চ্যাটজিপিটি এখন অতীত? 'মোল্টবট’ এআই দুনিয়ার নতুন বিস্ময়
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৬
এতদিন আমরা এআই-এর সাথে শুধু গল্প করেছি। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইকে বলেছি কবিতা লিখতে, কোড সলভ করতে কিংবা ইমেইল ড্রাফট করতে। কিন্তু ভাবুন তো, আপনার এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট যদি শুধু চ্যাটবক্সে বন্দি না থেকে আপনার পুরো কম্পিউটারটাই নিয়ন্ত্রণ করে? আপনি অফিসে বসে হোয়াটসঅ্যাপে হুকুম দিলেন, আর বাড়িতে থাকা আপনার পিসি নিজে থেকে ব্রাউজার ওপেন করে, ভিডিও এডিট করে আপনাকে মেইল করে দিল!
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনাচ্ছে? কল্পকাহিনি এখন বাস্তব। টেক দুনিয়ায় এখন ঝড় তুলেছে নতুন এক ওপেন সোর্স টুল মোল্টবট (Moltbot), যা আগে ক্লডবট (Clawdbot) নামে পরিচিত ছিল।
এটি সাধারণ চ্যাটবট নয়, এ আপনার ডিজিটাল কর্মচারী
সাধারণ এআই টুলগুলোর সীমাবদ্ধতা হলো, এরা কেবল টেক্সট বা ছবি জেনারেট করতে পারে। কিন্তু মোল্টবট গেম চেঞ্জার। এটি আপনার কম্পিউটারে ইনস্টল হওয়ার পর আপনার মাউস, কিবোর্ড, ব্রাউজার, ফাইল সিস্টেম সবকিছুর দখল নিতে পারে। সহজ কথায়, এটি আপনার কম্পিউটারের ভেতরে বসবাস করা এক অদৃশ্য রোবট।
কেন মোল্টবট নিয়ে এত মাতামাতি?
হোয়াটসঅ্যাপ যখন রিমোট কন্ট্রোল
সবচেয়ে চমকপ্রদ ফিচার হলো এর মেসেজিং ইন্টিগ্রেশন। মোল্টবট চালানোর জন্য আপনাকে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে হবে না। আপনি হয়তো ঢাকার জ্যামে বসে বা রিকশায় করে বাড়ি ফিরছেন, পকেটের ফোন বের করে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে লিখলেন "আমার পিসিতে থাকা গত সপ্তাহের ট্যুরের ভিডিওগুলো এডিট করে ফেলো।"
ব্যাস, আপনার বাসার কম্পিউটার নিজে থেকে চালু হয়ে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার খুলবে, কাজ করবে এবং কাজ শেষে আপনাকে জানাবে। এটি স্ল্যাক, ডিসকর্ড বা সিগন্যাল দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
শক্তিশালী মেমোরি
চ্যাটজিপিটির বড় সমস্যা হলো, নতুন সেশন শুরু করলেই সে পেছনের কথা ভুলে যায়। কিন্তু মোল্টবট আলাদা। এর আছে ‘পারসিজটেন্ট মেমোরি’ (Persistent Memory)। আপনি ১০ দিন আগে একে কী করতে বলেছিলেন, আপনার কাজের ধরন কেমন, কোন ফোল্ডারে আপনি কী রাখেন সব এর মনে থাকে। এটি আপনার কম্পিউটারের লোকাল ফাইলে সব স্মৃতি জমা রাখে, তাই প্রতিবার নতুন করে শেখানোর ঝামেলা নেই।
ওপেন সোর্স এবং আনলিমিটেড পাওয়ার
এটি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির প্রোডাক্ট নয়, এটি সম্পূর্ণ ওপেন সোর্স। অর্থাৎ, গিটহাব থেকে নামিয়ে যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারেন একদম ফ্রিতে। তবে এর মস্তিষ্ক হিসেবে আপনি চাইলে ওপেন এআই (GPT), ক্লড (Claude) বা গুগলের জেমিনাই (Gemini)-এর এপিআই কানেক্ট করে দিতে পারেন।
কী কী করতে পারে মোল্টবট
- ওয়েব অটোমেশন : নিজে ওয়েবসাইট ভিজিট করা, ফর্ম পূরণ করা, বা নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে বের করা।
- কোডিং ও ডিবাগিং : টার্মিনাল ওপেন করে সফটওয়্যার ইনস্টল করা বা কোড রান করা।
- কন্টেন্ট ক্রিয়েশন : স্ক্রিপ্ট লেখা থেকে শুরু করে পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড বানানো।
- স্মার্ট হোম কন্ট্রোল : আপনার ঘরের স্মার্ট লাইট বা এসি নিয়ন্ত্রণ (সঠিক কনফিগারেশনে)।
মুদ্রার উল্টো পিঠ : প্রযুক্তির আশীর্বাদ নাকি ঝুঁকি?
সব চমকের পেছনেই একটা ‘কিন্তু’ থাকে। মোল্টবট যেহেতু আপনার কম্পিউটারের ফুল অ্যাক্সেস বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাই এর নিরাপত্তা ঝুঁকিও মারাত্মক।
টেক বিশেষজ্ঞদের মতে, আপনার মেইন পিসি বা যেখানে ব্যাংকিং পাসওয়ার্ড আছে, সেখানে এটি ব্যবহার করা বোকামি। কারণ, ভুল কমান্ড দিলে বা হ্যাক হলে এটি আপনার পুরো সিস্টেম তছনছ করে দিতে পারে। তাই অভিজ্ঞরা বলছেন, এটি ব্যবহারের জন্য আলাদা একটি ল্যাপটপ বা ‘স্যান্ডবক্স’ এনভায়রনমেন্ট ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মোল্টবট বা ক্লডবট প্রমাণ করে দিল যে, আমরা এআই এজেন্টের যুগে প্রবেশ করেছি। এতদিন আমরা এআই ব্যবহার করতাম, এখন এআই আমাদের হয়ে কম্পিউটার ব্যবহার করবে। তবে এই অসীম ক্ষমতা আপনি কীভাবে সামলাবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রযুক্তিপেমীদের জন্য পরামর্শ এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে এর ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। তবে এ কথা মানতেই হবে, মোল্টবট আমাদের দেখিয়ে দিল ভবিষ্যতের কম্পিউটার ব্যবহারের ধরনটা ঠিক কেমন হতে যাচ্ছে।


