অ্যানথ্রোপিকের সিইও
এআইয়ের গতি কমান, সবাইকে মেরে ফেলবে
আইটি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:০২
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মাঝে শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি মডেল উন্নয়নের গতি কিছুটা শ্লথ করার আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেই। এআইয়ের সব ঝুঁকি মোকাবিলায় অধিক সময় বিনিয়োগ ও সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে তিন ধাপের একটি রূপরেখাও তুলে ধরেছেন তিনি।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা দীর্ঘ এক নিবন্ধে আমোদেই বলেছেন, ‘‘আমাদের অবশ্যই এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমিয়ে আনতে হবে। এরপরও এআইয়ের উন্নতির গতি বেশ দ্রুত বলেই মনে হবে। তবে গতি শ্লথের মাধ্যমে আমরা যে সময়টুকু পাব, তা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। তা না হলে আগামীতে এআই মানব জাতিকে ধ্বংস করে দিবে।
আমোদেইয়ের প্রস্তাবিত তিন ধাপের পরিকল্পনায় রয়েছে:
• স্বতন্ত্র মূল্যায়নকারী দল নিয়োগ: এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র মূল্যায়নকারীদের স্থায়ীভাবে যুক্ত করা; যাদের ভেতরের কর্মীদের মতো সর্বাত্মক প্রবেশাধিকার থাকবে
• প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়: ফ্রন্টিয়ার এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তার মানদণ্ড ঠিক করা এবং অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতির লাগাম টানা
• আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা
এক্সের পৃথক পোস্টে এক্সএআইয়ের প্রধান নির্বাহী ইলোন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, তারা আমোদেইয়ের এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত। অল্টম্যান বলেন, কর্মীদের মতো স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার চিন্তাটি দারুণ এবং আমরাও একই পদক্ষেপ নেব। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক গত বৃহস্পতিবার এআইয়ের ক্রমবর্ধমান হুমকি বিষয়ক একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয়, কীভাবে বিভিন্ন অসাধু চক্র তাদের ক্লড এআই মডেলগুলোকে অনৈতিকভাবে অস্ত্র তৈরি, সাইবার হামলা, নজরদারি ও প্রতারণার মতো বিপজ্জনক কাজে ব্যবহার করেছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই আমোদেই এক্সে দীর্ঘ ওই নিবন্ধ প্রকাশ করেন।
মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির লাগাম টানার প্রধান কারণ হিসেবে আমোদেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিজের সক্ষমতা নিজে বাড়ানোর ক্ষমতাকে চিহ্নিত করেন। এতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার যে দীর্ঘদিনের ভয়, সেটির পাশাপাশি ওপেনএআই ও হাগিং ফেস সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোকেও গতি কমানোর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে: চলতি সপ্তাহে অ্যানথ্রোপিকের গবেষক জেকবস কক্সন পদত্যাগ করার পর এআইয়ের সম্ভাব্য বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে আতঙ্ক আরও বাড়ে। পদত্যাগপত্রে তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা এআই তৈরি করছেন, তারা সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, এই দশক শেষ হওয়ার আগেই এ প্রযুক্তি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
ওপেনএআইয়ের একাধিক শীর্ষ নির্বাহীও বলেছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর তা নিশ্চিতে ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে সব কয়েকটি শীর্ষ ল্যাবের যৌথ সম্মতিতে এআইয়ের অগ্রগতির গতি শ্লথ করা উচিত।
নিজেদের বেশ নিরাপত্তাসচেতন ফ্রন্টিয়ার ল্যাব হিসেবে দাবি করলেও অ্যানথ্রোপিকও এই সংকটের বাইরে নয়। গত জুলাইয়ে এক সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের কয়েকটি ক্লড মডেল অনধিকার চর্চা করে তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকে পড়ে। এরপর গত সপ্তাহেও এআই মডেল দিয়ে বাহ্যিক সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের আরেকটি ঘটনার কথা প্রকাশ করে সংস্থাটি।
আমোদেই বলেন, এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির এই উন্মাদ গতি দেখে আমার ভয় হচ্ছে, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই হয়তো স্বায়ত্তশাসিত এআইয়ের এমন কোনো সংঘাতময় ‘ঝাঁক’ তৈরি হতে পারে, যা পুরো ইন্টারনেট ব্যবস্থা দখলে নিতে সক্ষম এবং যার ফলে কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
তবে আমোদেই বলেছেন, তিনি এআই মডেলের প্রশিক্ষণ কিংবা কারিগরি উন্নয়ন একবারে বন্ধ করার কথা বলছেন না। বরং কোম্পানিগুলো যাতে মডেলের নিরাপত্তা ও সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণে পর্যাপ্ত সময় নেয় এবং তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারীরা প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে যাচাই করতে পারেন, সেটি সুনিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
আইপিও ও চরম প্রতিযোগিতা: তবে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার এই লড়াইয়ে জড়িয়ে আছে বিপুল আর্থিক স্বার্থ। ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিক; দুই প্রতিষ্ঠানই শেয়ারবাজারে বড় ধরনের আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যেকোনো নতুন সক্ষমতা বা সাফল্যই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ আনা, নতুন অবকাঠামো গড়া কিংবা আইপিওর মূল্যায়নে বিশাল ভূমিকা রাখে।
আমোদেই বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামোর অংশ হিসেবে অ্যানথ্রোপিক তাদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় স্থায়ীভাবে তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচক বসাবে; যাদের প্রয়োজনীয় সব টুলস ও ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পূর্ণ প্রবেশাধিকার থাকবে।
গত সপ্তাহে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওপেনএআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত একদল এআই এজেন্ট জার্মানির একটি ওয়েবসাইটে অননুমোদিতভাবে ঢুকে সেটিকে অন্য এআই এজেন্টদের ব্যবহারের জন্য নোটিশবোর্ডে পরিণত করে। ওপেনলেবেল প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে জুলাইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ধাক্কা সামলানোর মধ্যেই ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে জনসমক্ষে না এনে গোপন রেখেছিল।
ওপেনএআইয়ের মতো ডেভেলপারদের তৈরি এআই এজেন্টদের দ্বারা বাহ্যিক সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের মতো একের পর এক ঘটনা এআই মডেলগুলোর লাগামহীন সক্ষমতা এবং নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমেরিকাজুড়ে আইনপ্রণেতারা এআই ব্যবস্থার জন্য নতুন নতুন কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি তুলছেন। আমোদেই বলেন, এআই কোম্পানিগুলোর নিজেদেরই স্বেচ্ছায় একযোগে কাজ করে নিরাপত্তার সর্বজনীন মানদণ্ড তৈরি করা উচিত। সূত্র: রয়টার্স
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

