Logo

রাজনীতি

আবু সাঈদ খান

সিরাজুল আলম খানের তত্ত্বেই আছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

Icon

বাংলাদেশের প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:৫১

সিরাজুল আলম খানের তত্ত্বেই আছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

‘সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি ও রাষ্ট্রভাবনা’ শীর্ষক আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখছেন আবু সাঈদ খান। ছবি : মো. আরিফ শেখ

ইতিহাসের মহাকাব্যিক চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও নিউক্লিয়াস প্রধান সিরাজুল আলম খানের দেওয়া তত্ত্বের মধ্যে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ লুকিয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু সাঈদ খান। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার জন্য সিরাজুল আলম খান এখনো প্রাসঙ্গিক। তাকে স্মরণ করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আওয়াজ ছিল— বৈষম্যের অবসান চাই। কিন্তু গত ১৫ মাসে বৈষম্যের অবসান ঘটেনি, বরং বৈষম্য বেড়েছে। নিশ্চয়ই আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা, নব্বই ও চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ গড়তে চাই। মানুষে মানুষে বৈষম্যের অবসান হবে, ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ থাকবে না— এমন বাংলাদেশ, যেটা আমরা একাত্তরে চেয়েছি; এমন বাংলাদেশ, যেটা জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন দেখেছি; সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের বড় দাবি। যদি সবার জন্য বাসযোগ্য, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে পারি, তাহলে সিরাজুল আলম খানসহ আরও যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের জীবন-স্মৃতি সম্মানিত ও মহিমান্বিত হবে।’ 


বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপকার ও নিউক্লিয়াস প্রধান সিরাজুল আলম খানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি ও রাষ্ট্রভাবনা’ শীর্ষক এ আলোচনাসভার আয়োজন করে সিরাজুল আলম খান (এসএকে) ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট। আবু সাঈদ খান এ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। 

আবু সাঈদ খান তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘ষাটের দশকের টগবগে তরুণ সিরাজুল আলম খান স্বাধীনতার কথা ভেবেছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে ‘নিউক্লিয়াস’ খ্যাত সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ৬৬-তে শেখ মুজিব যখন ৬ দফা দেন, তখন সিরাজুল আলম খানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন দার খুলে যায়। তিনি ছয় দফাকে এক দফায় (স্বাধীনতার) পরিণত করার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাতে সফল হয়েছিলেন। ৬৬-তে স্বায়ত্ত শাসনের জন্য হওয়া বহুল আলোচিত হরতালে তিনি সংঘবদ্ধভাবে শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করেছিলেন।’’

‘সিরাজুল আলম খান ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান রচনা করেছিলেন’ মন্তব্য করে আবু সাঈদ খান বলেন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি। স্বায়ত্ত শাসনের আন্দোলনকে স্বাধীনতার সিংহদারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সিরাজুল আলম খান বুঝেছিলেন, অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইয়াহিয়ার মোকাবিলা করা যাবে না। তিনি সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।’

কামরুদ্দীন আহমদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি করে আবু সাঈদ খান বলেন, ‘(১৯৬৯ সালের) জানুয়ারিতে আন্দোলন দুইভাগে বিভক্ত হয়। একদিনে (ধানমন্ডি) ৩২ নম্বর থেকে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন। অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল থেকে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি হচ্ছিল। ছাত্রলীগের ছেলে-মেয়েদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছিল। সারাদেশেও (সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের) নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল। সেই সময় আমরাও ফরিদপুর থেকে ট্রেনিংয়ে অংশ নেই। চার নেতার বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) গঠনের মধ্য দিয়ে সিরাজুল আলম খান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন।’

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাত্তোর সময়ে সিরাজুল আলম খান বুঝতে পেরেছিলেন, এখনো স্বাধীনতার আরাধ্য স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক কাজ অপূর্ণ রয়ে গেছে। তাই তিনি তখন বিপ্লবী জাতীয় সরকারের ডাক দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় সরকার গঠন করেন। সেই সরকার কোন দলীয় সরকার? যে অংশ মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা পালন করেননি। তাজউদ্দীন আহমদকে বাদ দিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাহেরউদ্দিন ঠাকুরদের নিয়ে তিনি সরকার গঠন করেন। সেই সরকার ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের সরকার। সেই ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রে শেখ মুজিব নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিরাজুল আলম খান রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলেছেন, সাথে ধারাবাহিকভাবে এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে কীভাবে পরিবর্তন করা যায় সেটিও ভেবেছিলেন। বিভিন্ন পুস্তিকার মাধ্যমে সবার কাছে এটি তুলে ধরেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন কেবল জাসদকে দিয়ে এটি হবে না। তাই তিনি সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এমনকি স্বৈরশাসক এরশাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন যে, স্থানীয় সরকার গড়ে তোলা যায় কি না। পরে এরশাদ স্থানীয় সরকার গড়ে তুলেছিলেন। কর্নেল তাহেরের ফাঁসির মধ্য দিয়ে বিএনপি-জিয়াউর রহমানের সঙ্গে জাসদের দূরত্ব শুরু হয়। তা সত্ত্বেও তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, গ্রাম সরকার করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, দলের রাজনীতি আর রাষ্ট্রের রাজনীতি আলাদা। জাতীয় রাজনীতি সবাইকে মিলে করতে হবে। সে কারণে তিনি শুধু জাসদে নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি। তিনি জাসদের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে তিনি রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্য তিনি সরকার, বিরোধী দল সবার সামনে হাজির করেছেন।’

‘দেশ এখন একটি সংকটে আছে’ মন্তব্য করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়েছি। কিন্তু আমরা গণতন্ত্রের পরিবর্তে তো মবতন্ত্র চাই না। গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’

মবভীতির কারণে সাংবাদিকেরা স্বাধীনভাবে কলম ধরতে পারছেন না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদির মৃত্যুতে কেন্দ্র করে দুটি পত্রিকা (প্রথম আলো, ডেইলি স্টার) অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হলো। এটা কাম্য নয়, এগুলো প্রটেক্ট করা দরকার ছিল। বিভিন্ন জায়গায় হামলা হচ্ছে, জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। বর্তমান সরকার মানুষকে অভয় দিতে পারেনি। সবার জন্য নিরাপদ বাসভূমি নিশ্চিত করতে পারেনি। তাদেরকে (সরকার) পাস মার্ক দেওয়া যায় না।’

তিনি বলেন, ‘চব্বিশের আন্দোলনে তরুণের পাশাপাশি তরুণীরাও রাস্তায় নেমেছিল। আজ নারীরা অসহায়। তাদের পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তারা বিভিন্ন জায়গায় নিগৃহীত হচ্ছে। একটা স্বাধীন দেশে কে কোন পোশাক পরবে, কে কোন খাবার খাবে, কে কোন উপাসনালয়ে যাবে— এটা ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। এখানে এখনো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটছে। ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসের মৃত্যু আমাদেরকে ব্যথিত করে, আমাদেরকে হাদির মৃত্যু ব্যথিত করে। আমরা কোনো মৃত্যু চাই না। আমরা চাই, হাদির মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটিত হোক। যত কঠিনই হোক, (অপরাধীদের) গ্রেপ্তার করা হোক। দিপু চন্দ্র দাসের হত্যাকারীদেরও খুঁজে শাস্তি দেওয়া হোক।’ 

বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক ছাত্রনেতা, বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের রাজনীতি প্রতিহিংসার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে কারণে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে রক্তাক্তভাবে, যেটা সিরাজুল আলম খান কখনো চাননি। পঁচাত্তর পরবর্তীতে নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। আমরা (জাসদ) সেটা নিয়েও বিভক্ত হয়ে গেছি।’

সিরাজুল আলম খানের ভাতিজি ও ফাউন্ডেশনের সদস্যসচিব ব্যারিস্টার ফারাহ খান বলেন, ‘‘সিরাজুল আলম খান নামটির সঙ্গে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬২ সালে গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন হয়েছিল। নিউক্লিয়াস স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের নয় বছরের চেষ্টার ফল হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। যে কারণে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন, সেই একই কারণেই সিরাজুল আলম খান জাসদ গঠন করেছিলেন।’’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের সব রাজনৈতিক নায়কদেরকে সঠিক সম্মান দেইনি। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, আমরা সেই দলের নেতাকেই স্বাধীনতার নায়ক বানানোর চেষ্টা করেছি। আর সিরাজুল আলম খানের মতো স্বাধীনতার সত্যিকারের নায়কদের আমরা আড়ালে ফেলে দিয়েছি। তবে ইতিহাস কখনো চাপা রাখা যায় না। আজ হোক, কাল হোক, সত্যি প্রকাশ হবেই।’

সভায় সভাপতিত্ব করেন আবু সাঈদ খান। সভা সঞ্চালনা করেন সিরাজুল আলম খান ফাউন্ডেশনের সদস‍্য সচিব ফারাহ খান। অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক ছাত্রনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী সরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ সিকদার, ইসমাইল হোসেন, জাহাঙ্গীর হোসেন, খোরশেদ আলম, আব্দুল মজিদ অন্তর প্রমুখ।


প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) আবু সাঈদ খান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর