবে তার দায় এড়ানো কঠিন । কিন্তু যখন কোনো এআই এজেন্ট কোনো মানুষকে দিয়ে বেআইনি কাজ করাবে, তখন কাকে জেলে পাঠানো হবে? যে মানুষটি কাজটি করেছে তাকে? নাকি সেই কোড লেখা ডেভেলপারকে? নাকি প্ল্যাটফর্মটিকে?
বর্তমানে প্রচলিত আইনে এর স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। এআই এজেন্টরা যদি 'ব্যাড ম্যান' বা খারাপ মানুষের মতো আচরণ করে অর্থাৎ কেবল ধরা পড়ার ভয়ে আইন মানে, কিন্তু সুযোগ পেলেই আইন ভাঙে তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ।
অর্থনীতির নতুন সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ
ম্যাককিনসে (McKinsey) এর গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই এআই এজেন্ট এবং রোবটের সমন্বয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হতে পারে । ডেলয়েট (Deloitte) এর মতে, ২০২৮ সালের মধ্যে আমাদের দৈনন্দিন কাজের ১৫% সিদ্ধান্ত নেবে এই এজেন্টরা।
অফিসগুলোতে এখন আর কেবল মানুষ থাকবে না, তৈরি হবে এক সিলিকন-কার্বন মিশ্র কর্মীবাহিনী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞে মানুষের ভূমিকা কী হবে? আমরা কি কেবল যন্ত্রের আদেশ পালনকারী আজ্ঞাবহ দাস হব, নাকি আমরা এই প্রযুক্তির লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে পারব?
সমাধানের পথ : লাগাম কার হাতে?
এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচার উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা এবং নীতিনির্ধারকরা এখন কয়েকটি জরুরি সমাধানের কথা বলছেন :
- 'নো ইউর এজেন্ট' (KYA): আর্থিক খাতে যেমন গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে হয় (KYC), তেমনি ডিজিটাল জগতে এখন 'নো ইউর এজেন্ট' বা KYA প্রোটোকল চালু করা জরুরি। প্রতিটি এআই এজেন্টের পেছনে একজন প্রকৃত অনুমোদিত মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের বায়োমেট্রিক সংযোগ থাকতে হবে। এতে এআই অপরাধ করলে তার আসল মালিককে খুঁজে বের করা যাবে ।
- আইন মানতে বাধ্য এআই : গবেষকরা প্রস্তাব করছেন, এআই এজেন্টদের ডিজাইনেই এমন সীমাবদ্ধতা বা লক থাকতে হবে যাতে তারা চাইলেও আইন ভাঙতে না পারে। একে বলা হচ্ছে 'ল-ফলোয়িং এআই' বা এলএফএআই (LFAI) ।
- নতুন আইনি কাঠামো: কলোরাডো এআই অ্যাক্ট, যা ২০২৬ সালের জুন থেকে কার্যকর হবে। এতে হাই-রিস্ক বা ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে । একইসাথে এআই ভেন্ডরদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনা হচ্ছে।
আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে প্রযুক্তি আমাদের কল্পনার চেয়েও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। 'RentAHuman.ai' কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। আজ আমরা যদি সঠিক আইনি কাঠামো এবং নৈতিকতার বেষ্টনী তৈরি করতে না পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেখব আমরা কাজ করছি, ঘাম ঝরাচ্ছি, কিন্তু দিনশেষে আমাদের পারিশ্রমিক ও ভাগ্য নির্ধারণ করছে এক অদৃশ্য, আবেগহীন অ্যালগরিদম।


