Logo

বিশেষ সংবাদ

দলগুলোকে ছেড়ে দেওয়া আসনে জয় নিয়ে দুশ্চিন্তা

Icon

এম. ইসলাম

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৩

দলগুলোকে ছেড়ে দেওয়া আসনে জয় নিয়ে দুশ্চিন্তা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছোট ছোট দলের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে জয়ের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয়েই। যার নেপথ্যে রয়েছে, বড় দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ছোট দলের প্রার্থী মেনে না নেওয়ার  প্রবণতা। অবশ্য ছোট ছোট এসব দলের নিজেদেরও তেমন একটা জনপ্রিয়তা নেই।

ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণে বিএনপি ও জামায়াত এবার ছোট দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা করলেও ছেড়ে দেওয়া আসনে জয় নিয়ে বেশ চ্যালেঞ্জে রয়েছে দল দুটি। বিএনপির তার রাজপথের মিত্রদের ১৫টি আসন ছাড়লেও সেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। আর যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই সেখানে ভিন্ন কোনো দলের প্রার্থীকে মেনে নিতে পারছেন না বিএনপি নেতাকর্মীরা। তাই এসব আসনে হারার আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে।

বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ অনেক ছোট দলের নেতা দলটির সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের মাঝে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। বিএনপি ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে আসন ছেড়েছে নানা কারণে। বিশেষ করে দলটির সঙ্গে থাকা ইসলামী দলগুলোকে আসন ছেড়ে দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চাইছে, দলটি ইসলামপন্থিদের ব্যাপারে উদার। আর জামায়াত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোটে জয়যুক্ত করতে জোরালো ক্যাম্পেইন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়ের সমালোচনা থেকে দূরে থাকতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের নেতাদের পাশে পেতে চাইছে।  যার ফলপ্রসূতিতে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে দলটি। অবশ্য আগে থেকেই জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, মামুনুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ৮ দলের নির্বাচনী সমঝোতায় ছিল।

বিএনপির শরিকদের চলে যাওয়া আসন নিশ্চিত করলেও জামায়াত এখনো আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে পারেনি।

তবে আগামী দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে কাজ করছে জামায়াত ও সমমানা দলগুলো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে এরকম প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দিয়েছি। ফলে জয় নিয়ে কোনো শঙ্কা আমরা দেখছি না। ছেড়ে দেওয়া আসনে ছোট দলগুলোকে বিএনপি সহযোগিতা করছে না এমন অভিযোগ কে অস্বীকার করেন তিনি।’

আর জামায়াত ইসলামীর নেতারা বলছেন, চ্যালেঞ্জ থাকলেও তারা কোনো সংকট দেখছেন না ছোট দলগুলোকে নিয়ে।

বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনে জয় নিয়ে শঙ্কা: বিএনপি তার শরিকদের যে আসনগুলো ছেড়ে দিয়েছে তার বেশির ভাগ আসনেই দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই এমন আসনে শরির দলকে মেনে নিতে রাজি হচ্ছে না বিএনপির নেতাকর্মীরা। 

ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ নিয়ে ভোট করছেন রাশেদ খান। ওই আসনে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বুধবার এ আসনের কালীগঞ্জ উপজেলার হাট বারোবাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপি নেতাকর্মীদের বড় অংশই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নেমে পড়েছেন।

অপরদিকে রাশেদ খানের পক্ষে কোনো প্রচার-প্রচারণা লক্ষ্য করা যায়নি। এ আসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি পদধারী নেতারা বলছেন, তারা ভিন্ন কোনো দলের প্রার্থীকে এখানে ভোট দেবেন না।  

রাশেদ খান দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীরা সবাই এখনো সহযোগিতা শুরু করেনি। একটা সময় সব ভেদাভেদ ভুলে বিএনপির সবাই আমার পক্ষে কাজ করবেন।’

ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব। গত বুধবার তাকে পরিবর্তন করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে এই আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। কিন্তু এই আসনে নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু বিএনপি নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী তার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে, যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হলেও শেষ সময়ে তাকে বাদ দিয়ে চূড়ান্তভাবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নেতা রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। শহীদ ইকবাল এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, এ আসনে ভোজগাতী ও ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের বেশির ভাগ বিএনপি নেতাকর্মী শহীদ মোহাম্মদ ইকবালের পক্ষে কাজ করছেন।  অনেকে শহীদ ইকবালের পক্ষে কাজ না করলেও তারা জমিয়ত নেতা রশিদ ওয়াক্কাসকে ‘বসন্তের কোকিল’ আখ্যা দিয়ে ভোট না দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন সাবেক সংরক্ষিত আসনের এমপি ও বিএনপির সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারাহানা। ওই আসনটিতে বিএনপির জোট জমিয়তে ইলামায়ে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব মনোনয়ন পান। এতে বিক্ষুব্ধ রুমিন ফারহানা দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র দাঁড়ান। এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় মাঠে বহুদিন ধরে ছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা আহসান উদ্দিন খান শিপন। আসনটিতে জাতীয় পার্টি (কাদের) ও জাপা এবং জেপির নেতৃত্বে নতুন জোট ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ উভয় অংশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন দুইবারের সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা। ফলে আসনটিতে বিএনপি জোটের প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের জিতে আসা কঠিন হবে বলে মনে করছেন অনেকে। আসনটি দীর্ঘদিন বিএনপির ভোটব্যাংক হিসেবে খ্যাত।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিএনপি যে ১৫ আসনে দলটির শরিক বা সমমনাদের মনোনয়ন দিয়েছে সেসব আসনে দিকে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী আর অন্যদিকে ভিন্ন দলের প্রার্থীকে না মানার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। সব মিলিয়ে এসব আসনে দলটির বেশির ভাগ প্রার্থী এখন পরাজয়ের শঙ্কায় রয়েছেন।

জামায়াত জোটেও ছোট দলগুলোর আসনে জয় চ্যালেঞ্জ: জামায়াতসহ সমমনা আটদল দীর্ঘদিন থেকে সংস্কারসহ নানা দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। চূড়ান্ত না হলেও মূলত এই দলগুলোতে নির্বাচনী সমঝোতা আগেই ছিল।

দলগুলো ইতোমধ্যে তাদের আসন ভাগাভাগি প্রায়ই শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। শেষ সময়ে এসে এ জোটে আরো দুটি দল যুক্ত হয়েছে। কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমদের লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

আগে থেকে জামায়াত ছাড়াও আট দলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি(জাগপা), খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও নেজাম ইসলাম পার্টি যুক্ত ছিল।

আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বেশির ভাগ আসনে এ জোট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার প্রস্তুতি নিতে হবে।

যশোর, সাতক্ষীরা নড়াইল ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জামায়াত ছাড়া জোটের বেশির ভাগ দলের ভোটের মাঠে তেমন কোনো প্রভাব নেই।  কিছু কিছু আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অল্প সংখ্যক ভোট রয়েছে।

তাই অন্য কোন দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হলেও সেখানেও জামায়াতে নেতাকর্মীরা অন্য দলের প্রার্থীদের মেনে নিতে পারছেন না। 

যদিও জমায়েত ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেছেন, ‘বড় দলের নেতাদের প্রত্যাশা থাকে তারা মনোনয়ন পাবেন। কারণ কর্মীদের সুখে-দুঃখে বড় দলের নেতারে মাঠে থাকেন। তাই এবারে নানা সমীকরণে জোট করতে হয়েছে। অনেক বড় দলের প্রার্থনা বঞ্চিত হচ্ছেন। যা নিয়ে কিছুটা কষ্ট থাকলেও শেষ সময় এসে সবাই জোটের প্রার্থীর পক্ষেই মাঠে নেমে পড়বেন। ইসলামী দলগুলোর কর্মীরা হাই কমান্ডের নির্দেশ মেনে চলেন।’

আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। তাই কারা শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকছেন সেটি দেখার জন্য সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নির্ধারিত ওই সময়ের আগেই অনেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেন। তার ফলে, হিসাব নিকাশে পরিবর্তন আসতে পারে।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপি

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর