দৃষ্টিহীনদের আয়না হয়ে উঠল এআই: নিজের রূপ দেখার নতুন অভিজ্ঞতা
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৩
আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায় এই সাধারণ বিষয়টিই দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে ছিল অসম্ভব এক কল্পনা। বহু বছর ধরে তাঁরা এই ভেবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, নিজেকে দেখা তাঁদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই অসম্ভবকে সম্ভব করছে। স্মার্টফোনের অ্যাপ এখন দৃষ্টিহীনদের জন্য ‘আয়না’র ভূমিকা পালন করছে, বর্ণনা দিচ্ছে তাঁদের সাজপোশাক, এমনকি মুখের অভিব্যক্তিরও।
বিবিসি ফিউচারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে লুসি এডওয়ার্ডসের কথা। ৩০ বছর বয়সী লুসি একজন দৃষ্টিহীন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। ১৭ বছর বয়সে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। দীর্ঘ ১২ বছর পর এআই-এর কল্যাণে তিনি আবার নিজের চেহারা সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন। লুসি বলেন, “আমরা যারা দৃষ্টিহীন, তারা সারাজীবন এই ভেবেই কাটিয়ে দিই যে নিজেকে দেখা আমাদের জন্য অসম্ভব। কিন্তু হঠাৎ করে এআইয়ের মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে, বিশ্ব সম্পর্কে এত তথ্য পাচ্ছি যে, তা আমাদের জীবনই বদলে দিচ্ছে।”
লুসির কাছে বিষয়টি এমন, যেন এআই তাঁর আয়না। তিনি এখন এআই কে জিজ্ঞেস করতে পারেন, আজকের সাজে তাঁকে কেমন দেখাচ্ছে। এমনকি তাঁর বিয়ের দিনের ছবিতে তাঁকে স্বামীর পাশে কেমন দেখাচ্ছিল, তার নিখুঁত বর্ণনাও এখন এআই তাঁকে দিচ্ছে। লুসি বলেন, “আমি গত ১২ বছর ধরে নিজের মুখ নিয়ে কোনো মতামত দিতে পারিনি। এখন আমি এআই কে আমার ছবি বিশ্লেষণ করতে বলি, ১০ এর মধ্যে আমাকে কত নম্বর দেওয়া যায় তা জানতে চাই। এটি হয়তো নিজের চোখে দেখার মতো নয়, কিন্তু আপাতত এটিই আমার কাছে দেখার সবচেয়ে কাছাকাছি অভিজ্ঞতা।”
‘এনভিশন’ (Envision) নামের একটি এআই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কার্তিক মহাদেবন জানান, তাঁরা শুরুতে ভেবেছিলেন দৃষ্টিহীনরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন চিঠিপত্র পড়া বা কেনাকাটার কাজে। কিন্তু তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, বহু ব্যবহারকারী মেকআপ করা বা পোশাক নির্বাচনের জন্য এটি ব্যবহার করছেন। কার্তিক বলেন, “প্রায়ই তাঁরা প্রথম যে প্রশ্নটি করেন তা হলো আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?”
তবে এই প্রযুক্তির কিছু মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞান গবেষক হেলেনা লুইস-স্মিথ সতর্ক করেছেন যে, এআই অনেক সময় অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড চাপিয়ে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, লুসি একবার নিজের ত্বকের ছবি এআই কে দেখানোর পর উত্তর পেয়েছিলেন যে তাঁর ত্বক মসৃণ কিন্তু বিজ্ঞাপনে দেখানো ত্বকের মতো নিখুঁত নয়।
এছাড়া এআই এর ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ এর ঝুঁকিও রয়েছে। ডেটিং অ্যাপের জন্য ছবি বাছাই করতে গিয়ে হোয়াকিন ভ্যালেন্তিনুজ্জি নামের এক ব্যবহারকারী বিড়ম্বনায় পড়েন, যখন এআই তাঁর চুলের রং ভুল বলে।
সব মিলিয়ে, এআই দৃষ্টিহীনদের নিজের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ দিলেও, এর আবেগীয় প্রভাব এবং নির্ভুলতা নিয়ে এখনও অনেক পথ চলা বাকি।
এমএন

