নির্বাচনে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প
ওমর ফারুক, উখিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:০১
ছবি : বাংলাদেশের খবর
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের কারবার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহার এবং রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
তাদের আশঙ্কা, ক্যাম্পে সক্রিয় অপরাধী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনকালীন সময়ে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে ব্যবহার করতে পারে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় যৌথ অভিযানে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ৪৫ রোহিঙ্গা আটক হওয়ার ঘটনা এই শঙ্কাকে আরও জোরদার করেছে।
মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বেসরকারি হিসাবে তা ১৬ লাখ ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উখিয়ার পাহাড়ি জনপদের প্রায় আট হাজার একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হলেও আট বছরে এসব ক্যাম্প আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভেতরে ও বাইরে নিয়মিত অস্ত্র ও ইয়াবা কারবার, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অপরাধীরা ক্যাম্পগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদগুলোতেও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।
কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের গ্রাম পশ্চিম পাড়া উত্তর মসজিদের পেছনে শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার বাড়ি ভাড়া বাসায় বসবাস করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়ার একাধিক অংশ কেটে গোপন পথ তৈরি করা হয়েছে। উখিয়ার পানবাজার ও কুতুপালং সংলগ্ন ক্যাম্প এলাকায় অন্তত ১৫ থেকে ২০টি পথ রয়েছে। এসব পথ ব্যবহার করে রাতের আঁধারে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে পড়ছে।
এপিবিএনের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত প্রায় ৭০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার একটিও বর্তমানে সচল নেই। ফলে ক্যাম্পের ভেতরের কার্যক্রম নজরদারিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পগুলোতে মাইকিং করে সতর্কতা জারি করা হলেও বাস্তবে রোহিঙ্গাদের চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অবৈধভাবে বসবাসরত ৪৫ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়।
এর আগে ২১ জানুয়ারি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অপারেশনস ও পরিকল্পনা পরিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সরকারি চিঠিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকালীন নাশকতা, অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি এবং ভোটার তালিকায় অনিয়মের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।
উখিয়া অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল হুসাইন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক নয়, এটি স্পষ্টভাবে আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন—এই সময় ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।’
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভুয়া এনআইডি, অবাধ চলাচল ও অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী, গোপন পথ বন্ধ এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এআরএস

