এক সময়ের অনেকটা শূন্য পৃথিবীর কক্ষপথ এখন হাজারো স্যাটেলাইটে ঠাসা। কক্ষপথে স্যাটেলাইটের এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে দেখা দিচ্ছে মহাকাশ বর্জ্য। এই বর্জ্য এখন কেবল পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও ওজোন স্তরেরও মারাত্মক ক্ষতি করছে।
মহাকাশ দখলের এই লড়াই মহাকাশের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্কের ধরনও বদলে দিচ্ছে। আর এতে মহাকাশ গবেষণা এখন নতুন এক পরিবেশগত সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।
গার্ডিয়ান বলছে, মানব ইতিহাসের প্রায় পুরো সময় জুড়েই মানুষের মাথার উপরের মহাকাশ ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরের সীমানা। অথচ কেবল এক প্রজন্মের ব্যবধানে পৃথিবীর কক্ষপথের সেই বিশাল শূন্যস্থান এখন স্যাটেলাইটে পূর্ণ হয়ে গেছে।
এদিকে, চাঁদ এখনও মানুষের নাগালের বাইরে থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো বিশ্বশক্তিগুলোর কাছে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। বেশ কয়েকটি দেশ চাঁদে পুনরায় মানুষ পাঠানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করছে। তবে এবার কেবল ভ্রমণের জন্য নয়, বরং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্য যুক্ত হয়েছে।
এ প্রতিবেদনে জন্য গার্ডিয়ান এমন সব অগ্রগামীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে যারা চাঁদের মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হাজার হাজার স্যাটেলাইটের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানী, মহাকাশপ্রেমী ও ব্যবসায়ীদের জন্য রোমাঞ্চকর সময় এখন। একইসঙ্গে মহাকাশে মানুষের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে ভাববারও সময়।
পরিবেশগত উদ্বেগ: ইতিহাস এমন অনেক অগ্রগামীর উদাহরণে পূর্ণ যারা অজানা সীমানার খোঁজে ছুটে গিয়েছিলেন তবে অনেক দেরি করে বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা এমন সব পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছেন, যা তারা পুরোপুরি বুঝতেও পারেননি।
একুশ শতকের এই মহাকাশ যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত বিভিন্ন উদ্বেগ এখনই দেখা যাচ্ছে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের বা পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উপরের কণাগুলোর প্রায় ১০ শতাংশ এমন সব ধাতু ধারণ করে, যা রকেট উৎক্ষেপণের মতো মহাকাশ কার্যক্রম থেকে এসেছে। এর প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
তবে গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, বিষয়টি বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন এবং ওজোন স্তরের ক্ষতি করতে পারে। কারণ, যে কণাগুলোয় এমন ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে, সেসব কণা পৃথিবীকে ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা করে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মহাকাশ কার্যক্রমের পরিবেশগত প্রভাবের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে, ‘কক্ষপথে স্যাটলাইটের সম্ভাব্য ভিড় এবং বায়ুমণ্ডলের প্রতিটি স্তরের ওপর পরিবেশগত প্রভাব ঠেকাতে টেকসই পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন জরুরি প্রয়োজন।’
মহাকাশে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব বোঝার অন্যতম সেরা উপায় পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা হাজার হাজার মানবসৃষ্ট বস্তুকে চোখের সামনে কল্পনা করা। পৃথিবীর কক্ষপথ কীভাবে যোগাযোগ, আবহাওয়া, ইন্টারনেট ও ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইটে ক্রমেই জনাকীর্ণ হয়ে উঠছে তা পাঠকদের সরাসরি দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে গার্ডিয়ান।
বিষয়টি তুলে ধরার জন্য ‘স্ক্রলিটেলিং’ নামের বিশেষ ইন্টারঅ্যাক্টিভ ফরম্যাট বেছে নিয়েছে তারা। এতে পাঠক যখন স্ক্রল করে নিচের দিকে নামবেন, তখন তারা দেখতে পাবেন কীভাবে দশকের পর দশক ধরে পৃথিবীর কক্ষপথ একের পর এক স্যাটেলাইটে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এ প্রজেক্টের তদারকিতে থাকা গার্ডিয়ানের ভিজুয়াল এডিটর অ্যাশলি কার্ক বলেছেন, তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে বের করা।
‘আমাদের কেবল বর্তমানে কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের তথ্যই দরকার ছিল না, বরং অতীতে উৎক্ষেপণ করা যেসব স্যাটেলাইট কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে সেগুলোর তথ্যও দরকার ছিল।’
পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। সংগ্রহ করা বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোনাথন ম্যাকডাওয়েলকে অনুরোধ করা হয়েছিল তার কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে গার্ডিয়ানের বিভিন্ন তথ্য যেন মিলিয়ে দেখেন।
বর্তমানে ১৪ হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে। পাশাপাশি আছে ‘স্পেস জাঙ্ক’ বা মহাকাশের বর্জ্য। এর মধ্যে রয়েছে রকেটের পরিত্যক্ত অংশ ও অকেজো হয়ে যাওয়া স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষও। কক্ষপথে এ ক্রমাগত ব্যস্ততা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়েছে এবং এরইমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে।
২০০৭ সালে চীন একটি অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে এক আবহাওয়া স্যাটেলাইট ধ্বংস করে দেয়, যা মহাকাশে বর্জ্যের এক বিপজ্জনক মেঘ তৈরি করে।
এর দুই বছর পর মার্কিন এক স্যাটেলাইট ও এক অকেজো রুশ স্যাটেলাইটের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর ফলে প্রায় দুই হাজার টুকরার ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছিল।
হাজার হাজার ক্ষুদ্র ধাতব খণ্ড এখন মহাকাশে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে। বড় ভয়ের কারণ হচ্ছে, ভবিষ্যতে এসব সংঘর্ষ যদি ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা একটির ধাক্কায় অন্যটি পড়ার কারণ তৈরি করে তবে পৃথিবীর কক্ষপথ বিপজ্জনক এক মাইনফিল্ডে পরিণত হবে।
বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন প্রতিনিয়ত স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। কেবল গুগল ম্যাপস ব্যবহার করে পথ চলতেই নয়, বরং ইন্টারনেট সেবা ও আবহাওয়া পূর্বাভাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তা অপরিহার্য। এ ছাড়া মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই গবেষকরা বন উজাড়, মরুভূমিকরণ, হিমবাহের গলন ও সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার মতো নানা ঘটনা ট্র্যাক করতে পারেন।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

