Logo

বিশেষ সংবাদ

জনসমুদ্রের অশ্রুজলে শেষ শ্রদ্ধা : স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় খালেদা

Icon

রায়হান উল্লাহ

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:১৪

জনসমুদ্রের অশ্রুজলে শেষ শ্রদ্ধা : স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় খালেদা

অশ্রুসিক্ত নয়নে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার শেষ বিদায় জানানো হলো তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ থেকে জিয়া উদ্যান- ঢাকা এদিন পরিণত হয় শোকাবহ জনসমুদ্রে। সবার মনে ছিল প্রিয় নেত্রীকে শেষবার একবার দেখা; ইতিহাসের অংশ হওয়া।

প্রধান উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, প্রধান বিচারপতি, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্পিকারসহ ৩২টি দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা ও দাফন। সংসদ ভবনের ভিতর-বাহির, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আশপাশের সড়ক, বাসার ছাদ এমনকি মেট্রোরেল স্টেশন থেকেও মানুষ অংশ নেয় এই শেষ শ্রদ্ধায়। সময় যত গড়ায় মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে। তাদের কেউ দেশের নানা প্রান্ত থেকে অনেক ঝক্কি পেরিয়ে এসেছেন সংসদ ভবন এলাকায়।

প্রায় ৪৪ বছর আগে যেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সমাহিত করা হয়েছে, সেই জিয়া উদ্যানে স্বামীর পাশেই শায়িত হলেন খালেদা জিয়া। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টায় দেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রীকে।

এর আগে বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদের সামনে জনসমুদ্রের মধ্যে খালেদা জিয়ার জানাজা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের ভিতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সব সড়ক, অলিগলি থেকে অজস্র মানুষ তাতে শরিক হন। ঢাকায় এদিন ছিল মানুষের স্রোত। সবার লক্ষ ছিল সংসদ এলাকায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। অনেকে পৌঁছাতে না পেরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান। দিনের শুরু থেকে সময় যত বাড়ে সংসদ এলাকায় মানুষ বাড়তে থাকে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ উপচে পড়ে মানুষে।

জানাজায় ছিল না তিল পরিমাণ জায়গা। জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল স্টেশন, আশপাশের বাসা-বাড়ির ছাদ থেকেও জানাজায় অংশ নিতে দেখা যায় অনেককে। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা নিয়ে নেটিজেনরা নানান অনুভূতি প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ এই জানাজাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা বলে অভিহিত করেছেন।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাঁকে সমাহিত করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে, যার বর্তমান নাম জিয়া উদ্যান।

জানাজা শেষে সংসদ ভবনের সামনে থেকে কড়া নিরাপত্তায় পতাকা শোভিত লাশবাহী গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার কফিন জিয়া উদ্যানের সামনে নেওয়া হয়। এরপর সেতুর কাছ থেকে কফিন কাঁধে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। কফিনের ঠিক পেছনে ছিলেন তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। বিকালে তারেক রহমান কবরে নেমে মাকে সমাহিত করেন। 

এরপর রাষ্ট্রপতির তরফে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কবরে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আদিল। এরপর প্রধান উপদেষ্টার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল শ্রদ্ধা জানান। এরপরে শ্রদ্ধা জানান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। তারপর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।

দাফন অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জায়মা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি, মেয়ে জাহিয়া রহমান, জাফিয়া রহমান, খালেদা জিয়ার ছোটভাই শামীম এস্কান্দার, স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, জুবাইদার বোন শাহিনা জামানসহ স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা জিয়ার কবরে সবার আগে নামেন তাঁর বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নিজ হাতে মাকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করেছেন। মাকে কবরে শায়িত করার পর সাড়ে ৪টার কিছুক্ষণ পর তিনি উঠে আসেন। এরপর মায়ের কবরে সবার আগে মাটি দেন তারেক রহমান। পরে তিন বাহিনীর প্রধান ও বিএনপির শীর্ষ নেতারাও কবরে মাটি দেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন ছিলেন। শেষে প্রয়াতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

মোনাজাতের পর তারেক রহমানের কাছে এসে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও তিন বাহিনী প্রধানরা সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় খালেদা জিয়ার।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য স্বাধীনতার পর তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে তিনি ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছান। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।

জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, আমৃত্যু তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি খালেদা।

অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি কোনো সমঝোতায় যায়নি। তাই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নাম হয় আপসহীন নেত্রী।

৪০ দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তার মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে, বুধবার ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি।

বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নেওয়া হয় গুলশানে তার ছেলে তারেক রহমানের বাড়িতে।

পরে জাতীয় পতাকা শোভিত লাশবাহী গাড়ি বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। গাড়িবহরে একটি বাসে করে সেখানে পৌঁছান খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। বাদ জোহর খালেদা জিয়ার জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই সংসদ ভবন এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়।

জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।

প্রধান উপদেষ্টা জানাজার আগে তারেক রহমানকে সান্ত¡না দেন। তিনি তারেক রহমানের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াত ইসলামীর শফিকুর রহমান, মিয়া গোলাম পরওয়ার, শামীম সাঈদী, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে দেখা গেছে। 

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আবদুল মালেকের ইমামতিতে ৩টা ৩ মিনিটে জানাজা শুরু হয়ে শেষ হয় ৩টা ৫ মিনিটে।

জানাজার আগে পরিবারের তরফে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান প্রয়াতের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

তিনি বলেন, আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আমি আজকে এখানে উপস্থিত সব ভাইয়েরা এবং বোনেরা-যারা উপস্থিত আছেন, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় যদি আপনাদের কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি সেটি পরিশোধের ব্যবস্থা করবো ইনশাল্লাহ। একই সাথে উনি জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় উনার কোনো ব্যবহারে, উনার কোনো কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন। আল্লাহতায়ালা যাতে উনাকে বেহেশত দান করেন।

বিএনপি নেতা তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে দেড় দশকের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গেল বৃহস্পতিবার সপরিবারে দেশে ফেরেন। এর এক সপ্তাহের মধ্যে তার মাতৃবিয়োগ ঘটল। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম চলায় দলের নেতৃত্বের দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে তাকে।

খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।

চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভেনিউয়ে শেষ যাত্রায় অংশ নিয়েছেন। জানাজায় ৩২ দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে মায়ের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর গভীর বিষণ্নতা ও নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে বাসায় ফিরেছেন তারেক রহমান। সারা দিনের শোক, জানাজা, দাফন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে অত্যন্ত সংযত ও বিমর্ষ অবস্থায় দেখা যায়। দলীয় সূত্র জানায়, বিকেল ৫টা ৪৩ মিনিটে তারেক রহমান তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায় প্রবেশ করেন।

এর আগে সকালে এভারকেয়ার থেকে যখন খালেদা জিয়ার মরদেহ গুলশানে তারেক রহমানের বাসভবনে পৌঁছায় তখন তিনি মায়ের কফিনের পাশে কোরআন তেলাওয়াত করেন।

বিকেপি/এমবি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বিএনপি

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর