- বেশির ভাগই শিশু-কিশোরী
- রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ-নিন্দা
- সরকারকে ভাবমূর্তি রক্ষায় দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের পরামর্শ
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এক মাসও হয়নি। এরমধ্যেই ঘটেছে বেশক’টি ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনা। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ। এ ছাড়া প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, এসব ঘটনা বিগত ১৮ বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রভাব। নতুন সরকারকে এর রেশ টানতে হচ্ছে। তবে সরকারকে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
চলতি মাসের প্রথম দিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইকোপার্কের গহীন পাহাড়ে একটি শিশুকে ধষর্ণের পর নৃশংসভাবে গলাকেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ৭ বছর বয়সী শিশুটির নাম জান্নাতুল নাঈমা ইরা। শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৩ মার্চ ভোর ৫টার দিকে মারা যায় ইরা। পুলিশ ও স্থানীয়দের কাছে জানা যায়, ইকোপার্কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গভীরে সড়ক সংস্কারের কাছ চলছিল। সেদিন দুপুরের পরপর সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে, এমন সময় পুরো শরীরে রক্তমাখা অবস্থায় শিশু ইরা টলমল পায়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। এসময় সড়কে কাজ করা অবস্থায় এস্কাভেটর চালক তাকে দেখতে পায়। শ্রমিকরা দ্রুত এগিয়ে এসে শিশুটির গলার ক্ষত স্থান কাপড় দিয়ে চেপে ধরে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। পরে তাকে একটি ট্রাকে করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনাস্থলটি সহস্রধারা ঝরনা এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উত্তরে পাহাড়ি নির্জন পথ বলে জানা গেছে।
উদ্ধারের পর কথা বলতে না পারলেও শিশু ইরা ইশরায় বুঝানোর চেষ্টা করেছে, যে তার সঙ্গে এমন পৈশাচিক আচরণ করেছে তাকে দেখলে চিনতে পারবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, শিশুটির শ্বাসনালি কাটা ও হাতে গভীর ক্ষত ছিল। শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঘটনার পর থেকেই সে কথা বলতে পারছিল না। চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী কন্যা শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যৌন সহিংসতার আলামত পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, শিশুটির বাড়ি কুমিরা ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া এলাকায়। তার বাসা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার। এত কম বয়সী একটি শিশু কিভাবে একা ইকোপার্কের এত গভীরে পৌঁছাল। কেউ তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে কিনা কিংবা পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে কিনা, সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে।
পরে ওইদিন (৩ মার্চ) বিকেলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল জানান, এ ঘটনায় তদন্তে পাওয়া তথ্যে ও ইকোপার্কের সিসিটিভি পর্যালোচনা করে বাবু শেখ নামে এক মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে দুটি পৃথক স্থান থেকে দাদি (৬৫) ও নাতনির (১৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বাড়ি থেকে দাদির এবং বাড়ি সংলগ্ন শর্ষেক্ষেত থেকে নাতনির লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, ধর্ষণের পর কিশোরী নাতনিকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুজ্জামান বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা মধ্যরাতে কিশোরী নাতনিকে তুলে নেওয়ার সময় দাদি বাধা দিলে এ বৃদ্ধাকে হত্যা করা হয়। এরপর কিশোরীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কিশোরীর মরদেহ বিবস্ত্র অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় যৌন নির্যাতনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
এর একদিন আগে নরসিংদিতে ঘটে আরেকটি পৈশাচিক ঘটনা। ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে মাধবদীর দড়িকান্দি এলাকার সরিষা ক্ষেত থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান আসামি নুরাসহ এ পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অবশ্য পরে পুলিশের তদন্তে জানা যায়, মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ নূরার সঙ্গে কিশোরীর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, তার কারণে বিভিন্ন সময়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন কিশোরীর সৎবাবা আশরাফ আলী (৪৫)।
গত ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তার এক সহকর্মী সুমনের বাড়িতে যাওয়ার পথে একাই তাকে হত্যা করেছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নরসিংদী পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক।
এছাড়া গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হাতিয়ার চাননন্দী ইউনিয়নে শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার জেরে স্বামীকে বেঁধে রেখে তিন সন্তানের জননীকে (৩২) ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার দুপুরে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। জানা গেছে, শিশুটি একটি সরকারি স্কুলে পড়তো। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল বড়। তার বাবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। তিনি ঘটনার দিন সকালে অটোরিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন। দুপুরে এসে ভাত খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন।
শিশুটির মা জানিয়েছেন, ৯ বছরের মেয়েকে খাবার খেতে দিয়ে বাড়ির সামনের মাঠ থেকে ছাগল আনতে গিয়েছিলেন তিনি। ঘরে কেউ ছিল না। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ঘরে এসে দেখেন গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় আড়ার সঙ্গে তার মেয়ের বস্ত্রহীন দেহ ঝুলছে। পরে তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
মা আরও জানান, ছাগল আনতে যাওয়ার সময় পাশে দোকানের কাছে তিনজন ছেলেকে দেখে গেছেন। কিন্তু ফিরে আসার সময় তাদের আর দেখা যায়নি। আমার ছোট্ট শিশুটার সঙ্গে যারা এই কাজ করছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।
এ ঘটনায় নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, বারহাট্টা উপজেলার একটি গ্রামে শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে শিশুটিকে ধর্ষণ করে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ইতিমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছর এবং দুজনের বয়স ২২ বছর। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান সরকার মূলত বিগত ১৮ বছরের বিচারহনিতার রেশ টানছেন। তবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলা হয়েছে। মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অপরাধ দমনে নিরপেক্ষতা ও বিচার নিশ্চিত না হলে দোষীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তাই এ বিষয়ে এখনই কঠোর হতে হবে সরকারকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে ঘটনাগুলো ঘটছে তাতে আমরা বলতেই পারি এটা পূর্ববর্তী ১৮ বছরের ধারাবাহিকতার ফল। আইন না মানা, আইনের শাসন না থাকা, যথাযথ বিচার না হওয়ার ফলাফল এসব ঘটনা। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার এক মাসও হয়নি দাায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তারা এখনো পূর্ববর্তী সরকারের রেশ বয়ে যাচ্ছে। তাই তুলনামূলক বিশ্লেষণে না গিয়ে সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। কিভাবে দ্রুততম সময়ে এসব ঘটনায় জড়িত সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় সেই দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মানবাধিকার কর্মি আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, স¤প্রতি বেশ কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অপরাধ দমনে নিরপেক্ষতা ও বিচার নিশ্চিত না হলে দোষীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তখন সমাজে অপরাধ সংঘটন বেড়ে চলে। নারী ও শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সামাজিক সচেতনতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। অভিযোগ জানানোর প্রবণতাও আগের তুলনায় দৃশ্যমান; তবু ভুক্তভোগীরা এখনও ভয়, লজ্জা ও প্রভাবের চাপে ন্যায়বিচার থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হন। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া, ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষা এবং পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও সহিংসতাবিরোধী সচেতনতা জোরদার করতে হবে। নিরাপদ সমাজ গড়তে রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জন মানবাধিকার কর্মী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকটি ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় যে পরিমাণ প্রতিবাদ হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। এর একটি কারণ হতে পারে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংগঠনগুলো হয়তো সরকারকে সময় দিতে চাচ্ছে। আরেকটি কারণ হতে পারে, ঘটনা ঘটার পর অভিযুক্তদের দ্রুততার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। হয়তো এসব কারণে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ততবেশি জোরালো প্রতিবাদ করছে না। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে অপরাধীরা প্রশ্রয় পেয়ে যায়। তাই প্রতিবাদটা অব্যাহত রাখা উচিত।
বিকেপি/এমবি

