Logo

বিশেষ সংবাদ

সরকারি চুক্তির অনিশ্চয়তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ কোম্পানির!

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১১

সরকারি চুক্তির অনিশ্চয়তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ কোম্পানির!

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যচিত্র এখন শুধু দুর্বল তকমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নিয়েই তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা। কোম্পানির সঙ্গে সরকারি ক্রয় চুক্তি মেয়াদ শেষ ও নতুন চুক্তির অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ, আদায় অযোগ্য পাওনা বৃদ্ধি এবং সম্পদের অতিমূল্যায়ন- সব মিলিয়ে সংকট স্পষ্ট। এ সম্পর্কিত হালনাগাদ আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ১১টি কোম্পানির মধ্যে অন্তত পাঁচটির ক্ষেত্রেই এসব ঝুঁকি আছে। 

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি জানিয়েছে, চুক্তি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে; তাই কোম্পানিগুলোকে সঠিক তথ্য প্রকাশ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয় চুক্তি ছাড়া বিনিয়োগ টেকসই নয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্লান্টের উৎপাদন ব্যয় বেশি, অন্যদিকে গ্যাস-সংকট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এ অবস্থায় পিপিএ শেষ হওয়া প্লান্টগুলো চালু রাখা কঠিন। অডিট রিপোর্টে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি থাকলে বিনিয়োগকারীদের জানাতে হবে। ডিএসইর উচিত চুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা ও প্লান্ট বন্ধ থাকার তথ্য প্রাইস সেনসিটিভ ইনফরমেশন হিসেবে প্রকাশ নিশ্চিত করা।

কোন কোম্পানির অবস্থা কেমন: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্তত পাঁচটি কোম্পানি আর্থিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কোম্পানিও রয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড: নিরীক্ষায় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম সবচেয়ে প্রকট। কোম্পানিটির বৈদেশিক ঋণের ৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকার ফরেন এক্সচেঞ্জ লস আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুযায়ী লাভ-ক্ষতিতে না দেখিয়ে মূলধনে যুক্ত করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ইম্পেয়ারমেন্ট টেস্ট (সম্পদ ও কোম্পানির গুড উইলের যে মূল্য) না করেই ২৭ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার প্রোপার্টি, প্লান্ট ও ইক্যুইপমেন্টের (পিপিই) হিসাব দাঁড় করানো, নামজারি না হওয়া জমি সম্পদে যুক্ত করা এবং বিতর্কিত পাওনায় কোনো প্রভিশন না রাখা- সব মিলিয়ে নিরীক্ষকের ভাষায়, কোম্পানির আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র প্রতিফলিত না হওয়ার ঝুঁকি প্রবল।

এ ছাড়া সুদ হিসাবের ভুল, ঋণের অনুমোদনহীন সময়সূচি, বিলম্ব সুদ না ধরা- সবকিছু মিলিয়ে ঋণ ব্যবস্থাপনায় পদ্ধতিগত দুর্বলতা উঠে এসেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি যথাক্রমে ৮ ও ৫ টাকার বেশি লোকসান করেছে কোম্পানিটি। লভ্যাংশও দিতে পারেনি। কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে জেড ক্যাটাগরিতে।

এ বিষয়ে পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান বলেন, বিপিডিবি ও বিপিএস থেকে পাওনাগুলো ধীরে ধীরে পেমেন্ট করে দিচ্ছে। এগুলা যে একদম পাওয়া যাবে না, সেরকম নয়। আমরা নিজেরা একটি কমিটিও করেছি এবং বিষয়টা সমাধান করছি। এছাড়া, ভেন্ডর চুক্তি সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়াধীন। সম্পদ ট্রান্সফার হলেও কিছু বিষয় অমিমাংসিত রয়ে গেছে। তবে এসব বিষয় চুক্তি অনুযায়ী সমাধান করা হচ্ছে। আর সুদ ব্যয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সেটিও সমন্বয় করা হবে।

খুলনা পাওয়ার: ২০২৪ সালে খুলনা পাওয়ারের ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩ এর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ‘নো ইলেক্ট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ নীতিতে সীমিত কার্যক্রম চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো নতুন চুক্তি হয়নি। ফলে কোম্পানির ব্যবসার ধারাবাহিকতা অনিশ্চিত। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে প্লান্ট সম্পূর্ণ বন্ধ, ফলে সম্পদ ও যন্ত্রপাতির মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি চরমে। সর্বশেষ ৫ বছরেই লোকসান করেছে কোম্পানি। লভ্যাংশ দিতে না পারায় স্থান হয়েছে জেড ক্যাটাগরিতে।

ডেসকো: গ্রাহকদের কাছে ডেসকোর মোট পাওনা ৫৬০ কোটি ১২ লাখ টাকা, যার ৩১১ কোটি ৭ লাখই প্রায় আদায় অযোগ্য। বিহারি ক্যাম্প থেকে ২৬৩ কোটি টাকা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। কিন্তু এর বিপরীতে প্রভিশন রাখা হয়েছে কেবল ২ কোটি ৮৭ লাখ। ফলে ৩০৮ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে কাগজে সম্পদ ফুলে ফেঁপে দেখানো হয়েছে, আর প্রকৃত ক্ষতি আড়াল হয়েছে। চলতি মূলধন প্রকল্প বা সিডব্লিউআইপি হিসাবে ৫৬২ কোটি টাকা দেখানো, কিন্তু গুলশানের সাবস্টেশন প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিলের পরও সেখানে ৭৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে গেছে, যা মূলত লাভ বা লোকসানে স্থানান্তরিত করা উচিত। এটিও অডিটে বড় অস্বচ্ছতার ইঙ্গিত। ২০২৩ সালে ১৩ টাকার বেশি এবং ২০২৪ সালে ১২ টাকার বেশি লোকসান করায় বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি কোম্পানি, যার কারণে স্থান হয়েছে জেড ক্যাটাগরিতে।

ডেসকোর কোম্পানি সচিব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান বলেন, যেহেতু বিহারি ক্যাম্পের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয় এবং এটা নিয়ে একটা মামলা আছে, সেজন্য এটাকে প্রভিশনে নেওয়া হয়নি। গুলশানের প্রকল্প বন্ধের প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে ১০ বছর ধরে প্রতি বছরে সমান হারে এটা সমন্বয় করবে। 

বারাকা পাওয়ার: নিজস্ব সহযোগী প্রতিষ্ঠানে জামানতহীন ১৫৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার ঋণ দিয়েছে বারাকা পাওয়ার, যা নিরীক্ষকের মতে সম্পূর্ণ অনিরাপদ বিনিয়োগ। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে ৫১ মেগাওয়াটের রেন্টাল কেন্দ্রটি ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ। চুক্তি শেষ, নবায়নও ঝুলে আছে। ফলে কেন্দ্রটির সম্পদ পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়- এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুযায়ী ইম্পেয়ারমেন্ট মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক হলেও কোম্পানি তা করেনি। এসব অবস্থায় কোম্পানির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়েও সন্দিহান নিরীক্ষক। এ ছাড়া ২৯ কোটি ৬১ লাখ টাকার স্পেয়ার ও লুব্রিক্যান্ট মজুত রয়েছে, কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এগুলোর বাস্তব মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করা কোম্পানিটি ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) করেছে ৩৬ পয়সা।

বারাকা পাওয়ারের এমডি ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের প্লান্ট নতুনের মতোই ভালো আছে। এখন সরকার যেহেতু হঠাৎ করে স্থগিত করল, এটার কারণে ওটা বন্ধ রয়েছে। বন্ধের আগেও এর মাধ্যমে ৫১ মেগাওয়াট থেকে ৫২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট আমরা সরকারকে দিতে সক্ষম হয়েছি। সব ইকুইপমেন্টগুলো একেবারে ওয়েল মেনটেইন করা আছে।

ডরিন পাওয়ার: ৬৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের সব বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) মেয়াদ শেষ, ভবিষ্যৎ আয় অনিশ্চিত-এমন মন্তব্য নিরীক্ষকের। যদিও কোম্পানি বলছে, অন্যান্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানে চুক্তি সক্রিয় থাকায় ব্যবসা চলবে, তবু গ্র্যাচুইটি ফান্ড না রাখা ও দেনা-পাওনার হিসাব সঠিকভাবে না দেখানো নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নিরীক্ষকের মতে, গ্র্যাচুইটি হিসাব করলে লাভ কমে যেত। এক সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি ১০ টাকার বেশি মুনাফা এখন নেমে এসেছে ৩ টাকার ঘরে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারি ক্রয় চুক্তির অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অভাব বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোকে সংকটমুখী করেছে। উৎপাদন বন্ধ, লোকসান ও ধারাবাহিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। কোম্পানিগুলোকে টেকসই করতে চুক্তি পুনঃনবায়ন ও বাজারমুখী উদ্যোগ জরুরি।

পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য আল-আমিন বলেন, জটিল অডিট রিপোর্ট সাধারণ বিনিয়োগকারীর বোঝা কঠিন, তাই সংবাদমাধ্যমের উচিত সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে ডিএসই ও বিএসইসির ওপর স্বচ্ছতা নিশ্চিতের চাপ বাড়ানো প্রয়োজন; তথ্য গোপনে বিনিয়োগকারীর ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারবে না।

বিএসইসির ভাষ্য: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, চুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ নীতি পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে চুক্তি সমস্যা বা আর্থিক অনিশ্চয়তা থাকলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা কোম্পানিগুলোকে সময়মতো তথ্য প্রকাশ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দেশনা দিচ্ছি।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

পল্লী বিদ্যুৎ পুঁজিবাজার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর