Logo

বিশেষ সংবাদ

এডব্লিউডির আওতায় আসছে ১০ লাখ হেক্টর ধানি জমি

Icon

তরিকুল ইসলাম সুমন

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৩:১৪

এডব্লিউডির আওতায় আসছে ১০ লাখ হেক্টর ধানি জমি
  • কার্বন শোষণ উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে ব্রি - মহাপরিচালক
  • মিথেন কমাতে পানি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই - ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম 

পৃথিবীতে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গড় তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি। পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু। বাড়ছে গ্রিন হাউস গ্যাস। আর গ্রিন হাউস গ্যাসের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশ্বব্যাপী মিথেন গ্যাসের আধিক্য। ফলে বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়। খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, মরুকরণ, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে নানান রোগ ব্যাধিও। বিশ্বে বর্তমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বন উজাড়, কৃষি ও শিল্প খাতের কার্যক্রম, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে। এর বাইরে নয় বাংলাদেশও। মিথেন নির্গতে কৃষি খাতে বিশেষ করে ধান চাষকে দায়ী করা হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চলছে গবেষণা। বিশেষ করে ধান চাষে মিথেন গ্যাসের আধিক্য কমাতে নেওয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। জাপান ও কোরিয়ার সহায়তায় নেওয়া হচ্ছে সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি)। ধান চাষে দেওয়া হচ্ছে এডব্লিউডি (অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং) প্রযুক্তি। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ১০ লাখ হেক্টর ধানী জমিকে নিয়ে আসা হচ্ছে এডব্লিউডির আওতায়। কার্বন শোষন উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনা, স্যাটেলাইট মনিটরিং বাড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। পবিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশন) মির্জা শওকত আলী বলেন, আমরা ফ্লাডেড অ্যাগ্রিকালচারে অভ্যস্ত। এ কারণে যথেষ্ট পরিমাণে কার্বণ নির্গত হচ্ছে। আমাদের প্রচুর জলাভূমি রয়েছে যেখানে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদন হয়। এখানে অর্গানিক অনেক কিছু পচে মিথেন নির্গত হয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল থেকে আইপিসিসি বলছে কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় মিথেন বায়ুমণ্ডলকে ৩৫ গুণ উত্তপ্ত করে। বর্তমানে বলা হচ্ছে ২৮ গুণ বেশি। তবে উন্নত দেশ থেকে আমাদের কার্বণ ইমিশনের মাত্রা কম। এদিক দিয়ে আমরা ১৪তম অবস্থানে রয়েছি। তবে আশার কথা হলো, আমাদের কৃষি ক্ষেত্রে মিথেনের মাত্রা কমানোর জন্য পানি ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দিচ্ছি। ইতোমধ্যে জাপান ও কোরিয়ান ৫টি প্রতিষ্ঠান এখানে ফিজিবিলিটি (সম্ভাব্যতা যাচাই করছে) স্টাডি করছে। জাপান প্রায় শেষ করেছে। কোরিয়ান কোম্পানিও শুরু করবে। তারা এডব্লিউডি প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এডব্লিউডি প্রযুক্তিতে ধান চাষ করলে ৪০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হবে। ফলে কমে আসবে মিথেন নির্গমনের মাত্রা। 

তিনি আরো বলেন, দেশের কৃষক মনে করেন, জমিতে বেশি পানি দিলে ভালো ফলন হবে। এক্ষেত্রে ফ্লাডেড না করে, অঙ্কুরোদগম, ফুল ও ফল আসার সময় জমিতে কম পানি দিলে মিথেনের মাত্র কমানো সম্ভব। এভাবে আমরা মিথেনের ৫-১০ শতাংশ নির্গমন কমাতে পারি। জাপানি প্রতিষ্ঠান (মিটসুবিসি, সুমিতম ও মিৎসুই) আমাদের বিএডিসি এবং ডিএইএর সঙ্গে কাজ করছে। তারা শুধু প্রযুক্তি হস্তান্তর নয়, এর মাধ্যমে মিথেন কমছে কিনা তারও পরীক্ষা করছে। তিনি আশা করেন, এই পদ্ধতিতে আগামী ২ বছরের মধ্যে ১০ লাখ হেক্টর জমি এডব্লিউডি প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করা হবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস গ্যাসের জন্য ধান চাষকে দায়ী করা হচ্ছে। এ চাষ থেকে মিথেন গ্যাস উদগীরণ হয়ে থাকে। যেটি জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখানে অকারণেই জমিতে বেশি পানি দেওয়া হয়। এতে করে একদিকে পনির অপচয় হচ্ছে অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি পানিতে ধানগাছ পচে তৈরি হচ্ছে মিথেন গ্যাস। এর কারণে কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া প্রয়োজন। ধানক্ষেতে অক্সিজেনের অভাবে অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া মিথেন উৎপাদন করে। এই মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বিশ্বব্যাপী মানবসৃষ্ট মিথেন নির্গমনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য ধান চাষ দায়ী। এই সমস্যা সমাধানের জন্য উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, সঠিক চাষ পদ্ধতি এবং টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, ধান চাষ মিথেন গ্যাস নির্গমনের জন্য একটি প্রধান কারণ হিসেবে বলা হলেও এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ গবেষণা করে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে ৬৬৬ গ্রাম কার্বনড্রাই-অক্সাইড, ৫৩ গ্রাম মিথেন এবং ০.৫ গ্রাম নাইট্রাস অক্সাইড ধানক্ষেত থেকে নিঃসরিত হয়। অন্যদিকে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ধান গাছ ২২০০ গ্রাম কার্বনডাই-অক্সাইড ফটোসিনথেটিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। এছাড়া মিথেন বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস ও হাইড্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত হয়, যা ধান ও অন্যান্য গাছ সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে।

তিনি আরো বলেন, ব্রির গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ধান চাষাবাদে ধান গাছ মাত্র ৫-১০ শতাংশ মিথেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, বাকি ৯০-৯৫ শতাংশ মিথেন মাটি থেকে আসে। জলাবদ্ধ জমিতে লেবাইল জৈব কার্বন এবং মিথানোজেনিক ব্যাক্টেরিয়া মিথেন উৎপন্ন করে। অপরদিকে সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ধান গাছ ২২০০ গ্রাম কার্বনডাই-অক্সাইড শোষণ করে।

তিনি আরো বলেন, ধান চাষ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের চেয়ে অনেক বেশি শোষণ করে বরং বায়ুমণ্ডলকে পরিচ্ছন্ন করছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং তা বাস্তবায়নে বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। ব্রি এমন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছে যা বেশি পরিমাণ কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। ইতোমধ্যে ব্রি জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত জার্মপ্লাজম থেকে পরীক্ষণের মাধ্যমে এমন জাত শনাক্ত করেছে যা অধিক কার্বনডাই-অক্সাইড শোষণ ও অধিক উৎপাদনক্ষম। এছাড়া ধানচাষ থেকে আরো কম গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানোর পদ্ধতি ব্যবহার, পরিমিত ও ব্যালেন্স সার ব্যবহার, ইউরিয়া সার ছিটিয়ে ব্যবহারের পরিবর্তে মাটির গভীরে প্রয়োগ কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সরেজমিন উইং (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, বিশ্বব্যাপী মিথেন নির্গতের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ধান চাষ। তবে ব্রি ছাড়া এ বিষয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ে গবেষণা করে না। তবে বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখানে ফিজিবিলিটি স্টাডি করছে। বর্তমানে ডিএই এর দু-একটি প্রকল্পে এডব্লিউডি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, তাদের এখানে মিথেন নির্গত হওয়া বা কি পরিমাণ হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তারা শুধুমাত্র উৎপাদনেই জোর দিচ্ছেন। কোনো নির্দেশনা এলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নই তাদের দায়িত্ব। 

উল্লেখ্য, মিথেন গ্যাস কমানোর জন্য এডব্লিউডি প্রযুক্তি ধান চাষে ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে ধান ক্ষেতে একটানা পানি না রেখে পর্যায়ক্রমে জমি ভিজানো ও শুকানো হয়, যার ফলে জমিতে অক্সিজেনের প্রবেশ ঘটে এবং মিথেন উৎপাদন কমে। এর ফলে শুধুমাত্র মিথেনই কমে না, বরং সেচ খরচ এবং জ্বালানি খরচও সাশ্রয় হয়। এই পদ্ধতির ফলে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ কম পানি লাগে, যা সেচ খরচ ও জ্বালানি খরচ কমাতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিটি ধান চাষে পানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

বিকেপি/এমবি 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর